ঐক্য ভঙ্গের নিয়ামক হতে পারে আমিরাত

ফরহাদ আহমেদ

বহু দশকের বিরোধের পাশাপাশি একাধিক দ্বন্দ্বের সঙ্গে লড়াই করা ইসরাইল ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সম্প্রতি এমন একটি পদক্ষেপ নিয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক রাজনীতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। সম্পর্কের ‘স্বাভাবিকীকরণ’-এর প্রয়োজনে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করে দেশ দুটি মূলত বৈশ্বিক রাজনীতিকদের দুই দলের মধ্যে বিভক্ত করে দিয়েছে। ফলে এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে একটি অংশ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে এবং অন্যরা আন্তরিকভাবে এটিকে সমর্থন করেছে। এমনকি এই শান্তিচুক্তিতে মধ্যস্থতার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করার ব্যাপারেও সমর্থন জুগিয়েছে। তবে এই চুক্তি স্বাক্ষরের মূল কথা, এই অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনা হলেও ফিলিস্তিনি স্বার্থ পরিপন্থি হওয়ার কারণে এ অঞ্চলের আরব ঐক্যকে বিপদে ফেলে দিয়েছে। যদিও আমিরাতের পক্ষ থেকে বারবার করে বলা হয়েছে যে এই চুক্তির কোনো প্রভাব এই অঞ্চলের জোটগুলোর ওপর পড়বে না বলে তারা মনে করে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত এ বিষয়ে যতই স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করুক না কেন, এই চুক্তির দুটি নেতিবাচক দিক কখনোই আরব বিশ্ব এড়িয়ে যেতে পারবে না। প্রথমটি হলো, এই চুক্তির ফলে ফিলিস্তিনের অবস্থান স্বাভাবিকভাবেই অনেকটা দুর্বল হয়ে যাবে এবং এর মাধ্যমে একটি বিষয় বিশ্ব জেনে নেবে যে আরবরা নিজেদের স্বার্থে ফিলিস্তিন ইস্যুকে পাশ কাটিয়ে ইসরাইলের নানা অপকর্ম সত্ত্বেও দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক  স্বাভাবিক রাখতে প্রস্তুত রয়েছে। দ্বিতীয়টি হলো, ইসরাইল সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে আরব বিশ্বের অন্তরে প্রবেশ করতে সক্ষম হবে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিভিন্ন পোর্টালের মাধ্যমে আরব বিশ্বে ইসরাইল নিজেদের জন্য এজেন্ট নিয়োগেরও ক্ষমতা পাবে।

১৩ আগস্ট হোয়াইট হাউজে এই চুক্তির অংশ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল যে ১৮ মাস আলোচনার পরে উপসাগরীয় দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ বিষয়ে রাজি হয়েছে এবং ইসরাইল পশ্চিম তীরের সংযুক্তি স্থগিত রাখার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। এভাবে ১৯৭৯ সালে মিশর এবং ১৯৯৪ সালে জর্ডানের পর ইসরাইলের সঙ্গে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরকারী তৃতীয় আরব দেশে পরিণত হলো সংযুক্ত আরব আমিরাত।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের এই আরব বিশ্বের স্বার্থ উপেক্ষা করে ইসরাইলের সঙ্গে শান্তিচুক্তির কারণ হিসেবে আরব বসন্তকেও নির্দেশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। সংযুক্ত আরব আমিরাত ইসরাইলের সঙ্গে বেশ কয়েকটি প্রকল্পে ছেদ করে, যার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল আরব বসন্তের বিরোধিতা, যা আরব জনগণকে জনগণের ইচ্ছা প্রকাশ এবং ইচ্ছামতো সরকার নির্বাচনের ক্ষমতা প্রদান করেছিল। দ্বিতীয়টি ইরানের সঙ্গে বৈরিতা। যেহেতু ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাতের তিনটি দ্বীপ দখল করেছে এবং ইরান ইসরাইলি সীমান্তে রয়েছে। এ বিষয়গুলোর আন্তঃসংযোগই মূলত এই চুক্তিকে সম্ভব করে তুলেছে।

