৬০০ বছর ধরে টিকে আছে চীনের ‘নিষিদ্ধ নগরী’

চীনের রাজধানী বেইজিংকে দেশটির রাজনীতি, শিক্ষা, বুদ্ধিবৃত্তি ও সংস্কৃতির কেন্দ্র হিসেবে গণ্য করা হয়। আধুনিক বেইজিং নগরীর কেন্দ্রস্থলে ৬০০ বছর আগে গড়ে উঠেছিল ১৮০ একরের এক ‘ফরবিডেন সিটি’ বা ‘নিষিদ্ধ শহর’। দেশটির সাধারণ প্রজা তো বটে, রাজপরিবারের সব সদস্যও এ শহরে প্রবেশের অনুমতি পেতেন না। যারা পেতেন তাদেরও আবার সব জায়গায় যাওয়ার অনুমতি মিলত না। শুধু সম্রাটই ছিলেন এই নিষেধাজ্ঞার ঊর্ধ্বে। এ কারণেই নিষিদ্ধ শহর হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে এই শহর। অসাধারণ নির্মাণশৈলী এবং সমৃদ্ধ ইতিহাসের গুণে এই ‘নিষিদ্ধ শহরটিকে’ বিশ্ব ঐতিহ্য ঘোষণা করেছে ইউনেস্কো। বেইজিং থেকে এই শহরটিকে পৃথক করার জন্য এটিকে ঘিরে দেওয়া হয়েছে ৩৩ ফুট উচ্চতার দেয়াল দিয়ে। মূলত রাজপরিবারের নিরাপত্তার পাশাপাশি তাদের গৌরব ও মহিমাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতেই করা হয়েছিল এমনটা। ছয় শতক ধরে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও স্বমহিমায় টিকে রয়েছে ‘নিষিদ্ধ শহরটি’।

মিং রাজবংশের ইয়ংলি সম্রাট ১৪০৬ সালে এ শহরের নির্মাণকাজ শুরু করার পর          মূল কাজ শেষ করতে সময় লাগে ১৪ বছর। এরপর প্রায় ৫০০ বছর এটিই ছিল চীনের রাজধানী। এ সময়ে এই ‘নিষিদ্ধ’ শহরটিতে থেকেছেন ২৪ জন সম্রাট। শহরটির অনেক কিছুই এখনো অজানা রয়ে গেছে। অনেক কিছুই রয়ে গেছে রহস্যে ঘেরাটোপে। এই শহরে রয়েছে ৯৮০টি বাড়ি। জনশ্রুত রয়েছে, এসব বাড়িতে রয়েছে ৯ হাজার ৯৯৯টি কক্ষ; তবে কক্ষের প্রকৃত সংখ্যা নিয়েও রয়েছে রহস্য।

বর্তমান আধুনিক বেইজিংয়ের ইতিহাসের সঙ্গে ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে নিষিদ্ধ শহরটির নাম। ৬০০ বছর আগে বর্তমান বেইজিং থেকে ১ হাজার কিলোমিটার দক্ষিণে ছিল দেশটির রাজধানী। মিং রাজবংশের প্রথম সম্রাট ঝু ইউয়ানঝ্যাং ইয়ানজজে নদীর তীরে গড়ে তুলেছিলেন চীনা রাজধানী। তার মৃত্যুর পর তার উত্তরাধিকারী ও নাতি শহরে থেকেই শাসনকাজ চালাতে শুরু করেন। তবে ঝু ইউয়ানঝ্যাংয়ের এক ছেলে ঝু ডি চেয়েছিলেন রাজধানীকে উত্তর অংশে নিয়ে যেতে। ঝু ডি এবং সম্রাটের মধ্যে তিন বছরের সংঘাতের পর সম্রাটের পুরো পরিবারকে হত্যা করেন ঝু ডি। এরপর নিজেকে মিং রাজবংশের সম্রাট ঘোষণা করে পুঁজিবাদী সম্রাজ্য গড়ার স্বপ্ন নিয়ে বেইজিংয়ের প্রতি আকৃষ্ট হন। ১৪২০ সালে সেখানে তিনি গড়ে তোলেন এই নিষিদ্ধ শহর।

১৪০৬ সালে এই শহরের নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ১৪ বছর পর ১৪২০ সালে শেষ হয়। এটি তৈরি করতে সে সময় কয়েক লক্ষাধিক জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আনা হয়েছিল নির্মাণসামগ্রী। সিচুয়ান থেকে আনা হয়েছিল মূল্যবান সব কাঠ, মার্বেল পাথরসহ অন্যান্য উপকরণ। বড় আকারের মার্বেল সংগ্রহের জন্য তাদের নির্ভর করতে হয়েছিল প্রকৃতির ওপর। শীতকালে যখন বরফ পড়ে রাস্তা পিচ্ছিল হতো তখন সেই রাস্তায় গড়িয়ে আনা হতো বিশাল আকৃতির সব মার্বেল খণ্ড। কাঠ দিয়ে তৈরি হওয়া এ বাড়িগুলোর নির্মাণ-কৌশল নিয়েও রহস্য রয়েছে। কেননা গত ৬০০ বছরে চীনে ঘটে যাওয়া ছোট-বড় সব ভূমিকম্পকে ঠেকিয়ে দিয়ে মাথা উঁচু করে রয়েছে এই বাড়িগুলো।

রহস্যময় এ শহরের নকশা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। আগে ধারণা করা হতো, মিং রাজবংশের খ্যাতনামা শিল্পী কুয়াই জিয়ং এই শহরের নকশাকার। কিন্তু সাম্প্রতিক তথ্যে বলা হচ্ছে, এর প্রকৃত নকশাকার হলেন কাই জিন নামের অন্য এক জন। শহরটির বাড়ি ও আঙিনার মাপগুলো অবাক করছে গবেষকদের। বাড়িগুলো যত বড় বা ছোটই হোক না কেন, এর দৈর্ঘ্য-প্রস্থের মাপের হার ৬:১১। এছাড়া, বাড়ির আঙিনাগুলোর মাপের হারও এমনই। এই মাপের মধ্যে প্রাচীন চীনের কোনো গুপ্তজ্ঞান লুকিয়ে রয়েছে কি না, সেটি নিয়েও গবেষকদের মনে রয়েছে নানা প্রশ্ন। বাড়িগুলোর ছাদে, দেয়ালে ও বিভিন্ন স্থানে ব্যবহূত ফিনিক্স, ড্রাগন ও অন্যান্য পৌরাণিক জীবজন্তুর প্রতিকৃতি বা ভাস্কর্যের ব্যবহার নিয়েও রহস্য রয়েছে। কেননা এগুলো ব্যবহার করা হয়েছে প্রতীক হিসেবে। প্রাচীন চীনে প্রতীকের ব্যবহার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এসব প্রতীকের মধ্যে অনেক দিকনির্দেশনা দেওয়া থাকে।

বিশ শতকেও এই শহরটিকে পড়তে হয়েছিল তত্কালীন কমিউনিস্ট নেতার বিরোধিতার মুখে। বেইজিংয়ের প্রাণকেন্দ্রে বিশাল এলাকা দখল করে থাকায় এই শহরটি নিয়ে ওঠে তীব্র বিতর্ক। কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মাও জেদং এই এলাকায় গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন চীনের কেন্দ্রীয় সরকারের দপ্তর। যদিও সে যাত্রাও টিকে যায় শহরটি। —সিএনএন