অবকাঠামোগত উন্নয়নেই মিলবে অর্থনৈতিক মুক্তি

মুমতা হেনা মীম

দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে প্রগতিশীল ও ত্বরান্বিত করার জন্য প্রয়োজন উন্নত অবকাঠামো। পরিবহন ও যোগাযোগব্যবস্থা, বিদ্যুত্, গ্যাস ও পানি সরবরাহ, বন্দর, বাঁধ ও সেতু নির্মাণ, টেলিযোগাযোগ, শক্তিসম্পদ প্রভৃতি উপাদানগুলো অর্থনীতিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অবদান রাখে। উন্নয়নের প্রাথমিক পর্যায়ে এসব সুদৃঢ়ভাবে গড়ে তোলার ফলেই দেশের সার্বিক উন্নয়ন গতিশীল হয়। আশার কথা হলো—আমাদের দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হচ্ছে। এই করোনাকালে অবকাঠামো উন্নয়নের কাজে খানিকটা স্থবিরতা দেখা গেলেও বর্তমানে তা কাটিয়ে উঠে আবার কাজ শুরু হয়েছে। ২০১০ সালে বাংলাদেশ পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্রের যুগে প্রবেশ করে। পাবনার ঈশ্বরদীতে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুেকন্দ্রটির উত্পাদনে আসার কথা রয়েছে ২০২৪ সালে। শত বাধা উপেক্ষা করে বাঙালির স্বপ্নের পদ্মা সেতু প্রায় দৃশ্যমান। সেতু বিভাগ সূত্রে জানা যায়, জুলাই পর্যন্ত মূল সেতুর কাজের অগ্রগতি ৮৯ দশমিক ২৫ শতাংশ, নদীশাসনের কাজের ৭৪ শতাংশ এবং প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি হচ্ছে ৮১ শতাংশ। আশা করা যাচ্ছে—২০২২ সালের মধ্যেই এ প্রকল্পের কাজ শেষ হবে। উন্নত রাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশেও চলবে মেট্রোরেল।

দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও জনসংখ্যা বৃদ্ধিজনিত কারণে আমদানি-রপ্তানি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই বন্দরসুবিধাদি বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি। এ দাবি পূরণের লক্ষ্যেই সরকার কক্সবাজারের মাতারবাড়ী এবং পটুয়াখালীর পায়রাতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের কার্যক্রম শুরু করেছে। মাতারবাড়ী বন্দর হলো কক্সবাজারের মাতারবাড়ী এলাকায় প্রস্তাবিত গভীর সমুদ্রবন্দর। কক্সবাজার জেলার মহেশখালীতে বিদ্যুেকন্দ্রের জন্য আনা কয়লাবাহী জাহাজ ভেড়ানো জেটিকে সম্প্রসারণ করে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক বন্দর হিসেবে নির্মাণ করা হবে। এই বন্দরে ড্রাফটের জাহাজ অনায়াসে প্রবেশ করতে পারবে। মাতারবাড়ী বন্দরের গভীরতা ১৬ মিটার হওয়ায় প্রতিটি জাহাজ ৮ হাজারের বেশি কনটেইনার আনতে পারবে। মাতারবাড়ী বন্দর স্থাপনের কাজে প্রায় ১৪ দশমিক তিন কিলোমিটার দীর্ঘ একটি নৌ-চ্যানেল তৈরি করছে জাইকা। প্রধান নেভিগেশনাল চ্যানেল ৩৫০ মিটার প্রশস্ত। সে সঙ্গে বন্দরের অর্থায়নে নির্মাণ করা হবে ১০০ মিটার দীর্ঘ জেটি। ২০২৬ সালের নভেম্বরে গভীর সমুদ্রবন্দরটির বহুমুখী টার্মিনাল কনটেইনার জাহাজের জন্য প্রস্তুত হবে।

