মানববিহীন বিমান তথা ড্রোনের আবিষ্কারক দেশটি হইল যুক্তরাষ্ট্র। বলা যায়, যুদ্ধের নূতন কৌশল হিসাবেই ইহার উদ্ভাবন। একটি কমব্যাট ড্রোন মূর্তিমান আতঙ্কের নাম। বর্তমানে বিভিন্ন প্রতিপক্ষ রাষ্ট্র অপর পক্ষের লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানিবার জন্য অত্যাধুনিক কমব্যাট ড্রোন ব্যবহার করিয়া থাকে। নূতন প্রযুক্তির ড্রোনে অত্যাধুনিক জঙ্গি জেটের সহিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও সংযোজন করা হইতেছে। অর্থাত্ নূতন প্রযুক্তির কমব্যাট ড্রোন আরো দক্ষতার সহিত প্রতিপক্ষের উপর আঘাত হানিতে সক্ষম হইবে। সুতরাং ড্রোনের কথা শুনিলে যুদ্ধবিমানের ছায়া দেখিবার মতোই আতঙ্ক তৈরি হইতে পারে।
ইহা হইল কমব্যাট ড্রোনের কথা, যাহা দেখিতে ছোটখাটো বিমানের মতো; কিন্তু সকল কিছুরই ভালোমন্দ—উভয় দিক রহিয়াছে। বিজ্ঞানী আলফ্রেড বের্নহার্ড নোবেল ১৮৬৭ সালে যখন ডিনামাইট আবিষ্কার করেন, তখন তিনি ভাবিয়াছিলেন, ডিনামাইটের ধ্বংসাত্মক ক্ষমতাকে নগর ও ভূমি উন্নয়নকাজে ব্যবহার করা হইবে; কিন্তু ঘটিয়াছিল উলটা ঘটনা। ড্রোনের ক্ষেত্রে আবিষ্কার যেই ধ্বংসাত্মক উদ্দেশে, তাহা পরবর্তীকালের বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে গঠনমূলক ও উন্নয়নকাজে ব্যবহার শুরু হয়। বলা যায়, কোয়াডকপ্টারের মতো ছোট সাইজের ড্রোনের সদর্থক ব্যবহার এখন সমগ্র বিশ্বের বাস্তবতা। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী কৃষি উন্নয়ন, আবহাওয়ার তথ্য সংগ্রহ, মশার ঔষধ স্প্রে করা, বিভিন্ন সার্ভে পরিচালনা, চলচ্চিত্র নির্মাণ, নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের কাজে ড্রোনের অপরিহার্য ব্যবহার রহিয়াছে। তবে আকার অনুযায়ী ড্রোন উড্ডয়ন নীতিমালা না থাকায় অনিয়ন্ত্রিত ও অননুমোদিত ড্রোন উড়ানোর কারণে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ভঙ্গ বা সন্ত্রাসী কার্যকলাপে ইহার অপব্যবহারের আশঙ্কাও থাকিয়া যায়।
বাংলাদেশে ড্রোন উড়ানোর জন্য ২০১৪ সাল হইতে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) অনুমতি লাগে। তবে পত্রিকান্তরে জানা গিয়াছে, ব্যক্তিপর্যায়ে আবেদন করিয়া অনুমতি পাইবার কোনো নজির নাই। আবার ড্রোন আমদানির ব্যাপারে কোনো নীতিমালাও ছিল না। বাংলাদেশে সর্বোচ্চ দুই হইতে তিন কেজি ওজনের ড্রোন আসে। এই সকল ড্রোনে ইনবিল্ট ক্যামেরা থাকে। ফটোগ্রাফার ও ভিডিওগ্রাফাররাই ইহার প্রধান ব্যবহারকারী। কেহ কেহ বিনোদনের জন্যও ব্যবহার করেন। অবশেষে ইন্টারন্যাশাল সিভিল অ্যাভিয়েশন অর্গানাইজেশনের (আইকাও) পরামর্শে কিছু সাধারণ শর্ত রাখিয়া দুনিয়াব্যাপী নীতিমালা তৈরি করা হইতেছে। বিমানবন্দর এলাকা নিরাপদ রাখিবার জন্য বিলম্বে হইলেও বাংলাদেশে গত বুধবার অনুমোদিত হইয়াছে ড্রোন নিবন্ধন নীতিমালা ২০২০। নীতিমালা অনুযায়ী ড্রোনের ওজন, উড্ডয়নক্ষমতা ও ব্যবহার অনুযায়ী চারটি শ্রেণিতে ভাগ করা হইয়াছে। ‘ক’ শ্রেণির ড্রোন সংরক্ষিত এলাকা ব্যতীত তিন-পাঁচ কিলোমিটার পর্যন্ত ৫০ ফুট উচ্চতায় এবং পাঁচ কেজির কম ওজনের ড্রোন উড্ডয়ন করিতে পারিবে। বিনোদনের জন্য এই ড্রোন যে-কেহ উড়াইতে পারিবে। আমরা মনে করি, ড্রোনের ব্যাপারে একটি স্বচ্ছ নীতিমালা জরুরি ছিল। প্রতিবেশী দেশ ভারতেও ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে সর্বসাধারণের জন্য ড্রোন উড়াইবার ক্ষেত্রে অনলাইনভিত্তিক একটি অভিন্ন নীতিমালা চালু করিয়াছে। এতদিন বাংলাদেশে ড্রোন উড়াইবার অনুমতি চাহিলেও পাওয়া যাইত না। আবার যেই শ্রেণির ড্রোন বিনোদন ও খেলনা হিসাবে ব্যবহার করা হয়, তাহাও অবৈধ ছিল।
প্রযুক্তির এই যুগে আমাদের পিছাইয়া থাকিলে চলিবে না। কথায় আছে, ‘দ্বার বন্ধ করে দিয়ে ভ্রমটারে রুখি/ সত্য বলে আমি তবে কোথা দিয়ে ঢুকি?’ ড্রোনের ক্ষেত্রেও ‘দ্বার বন্ধ’ না রাখিবার ও সঠিক নীতিমালা প্রণয়নের বিষয়টি জরুরি ছিল। ইহার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে অনুমোদনের বিষয়টি সহজ ও স্বচ্ছ হওয়াটাও জরুরি।