অমিতা সিনহা
‘বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না’—এমনি যন্ত্রণায় অতিক্রম করে যাচ্ছে কোভিডময় যুগে সিলেটের মণিপুরিরা। বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে পড়া মহামারি করোনা দুয়ারে আসার পর থেকেই চলতি পথের ঘূর্ণায়মান সমস্ত চাকা থমকে গিয়ে পঙ্গুত্ব হয়ে আছে ওদের জীবন। তবু এই জাতি অনায়াসে ওদের লাবণ্যময়ী হাসিমাখা মুখের কিনারায়ও কষ্টের ছাপ স্পর্শ করতে দেয়নি। করোনার দুর্যোগমুহূর্তে হাহাকার জীবনের যাত্রাপথে সব দুঃখ-কষ্ট আগলে নিয়ে নিত্যদিন সংগ্রামী পথ পার করে যাচ্ছে মণিপুরিরা।
জাতিগতভাবে মণিপুরি। করোনা ভাইরাসের কারনে রুটিরুজির চাকা বন্ধ হয়ে স্বচ্ছ জীবনযাত্রা ফিরে পেতে অক্ষম। বাস্তবতা আড়াল করতে মুখের হাসিটুকু শুধু আগলে ধরেছে। সিলেট অঞ্চলের মণিপুরিরা প্রকৃতপক্ষে রাজা-মহারাজাদের উত্তরসূরি হলেও কালের বিবর্তনে বাস্তবে তারা মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। তার মধ্যে অধিকাংশই নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির। সহস্রাধিক বছর আগে মণিপুরিরা রাজাদের রাজ্যসিংহাসনের বড় বড় যুদ্ধে শরিক হয়েও যেমন তাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ধর্ম-বর্ণকে অক্ষত রেখেছিল; একালের করোনা মহামারির বিপর্যস্তেও এর ব্যতিক্রম ঘটতে দেয়নি। করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়লে সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্রাণঘাতী ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে ঘরবন্দি মানুষগুলোকে খাদ্যসামগ্রীসহ নানা ধরনের ত্রাণ দিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ঐ সাহায্যও সামান্য। পাঁচ মাসব্যাপী ঘরবন্দি মানুষগুলোর রুটিরুজির সব কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আজ ঘর থেকে মুক্তি হয়েও জীবন-মরণের সন্ধিক্ষণে দিন যাপন করে যাচ্ছে তারা।
অনুসন্ধানকালে আলাপ হয় সিলেটের মাছিমপুরের স্বামীহারা বিধাব জোসনা সিনহার (৫২) সঙ্গে। জোসনা মৃদু হেসে বলেন, ‘আমার দুই ছেলেমেয়ে করোনা পরিস্থিতির জন্য ঘরবন্দি ছিল অনেক দিন। কিন্তু ঘর থেকে দাপ্তরিক অফিসে গিয়েও কোনো লাভ হয়নি। বরং ওদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পাশে নেই ওদের পিতা। খুব কষ্টে সময় যাচ্ছে।’ ষাট বছরের গায়ক স্বপন কুমার সিংহ বলেন, ‘মহামারি করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের কারণে আমিও গৃহবন্দি ছিলাম। সে সময় অনেকেই একটু একটু খাদ্যপণ্য দিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেও মরণঘাতী ভাইরাস এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি। যার ফলে নিয়মিত গান গেয়ে যে আয়ের উত্স ছিল, তা-ও বন্ধ। কীভাবে আছি তা কাউকে বলে বোঝাতে পারব না।’ শিবগঞ্জের বাসিন্দা নবম শ্রেণির ছাত্রী অর্পিতা সিনহা নিজ বিদ্যালয়ে গিয়েছিল কয়েক মাসের বেতন মাফ করার জন্য প্রধান শিক্ষকের কাছে। মা অসুস্থ, করোনার কারণে বাবার নেই কোনো আয়রোজগার। ঘরে আছে কনিষ্ঠ ভাই ও বৃদ্ধ দাদি। উপায় না পেয়ে বেতন মাফ করার জন্য ছুটে যায় সে দরখাস্ত নিয়ে। কিন্তু তা-ও ইতিবাচক ছাড়া দেয়নি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। একই বিষয়ে ব্যবসায়ী জয় মোহন সিংহ প্রতিবেদককে বলেন, আগে যে জায়গায় শতভাগ কাজ হতো, কোভিড-১৯ আসার পর ব্যবসা একেবারে শূন্যের দিকে গড়িয়েছিল। প্রায় চার মাসের মাথায় এখন ফের ৪০ শতাংশ এগিয়ে আসছে।
এ প্রসঙ্গে সিলেটের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকার সাংবাদিক সুনীল সিংহ প্রতিবেদককে জানান, মণিপুরিরা জাতিগত স্বনির্ভরশীল জাতি। মহামারি করোনার ছোবলে জাতি আজ সংকটে। কিন্তু এত বড় সংকটকালে নীরবে-নিশ্চুপে মুখে হাসি দিয়ে দুঃসহ জীবন পার করে যাচ্ছে নিম্ন-মধ্যবিত্ত মণিপুরিরা। তাই এই জাতির দুঃসময়ে সরকারি ও সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসা অত্যন্ত আবশ্যক।