অর্থনীতিতে গতি আনতে মেগা প্রকল্পের পাশাপাশি ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নে এসেছে অভূতপূর্ব উন্নতি। কৃষি, শিক্ষা, বিদ্যুত্, খাদ্য নিরাপত্তাসহ সার্বিক অর্থনীতিতে এখন সরব বিপ্লব। দেশকে উন্নতির দ্বারপ্রান্তে নিতে একের পর এক মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। এসব প্রকল্পের কাজ শেষ হলে ত্বরান্বিত হবে দেশের অর্থনীতি। কর্মসংস্থানের পাশাপাশি বাড়বে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক নির্মাণকাজ সম্পন্ন করার ফলে মানুষ এখন কম সময়ে যাতায়াত ও পণ্য পরিবহন করতে পারছে। জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থার অর্থায়নে কাঁচপুর, মেঘনা ও গোমতী সেতু নির্মিত হয়েছে। বর্তমানে ঢাকা-চট্টগ্রামে বুলেট ট্রেন চালু করার কথা ভাবা হচ্ছে। ঢাকা থেকে দক্ষিণাঞ্চলে যেতে ঢাকা-মাওয়া চার লেনের সড়কটিও শেষ হয়েছে সফলভাবে।

শেখ হাসিনার উদ্যোগ, ঘরে ঘরে বিদ্যুত্’ অঙ্গীকারকে সামনে রেখে বিদ্যুত্ উত্পাদনে মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ২০৪১ সালের মধ্যে ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদনের মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ক্যাপটিভ ও নবায়নযোগ্য বিদ্যুত্সহ উত্পাদনক্ষমতা ২৪ হাজার মেগাওয়াট। দেশের ৯৬ শতাংশ মানুষকে বিদ্যুত্সুবিধার আওতায় আনা হয়েছে। মাথাপিছু বিদ্যুত্ উত্পাদন ৫১০ কিলোওয়াট-ঘণ্টা। বর্তমানে ১৬ হাজার ৮৭৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার ৪৮টি বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণাধীন। ২ হাজার ৭৮৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার ১২টি বিদ্যুেকন্দ্রের চুক্তিস্বাক্ষর প্রক্রিয়াধীন। অদূরভবিষ্যতে আরো ১৬টি বিদ্যুেকন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নগরায়ণের ফলে পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন চাহিদা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ চাহিদা পূরণে সরকার পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন অবকাঠামো নির্মাণসহ কারিগরি সহায়তার আওতায় পরিকল্পনা প্রণয়ন ও প্রাষ্ঠািনিক উন্নয়নে সহায়তা করছে। এছাড়া বন্যা, সাইক্লোন, মহামারি ইত্যাদির কারণে সৃষ্ট জরুরি পরিস্থিতিতে নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশনব্যবস্থা সচল রাখার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম বাস্তবায়ন হচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। কৃষি উত্পাদনে সেচের পানি খুবই গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হিসেবে ব্যবহূত। আমাদের দেশের মানুষ কৃষিকার্যে অনেকাংশেই প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে সে অবস্থা থেকে অনেকাংশেই বের হওয়া সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে পরিবেশ সংরক্ষণের দিকে লক্ষ্য রেখে দেশের ভূগর্ভ ও ভূ-উপরিস্থ পানির সুপরিকল্পিত ব্যবহার নিশ্চিত করে ফসল উত্পাদনে নিবিড়তা, বহুমুখীকরণ, ফলন বৃদ্ধির প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

মানুষের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধির জন্য গৃহীত প্রকল্পগুলো নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। দেশের আর্থসামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন, উত্পাদন ও মাথাপিছু আয় বৃদ্ধিকরণের মাধ্যমে দেশকে উন্নত করা সম্ভব। প্রকল্পগুলো যথাসময়ে বাস্তবায়নের জন্য সর্বপ্রথম প্রয়োজন বাস্তবায়নের অন্তরায় সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করা এবং দৃঢ়ভাবে সমস্যাগুলো সমাধান করা। সম্প্রতি করোনা মহামারির ফলে দেশের অপূরণীয় আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। তবে ইতিমধ্যে আমরা খুব নাজুক হয়ে পড়েছি। রপ্তানি-আমদানি বাণিজ্য কমেছে, রেমিট্যান্স কমেছে। কারণ, প্রায় ১৪-১৫ লাখ মানুষ, যারা বিদেশে কর্মরত ছিলেন, তারা দেশে ফিরেছেন বা ফেরার অপেক্ষায়। প্রকল্পগুলো যদি সঠিক সময়ে, সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন হয় তবে অর্থনীতির চাকা সচল হবে এবং ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। ফলে কয়েক বছরের মধ্যে এ ক্ষতিগুলো কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে দেশ।

n লেখক :শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়