এই চুক্তির বিষয়ে আরব বিশেষজ্ঞদের মত হলো, চুক্তিটি ২০০২ সালের স্বাক্ষরিত ‘আরব পিস ইনিশিয়েটিভ’ চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। যে চুক্তি ইসরাইলের সঙ্গে বিরোধ নিষ্পত্তি করার বিষয়ে আরব দেশগুলোর দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিনিধিত্ব করে। ফিলিস্তিন ইস্যুই বর্তমান আরব রাষ্ট্রগুলোর ঐক্যের সবচেয়ে বড়ো যায়গা। এখন আমিরাতের এই চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য যদি আরব রাষ্ট্রগুলোর সেই ঐক্য ভেঙে যায়, তবে অন্য যে কোনো ইস্যুতে এটি আবার নতুন করে তৈরি করা কঠিন হবে।

অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সীমানার সঙ্গে ইরানের লাগোয়া সীমানা রয়েছে। ভবিষ্যতে ইরানের সীমান্তের কাছে আরব আমিরাতের ভেতরে ইসরাইলের প্রথম সারির সামরিক ঘাঁটি হয়ে ওঠার খুব বেশি সম্ভাবনা রয়েছে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সংঘাত মোকাবিলায় পূর্ণ সুবিধা লাভ করবে, যার ফলে সংকটে বিধ্বস্ত মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা আরো বেড়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আমিরাতের পরোক্ষ ভূমিকাকে অস্বীকার করার উপায় থাকবে না। আর এভাবে পারস্য উপসাগরে মেরুকরণও বৃদ্ধি হতে পারে।

আবার এর ফলে শুধু ইসরাইল আর যুক্তরাষ্ট্রেরই লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে, আমিরাতের নয়। কেননা, সংযুক্ত আরব আমিরাতের পক্ষেও এক্ষেত্রে সম্ভাব্য বিপদ রয়েছে। কারণ  ইসরাইল যখনই আমিরাতকে ব্যবহার করে ইরানের বিরুদ্ধে সংঘাতে জড়াবে, তখন ইরান কিন্তু বসে থাকবে না। ইরান লেবানন ও সিরিয়ায় নিজেদের ঘাঁটি ব্যবহার করে ইসরাইলকে এর জবাব দেবে। মাঝখান থেকে ক্ষতির সম্মুখীন হবে সংযুক্ত আরব আমিরাত। এর ফলে বর্তমানে অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল উপসাগরীয় অঞ্চল আবার অস্থিতিশীল অবস্থায় পতিত হবে।

এই চুক্তির ঘোষণার পর ফিলিস্তিনের জনগণ তা প্রত্যাখ্যান ও নিন্দা প্রকাশ করে এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে তাদের দূতকে প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রপতি মাহমুদ আব্বাস চুক্তিটিকে ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে ‘আগ্রাসন’ এবং তাদের ভবিষ্যত্ রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে পূর্ব জেরুজালেমের ন্যায্য দাবির বিরুদ্ধে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ বলে অভিহিত করেছেন। ইসরাইল ও ফিলিস্তিন উভয় দেশেই বহু প্রতিবাদকারী আমিরাতের পতাকা ছিঁড়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

এখন এই পরিস্থিতিতে আরব বিশ্বের কাছে একটি বার্তাই পৌঁছে দেওয়া সম্ভব, সেটা হলো আসন্ন সংঘাত মোকাবিলায় তাদের একে অপরের অবস্থান কী রকম হবে। কারণ সৌদি আরবের সঙ্গে ইরান, তুরস্কের যে উত্তেজনা ছিল, সেখানেও ফিলিস্তিন ইস্যুতে কিছুটা হলেও যে ঐক্য ছিল, সেটা আমিরাতের এই পদক্ষেপের কারণে আর থাকবে না। এজন্য ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি ভঙ্গের একক দায় যদি কাউকে বহন করতে হয় ,সেটা সংযুক্ত আরব আমিরাতকেই করতে হবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়