স্বপন কুমার সাহা
৩০ লাখ শহিদের রক্ত এবং ২ লাখেরও বেশি মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানি কারাগার থেকে ফিরে স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। ধ্বংসস্তূপ থেকে নতুন দেশ গড়ার কাজ সহজ ছিল না। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে নতুন রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে যখন বঙ্গবন্ধু দেশ গড়ার দ্বিতীয় বিপ্লব শুরু করলেন, তখনই একাত্তরের পরাজিত শক্তি তাকে সপরিবারে হত্যা করে। একদল বিপথগামী সেনা কর্মকর্তা দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীদের মদতে এই রক্তাক্ত অধ্যায় রচনা করে। শুধু বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বিদেশে থাকায় বেঁচে যান। ষড়যন্ত্রকারীরা রক্তমূল্যে কেনা স্বাধীন বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তানের অংশে পরিণত করতে চেয়েছিল।
সেই থেকে আগস্ট মাস বাঙালির শোকের মাস। বাঙালি জাতির হূদয়ে রক্তক্ষরণ শুধু এই একটি মাসে সীমাবদ্ধ থাকে তা নয়, এই শোক অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে অব্যাহত লড়াইয়ে এক চিরায়ত প্রেরণা হিসেবে কাজ করে। তবে এটা ঠিক, প্রতি বছর আগস্ট শোকের আবহ হিসেবে আসে, স্মরণ করিয়ে দেয় পঁচাত্তরের সেই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের কথা। ব্যথিত হূদয়ে আমরা স্মরণ করি, শ্রদ্ধা নিবেদন করি, সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি সঞ্চয় করি বঙ্গবন্ধুর রক্ত থেকে। এবার করোনা মহামারির কারণে আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধতা থাকলেও জাতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও অঙ্গীকারে ১৫ আগস্ট পালন করেছে। পুরো আগস্ট মাসে অনুষ্ঠানমালা আয়োজিত হয়েছে স্বাস্থ্যবিধি মেনে। এখনো বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ও তার স্মরণে বিভিন্ন অনুষ্ঠান চলছে সারাদেশে। ভবিষ্যতেও তাকে আমরা সারা বছর ধরেই মনে রাখবো, রাখবো হূদয় মন্দিরে।
বঙ্গবন্ধুর পতাকা বহন করে জাতিকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারই যোগ্য উত্তরসূরি জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনা। একাত্তরের পরাজিত শত্রুরা বিভিন্ন সময় শেখ হাসিনাকেও হত্যার চেষ্টা চালায়। বঙ্গবন্ধুকন্যার অপরাধ, তিনি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর পাকিস্তানি ধারায় ফিরে যাওয়া মাতৃভূমিকে আবার মুক্তিযুদ্ধের ধারায় ফিরিয়ে এনেছেন, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার করেছেন, মুক্তিযুদ্ধের বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছেন এবং সর্বোপরি ‘তলাবিহীন ঝুড়ির’ কালিমা থেকে দেশকে মুক্ত করে অর্থনীতিকে দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করেছেন। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ‘সোনার বাংলা’কে বাস্তবে রূপ দিতে তিনি নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। শেখ হাসিনার এই লড়াই সহজ ছিল না। একাত্তরের পরাজিত শক্তি বঙ্গবন্ধুর ধারা রুদ্ধ করে দিতে তাকে অনেকবার হত্যার চেষ্টা করেছে, তার মধ্যে ভয়াবহতম ছিল ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভেনিউতে গ্রেনেড হামলা। যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহূত আর্জেস গ্রেনেডের এই হামলায় প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন প্রাণ হারান, আহত হন পাঁচ শতাধিক, যাদের অনেকে এখনো গ্রেনেডের স্প্লিন্টার বহন করে চলেছেন। শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মানববর্ম রচনা করে রক্ষা করেন, তবে তিনি বাম কানে আঘাত পান, যার কারণে শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হামলাকারীরা এক গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে এই রক্তাক্ত অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছিল, যার মূল লক্ষ্য ছিল শুধু বঙ্গবন্ধুকন্যাকে হত্যা নয়, বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগকেও নিশ্চিহ্ন করা। কারণ বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা এবং জাতীয় চার নেতাকে হত্যার পরও মুক্তিযুদ্ধের ধারা ধ্বংস করে দেওয়া যাচ্ছিল না। শেখ হাসিনা বিদেশের মাটি থেকে ফিরে আসার পর আওয়ামী লীগের হাল ধরেন। তারা জানত না আওয়ামী লীগের শক্তি এদেশের মানুষের হূদয়ের অনেক গভীরে প্রোথিত। এই শক্তিকে নির্মূল করা যায় না। শক্তিশালী বিদেশি প্রভু থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তান পারেনি।
শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা শুধু পিতাকে হারাননি, হারিয়েছেন মা ফজিলাতুন্নেছাকে, যিনি বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবনে প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছেন। হারিয়েছেন ভাই শেখ কামাল, শেখ জামাল ও ছোট্ট রাসেলকে। বিশ্বইতিহাসের দৃষ্টিতেও এটি একটি নৃশংসতম রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। এটি একটি পরিবারের বেঁচে যাওয়া সদস্যদেরই শুধু ভারাক্রান্ত করে না, গোটা জাতিকেও শোকবিহ্বল করে। হত্যাকারীরা গোটা জাতির সামনে থেকে মুক্তিযুদ্ধের পতাকা সরিয়ে নিতে চেয়েছিল। সৃষ্টিকর্তার অশেষ দয়ায় ২১ আগস্ট শেখ হাসিনার জীবন রক্ষা পেয়েছে, তিনি এই পতাকা বয়ে নিয়ে চলেছেন দৃপ্ত পদভারে। ফিরে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধের বাংলাদেশ।
এবারের শোকের মাস বা গত আগস্ট মাস আরো বেদনাবহ হয়ে দাঁড়ায় দুটি মৃত্যুর ঘটনায়। যদিও স্বাভাবিক মৃত্যু, তবু জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। একজন মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার মেজর জেনারেল (অব.) সি আর দত্ত বীর উত্তম। অন্যজন বাংলাদেশের মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু, মুক্তিযুদ্ধে আমাদের সাথি, প্রজ্ঞাবান রাজনীতিক ও ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়। পরিণত বয়সে তাদের মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু এই মৃত্যু আমাদের শোকবিহ্বল করে, আপনজন হারানোর বেদনা অনুভব করছে বাংলাদেশের মানুষ।
মেজর জেনারেল দত্ত একাত্তরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেজর ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর মুক্তিসংগ্রামের ডাকে সাড়া দিয়ে মৃত্যুকে তুচ্ছ করে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ৪ নম্বর সেক্টরের দায়িত্বে ছিলেন তিনি, বৃহত্তর সিলেটের বিস্তীর্ণ এলাকা ছিল তার অধীনে। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু জেনারেল দত্তকে সীমান্তরক্ষী বাহিনী ‘বাংলাদেশ রাইফেলস (বর্তমান বর্ডার গার্ডস বাংলাদেশ)’ সংগঠিত করার দায়িত্ব দেন এবং তাকে মহাপরিচালক নিযুক্ত করেন। তিনিই এই বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা মহাপরিচালক। জেনারেল দত্ত আমৃত্যু বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের পতাকা বহন করেছেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধের সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। মুক্তিযুদ্ধের মূলধারার পরিপূরক শক্তি হিসেবে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে সামনের কাতারে ভূমিকা রেখেছেন। সেই জেনারেল দত্ত চলে গেলেন গত ২৪ আগস্ট আমেরিকায় এক হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায়। সময়ের বিবেচনায় বাংলাদেশের হিসাবে দিনটি ছিল ২৫ আগস্ট।
আর প্রণব মুখোপাধ্যায় চলে গেলেন গত ৩১ আগস্ট। দিল্লির আর্মি রিসার্চ অ্যান্ড রেফারেল হাসপাতালে চিকিত্সাধীন ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময়, পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সব দুঃসময়ে তিনি ছিলেন এদেশের মানুষের পাশে। ছিলেন বঙ্গবন্ধু পরিবারের একান্ত আপনজন। বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হওয়ার পর তার দুই অসহায় কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার কার্যত অভিভাবক ছিলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শোকবার্তায় তা অকুণ্ঠচিত্তে উল্লেখ করেছেন। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ধারা রক্ষা এবং সামরিক শাসনের অবসানে প্রণববাবুর ভূমিকা ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য শেখ হাসিনা প্রণববাবুকে অনন্য সম্মাননায় ভূষিত করেন। প্রণববাবুর স্ত্রীর জন্ম বাংলাদেশে, বাড়িভিটা তাদের এখনো রয়েছে।
সব মৃত্যু এক নয়। তা সত্ত্বেও বাঙালির শোকের মাসে বেদনার জায়গাটা আরো ভারী হয়, অস্বীকার করতে পারি না। মুক্তিযুদ্ধ উল্লেখ হলেই যেমন জেনারেল দত্ত আসেন, তেমনি প্রণববাবুও এসে পড়েন বাঙালি মানসে। বাংলাদেশে মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের সংগ্রামের অধ্যায়ে এ দুটি নাম যুক্ত হয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মৃত্যুর সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে করতেই এত দূর এসেছেন, করোনাকালেও তিনি পিছিয়ে পড়েননি। মহামারিকে শক্ত হাতে মোকাবিলা করছেন, জাতিকে দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। এবারে শোকের মাসেও তার এই পথচলা থেমে থাকেনি। এই দুই মৃত্যু তাকেও বেদনাহত করেছে। তিনি যে শোকবার্তা দিয়েছেন, তাতে এ বিষয়ে গভীরতা বোঝা যায়।
লেখাটা তৈরির পর জানতে পারি, মুক্তিযুদ্ধের আরেক সেক্টর কমান্ডার লে. কর্নেল আবু ওসমান চৌধুরীও চলে গেছেন। তিনি চলে গেলেন গত ৫ সেপ্টেম্বর। মুক্তিযুদ্ধের ধারার আরেক বীর সেনানি। যদিও আগস্ট নয়, তবু তার মৃত্যু মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তির প্রাণ, যারা তার হাতকে শক্তিশালী করেছে সামনের কাতারে থেকে, তাদের মৃত্যু আমাদের বেদনার আবহকে আরো সম্প্রসারিত করল।
n লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক