আফজাল তাহফি রোহান
কি শহর, কি গ্রাম—চারদিকেই প্রতারণার ফাঁদ পাতা। একের পর এক প্রতারিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। পদে পদে প্রতারিত হয়ে সর্বস্ব খোয়াচ্ছে সহজ-সরল মানুষ। সমাজে চলতি পথে প্রতারণার এমনই জাল বিছানো যে ঘরে বসেও রেহাই পাচ্ছে না কেউ। প্রতারণার নানা কৌশল নিয়ে একটি চক্র সর্বদা সজাগ। তাদের ফাঁদে পড়ে খোয়াতে হচ্ছে তিলে তিলে গড়া সঞ্চয়টুকুও। বিয়ে করে কানাডায় নিয়ে যাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে এক প্রবীণের কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার খবর এখন অন্যতম আলোচনার বিষয়। এই ভয়াবহ প্রতারণার শিকড়-বাকড় ব্যক্তি-পরিবার থেকে শুরু করে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়েও ক্রমে ছড়িয়ে পড়ছে।
ডিজিটাল জীবন ব্যবস্থাপনায় ‘প্রতারণাও’ ডিজিটাল রূপ পেয়েছে। এখন ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড যেমন জালিয়াতি করে যে কারো অ্যাকাউন্ট খালি করা হচ্ছে, তেমনি গলাকাটা পাসপোর্ট তৈরি, বিদেশ থেকে ভুয়া ওয়ার্ক পারমিট সংগ্রহ, নিয়োগপত্র প্রস্তুত, মোবাইল ফোনে লাখ লাখ টাকা লটারি পাওয়ার প্রলোভনযুক্ত বার্তা পাঠিয়ে প্রতারণা চলছে হরদম। কপটদের নানা বুদ্ধির কৌশলী ফাঁদে শুধু যে গ্রামের সহজ-সরল, অজ্ঞ-অসচেতন মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তা নয়, শহুরে শিক্ষিত সচেতন নাগরিকেরাও এসব প্রতারণার ফাঁদে পা দিয়ে সর্বস্ব খুইয়ে চলেছে অহরহ। রাস্তাঘাটের যেখানে-সেখানে দেখা যায় পার্টটাইম চাকরির বিজ্ঞাপন। এসব লোভনীয় চাকরির বিজ্ঞাপনের পাতা ফাