বছরজুড়ে এফডিসি কেন্দ্রিক যে খবরগুলো গণমাধ্যমে প্রকাশ হয় তার বেশিরভাগ থাকে বিভিন্ন সংগঠনের ভোট, পক্ষ-বিপক্ষ দলের কাঁদা ছোঁড়াছুঁড়ি, পিকনিক, মিলাদ, গরু কোরবানি ইত্যাদি নিয়ে। গত কয়েকবছর ধরে দেশের সিনেমার যে অবস্থা সেই জায়গা থেকে এখন পর্যন্ত ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি দেশের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি। সিনেমার বাজেট বাড়া, গল্পের পরিবর্তন বা প্রযুক্তি ব্যবহারের দিক থেকে কিছুটা উন্নয়নের ছোঁয়া লাগলেও সিনেমা ব্যবসায় এখনো এগিয়ে যেতে পারেনি ইন্ডাস্ট্রি। শাকিব খান ছাড়া বড় বাজেটের সিনেমা নির্মাণ করতে এখনো প্রযোজকরা আস্থা রাখতে পারছেন না অন্য নায়কদের প্রতি। তবে এই গণ্ডির বাইরে থেকে কিছু নতুন উদাহরণ তৈরি হচ্ছে সিনেমায়। মাল্টিস্টার কাস্টিং নিয়েও কাজ শুরু হয়েছে ঢালিউডে। কিন্তু পুরো ইন্ডাস্ট্রির অবস্থাটা এখনো নড়বড়ে।
ঢালিউডে এখন নায়কের তালিকায় শাকিব খান, আরিফিন শুভ ছাড়াও রয়েছেন অনেকে। কিন্তু ইন্ডাস্ট্রিতে তাদের ক্যারিয়ারের বয়স অনেক বছর পার হলেও প্রতিযোগিতার বাজারের বাইরে তারা। ছবি নির্মাণ ও মুক্তির সময় তাদের আওয়াজ পাওয়া গেলেও পরবর্তীতে কোনো খবরে থাকেন না তারা। আর সিনেমার সুপারহিটের ফাঁকা আওয়াজ থাকলেও সেই নায়ক বা নায়িকাকে নিয়ে দ্বিতীয় ছবি নির্মাণে দেখা যায় না প্রযোজকদের। অন্যদিকে সিনেমা হল নিয়ে আলোচনারও কমতি নেই। প্রতিবছর কমছে হলের সংখ্যা। যেহেতু সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি আর সিনেমা হল পরিপূরক তাই এই দুই জায়গার মধ্যে যে সমন্বয় প্রয়োজন সেটিরও সমাধানে এখন পর্যন্ত এগিয়ে আসেননি কেউ। এত সব সমস্যার মধ্যে যখন ইন্ডাস্ট্রির প্রতিটি মানুষকে সবকিছু ভুলে গিয়ে শুধু সিনেমার উন্নয়ন নিয়ে পরিকল্পনা করা উচিত সেখানে সারাবছর এফডিসিতে আলোচনা হয় চলচ্চিত্র সংগঠনগুলো নিয়ে। এফডিসি প্রাঙ্গণ এক সময় সিনেমার শুটিং, সহকর্মীদের আড্ডায় মুখরিত ছিল। ভোট মানে ছিল শুধুই উত্সব। সেখানে এখন পুলিশ মোতায়েন ও মারামারির মতো ঘটনাও ঘটে। এফডিসির ১৯ সংগঠনের মধ্যে বেশি আলোচনায় শিল্পী সমিতি। এছাড়াও দুটি গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন প্রযোজক সমিতি ও পরিচালক সমিতি। সিনেমার ইন্ডাস্ট্রির এমন ঘুণে ধরা অবস্থায় এখন পর্যন্ত এই সংগঠনগুলোর সিনেমার উন্নয়ন নিয়ে কোনো বৈঠক বা পদক্ষেপের কথা শোনা যায়নি।
অন্যদিকে ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে পরিপূরক সিনেমা হল। কিন্তু হল মালিকদের সঙ্গেও সংগঠনগুলো কোনো আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথে এগোয়নি। তাহলে সংগঠনগুলোর কাজ কী?
শিল্পী সমিতির দায়িত্বে থাকা অনেকের সঙ্গে বিভিন্ন সময় সিনেমার উন্নয়ন নিয়ে জানতে চাওয়া হলে তারা প্রশাসনিক কাজ নিয়ে অনেক পরিকল্পনার কথা শোনালেও সিনেমার উন্নয়ন নিয়ে কোনো কথা নেই তাদের। পরিচালক সমিতি ও প্রযোজক সমিতিও একই পথে হাঁটছে। প্রযোজক সমিতির নির্বাচনের পর দায়িত্বে থাকা প্রযোজকদের একটি করে সিনেমার নির্মাণের কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত তাদের কোনো পরিকল্পনার কথা জানা যায়নি। এরমধ্যে মহামারি করোনার প্রভাবে ইন্ডাস্ট্রির অবস্থা যখন আরো নিচের দিকে তখন শিল্পী সমিতির সভাপতি মিশা সওদাগর ও সাধারণ সম্পাদক জায়েদ খানকে বয়কট নিয়ে সরব সংগঠনগুলো। পরিবারে নিজেদের মধ্যে এমন কোন্দল ইন্ডাস্ট্রির কতটা উন্নতি করবে তা নিয়ে শঙ্কায় চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা। এই সময় প্রয়োজন সিনেমার উন্নয়ন নিয়ে পরিকল্পনা। কারণ বিশ্বে সিনেমা নিয়ে চিন্তা ও এর প্রতিফলন যে জায়গায় পৌঁছেছে সেখানে আমাদের ইন্ডাস্ট্রি শুধু কলকাতা আর তামিল সিনেমার আদল নিয়ে পড়ে আছে। বিশ্বের প্রতিযোগিতার বাজার ধরতে হলে পুরো সিস্টেমে আনতে হবে পরিবর্তন। রাজনীতি আর সিন্ডিকেট থেকে বের হয়ে সিনেমা ও ব্যবসার নিয়ে উন্নতির পরিকল্পনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।