করোনা রোগীর চিকিত্সায় নিয়োজিত চিকিত্সক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের শুরু থেকেই তাদের পরিবার থেকে আলাদা থাকার জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করেছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তাদের নিজেদের সুরক্ষাসহ পরিবারের সদস্যদের করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি এড়ানোই ছিল এর মূল লক্ষ্য। এছাড়া তারা যেন চিকিত্সা কাজে শতভাগ মনোযোগ দিতে পারেন, সে কারণেও সংশ্লিষ্ট চিকিত্সক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বিনা খরচে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের পার্শ্ববর্তী হোটেল কিংবা আবাসিকে থাকার ব্যবস্থা করে সরকার। কিন্তু গত জুলাই মাসে এ ব্যবস্থা বাতিল করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। বিষয়টি চিঠি দিয়ে জানিয়ে দেওয়া হয়। এরপর থেকে সারাদেশে ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে গতকাল শনিবার শহিদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের কোভিড ইউনিটে দায়িত্ব পালন করা চিকিত্সকরা নিরাপদ আবাসনের দাবিতে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। আবাসনের দাবিতে তারা হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া, উপপরিচালক ডা. মামুন মোর্শেদ ও মেডিক্যাল কলেজের উপাধ্যক্ষ ও কোভিড ইউনিটের সমন্বয়ক অধ্যাপক ডা. শাহাদাত্ হোসেন রিপনের রুম ঘেরাও করেন। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আবাসনের ব্যবস্থা না করলে করোনা ইউনিটে ডিউটি করবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। এর আগে কুয়েত-মৈত্রী হাসপাতালের ডাক্তাররাও অনুরূপ আন্দোলন করেছেন।
দেশে এ পর্যন্ত ৯০ জন ডাক্তার করোনায় মারা গেছেন। এরমধ্যে দুই জন ডেন্টালের ডাক্তার। এছাড়া ১১ জন নার্স এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীসহ সাত জন করোনায় মৃত্যুবরণ করেছেন। অন্যদিকে ২ হাজার ৭৭০ জন ডাক্তার, ১ হাজার ৫৫৪ জন নার্স ও ৩ হাজার ২৫২ জন অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা বলেন, দেশে করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি এখনো ঝুঁকির মধ্যে আছে। এই অবস্থায় ডাক্তার-নার্সসহ স্বাস্থ্য সেবা কর্মীদের ঝুঁকির মধ্যে রেখে সুচিকিত্সা পাওয়া যাবে না বরং ভুল চিকিত্সায় রোগীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটবে। তারা আরো বলেন, এতে করোনা রোগীদের চিকিত্সায় যেমন ব্যাঘাত ঘটবে, তেমনি চিকিত্সায় নিয়োজিত ডাক্তারসহ অন্যরা এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের করোনার ঝুঁকি বেড়ে গেল।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, বিষয়টি নিয়ে তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন। মন্ত্রী আবাসন ব্যবস্থা পুনর্বহালের আশ্বাস দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে এসংক্রান্ত একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে বলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডিজিকে জানান।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব ডা. এহতেশামুল হক চৌধুরী দুলাল বলেন, করোনা রোগীদের সেবা প্রদানকারী ডাক্তারদের আবাসন ব্যবস্থা তুলে দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সারাদেশে চিকিত্সকদের মধ্যে ক্ষোভ আছে। বিষয়টি লিখিতভাবে সরকারকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
শহিদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের কোভিড ইউনিটে কাজ করা একাধিক চিকিত্সক বলেন, মাঠ পর্যায়ের সফলতা দৃশ্যমান। এসির মধ্যে কাজ করা সফলতা নয়। এক শ্রেণির ডাক্তার ও আমলা—যারা সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত তারাই ডাক্তারদের হোটেল ব্যবস্থা বাতিল করেছে। এরা সরকারকে ডুবাবে। এসব কুচক্রি মহলের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি অনুরোধ জানিয়ে চিকিত্সকরা বলেন, মাস্ক কেলেঙ্কারি ও বালিশ কেলেঙ্কারিসহ নানা অনিয়ম করে এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। আর করোনার ফ্রন্টলাইনের যোদ্ধা ডাক্তার-নার্সসহ স্বাস্থ্য সেবা কর্মীদের আবাসন সুবিধা বাতিল করে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছে।
চিকিত্সকরা আরো বলেন, ‘আমাদের হোটেল নেই, কোনো আবাসনের ব্যবস্থা কর্তৃপক্ষ করতে পারেনি। কিন্তু আমরা তো আমাদের পরিবারকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারি না।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক চিকিত্সক বলেন, ‘আমাদের আজ ডিউটি শেষ করে বাসায় যেতে হবে। একাধিক চিকিত্সকের পরিবারের একাধিক সদস্য সংক্রমিত হয়েছেন, মারাও গেছেন তিন চিকিত্সকের বাবা ও শ্বশুর। কিন্তু এ বিষয়ে এখনো কোনো সমাধান আমরা পাইনি। আমরা কর্তৃপক্ষকে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছি। এর ভেতরে কোয়ারেন্টাইনের কোনো সমাধান না হলে, আমরা করোনা ইউনিটে আর ডিউটি করবো না। তবে হাসপাতালের নন-করোনা ইউনিটে ডিউটি করবো।’
শহিদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিত্সকরা বলেন, ‘হাসপাতাল পরিচালক অধ্যাপক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়ার কক্ষ ঘেরাও করা হলে তিনি আমাদের সামনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তাকে ফোন করেন, কিন্তু তিনি কোনো সমাধান দিতে পারেননি।’ পাশাপাশি প্রায় ৬৫ জন চিকিত্সক হাসপাতাল পরিচালক বরাবর একটি স্মারকলিপি জমা দিয়েছেন বলেও জানা গেছে। হাসপাতালটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া পরে সাংবাদিকদের বলেন, ‘চিকিত্সকদের দাবি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবো বলে তাদের জানিয়েছি। এরই মধ্যে আমি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছি এবং মন্ত্রণালয়কেও এটা জানাবো।’ তিনি বলেন, ‘চিকিত্সকরা আমাদের ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছেন, তাদের আবাসিক সমস্যা সমাধানের জন্য।’
প্রসঙ্গত, করোনা প্রাদুর্ভাবের পর গত ১২ এপ্রিল রাজধানীর ছয় হাসপাতালে করোনায় আক্রান্ত রোগীদের স্বাস্থ্য সেবাদানকারী চিকিত্সক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের থাকার জন্য ১৯টি হোটেল নির্ধারণ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। কিন্তু গত ২৯ জুলাই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র অনুযায়ী করোনা রোগীদের চিকিত্সায় নিয়োজিত চিকিত্সকসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের আবাসিক হোটেলের বিল পরিশোধ না করার সিদ্ধান্ত নেয় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে চিকিত্সকদের জন্য বরাদ্দ হোটেলের সুবিধাও বাতিল করে তারা।