সেবা সংস্থাসমূহের ডিজিটালাইজেশন

বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে ডিজিটালাইজেশনের প্রক্রিয়া বহু পূর্বেই শুরু হইয়াছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশাসন—প্রভৃতি ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া অনেক দূর অগ্রসরও হইয়াছে। গত এক দশকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বলিতে গেলে একধরনের বিপ্লব সাধিত হইয়াছে; কিন্তু সেবা সংস্থাসমূহের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত ডিজিটালাইজেশনের ছোঁয়া এখনো লাগে নাই। আমাদের অবকাঠামো আছে, তাহার পরও ডিজিটালাইজেশন নাই বা এই প্রক্রিয়া থামিয়া আছে। বিশেষ করিয়া সরকারি সেবা খাত, যেমন—বিদ্যুত্, পানি, গ্যাস ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্কসমূহে অটোমেশন ও ডিজিটাল মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা চালু হয় নাই। এই ধরনের ব্যবস্থা চালু থাকিলে নারায়ণগঞ্জ শহরের একটি মসজিদে গ্যাস দুর্ঘটনায় মানুষের হতাহতসহ অনেক দুর্ঘটনাই তাত্ক্ষণিকভাবে এড়ানো যাইত এবং বন্ধ করা যাইত অনিয়ম ও দুর্নীতি।

ডাক বিভাগের ডিজিটাল আর্থিক সেবা ‘নগদ’ এখন একটি ব্র্যান্ডে পরিণত হইয়াছে। এখানে বেসরকারি অংশীদার প্রতিষ্ঠানসমূহ প্রযুক্তিগত অবকাঠামো গড়িয়া তুলিয়াছে। ইহাতে যেই ডাক বিভাগ লইয়া একদা হতাশা তৈরি হইয়াছিল এবং বলা হইয়াছিল—চিঠি যুগের অবসানে এই প্রতিষ্ঠান অস্তিত্ব টিকাইয়া রাখিতে পারিবে না, সেই সেবা প্রতিষ্ঠানই আজ দেখিতেছে লাভের মুখ। এভাবে সরকারি অন্য সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানসমূহকেও পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলে ডিজিটালাইজেশনের আওতায় আনা প্রয়োজন। ডেসকোতে বিতরণব্যবস্থায় অটোমেশন ও ডিজিটাল ম্যাপিং-ব্যবস্থা গড়িয়া তুলিবার চেষ্টা চলিতেছে। ইহা ছাড়া স্মার্ট মিটার ও ডিজিটাল পদ্ধতিতে বিল পরিশোধের ব্যবস্থা শুরু হইয়াছে। নিঃসন্দেহে ইহা ভালো উদ্যোগ। তবে এখনো ইহা অপর্যাপ্ত। যেইখানে ডেসকোর গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ১০ লক্ষ, সেইখানে সাড়ে ৩ লক্ষ গ্রাহক স্মার্ট মিটার ও ডিজিটাল পদ্ধতিতে বিল পরিশোধের সুযোগ পাইতেছেন। প্রশ্ন হইল, বাকিরা কেন পাইবেন না? এই জন্য এখানে এইরূপ সেবার পরিসর বাড়াইতে হইবে। এইদিকে ঢাকা ওয়াসা পুরাতন পদ্ধতির ত্রুটিপূর্ণ মিটারব্যবস্থা দিয়াই চলিতেছে। ওয়াসা সীমিত পরিসরে মোবাইল ব্যাংকিংসেবা বিকাশের মাধ্যমে বিল পরিশোধের ব্যবস্থা করিলেও অধিকাংশ সময় এইভাবে বিল পরিশোধ করা যায় না। তবে সেবা প্রতিষ্ঠানসমূহে ডিজিটালাইজেশনের বড় দিক হইল স্বয়ংক্রিয় কিংবা ডিজিটাল ফল্ট ডিটেকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা গড়িয়া তোলা। ইহা আমাদের কোনো সরকারি ও জরুরি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের কোনোটিই এখন পর্যন্ত করিয়া দেখাইতে পারে নাই। এই ব্যবস্থা চালু থাকিলে যে কোনো মুহূর্তে ত্রুটিবিচ্যুতি নজরে আসিবে এবং সেই অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হইবে। এই জন্য গ্রাহকদের আবেদন দিতে বা অভিযোগ জানাইতে অফিসে আসিতে হইবে না। শুধু এই সকল প্রতিষ্ঠান নহে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জসহ অন্যান্য সরকারি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানসমূহও এইরূপ সমন্বিত ডিজিটাল সেবাব্যবস্থা গড়িয়া তুলিতে পারে।

সরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ডিজিটালাইজেশন করিবার জন্য মেগা প্রকল্প গ্রহণ করিতে হইবে। এই ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধক হইল পুরাতন পদ্ধতির সুবিধাভোগীরা। এই জন্য প্রশিক্ষণকে গুরুত্ব দিতে হইবে। তবে যেই দেশে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় চুরি ও লুটপাট চলে, চলে সিস্টেম লস, গরিবের চাউল লইয়াও চলে কাড়াকাড়ি-মারামারি, সেইখানে সেবা খাতের উন্নতি হইবে কীভাবে? সিন্ডিকেট চক্র কি ডিজিটালাইজেশন প্রক্রিয়া সহজে মানিয়া নিবে এবং সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করিতে দিবে? পৃথিবীর সকল উন্নয়নশীল দেশেরই এইরূপ অভিন্ন বৈশিষ্ট্য ও মনমানসিকতা রহিয়াছে। যেইখানে চাপাবাজি ও তোষামোদিই সার, সেইখানেও এই প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা কঠিন। তাহার পরও আমরা বলিতে পারি, পাঁচ বত্সর পূর্বে আমাদের সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানসমূহ যেই জায়গায় দাঁড়াইয়াছিল, তাহারা সেখানে আর অবস্থান করিতেছে না। ধীরে ধীরে হইলেও এই সেবাপ্রতিষ্ঠানসমূহও ডিজিটালাইজেশনের প্রক্রিয়ায় বদলাইয়া যাইতেছে।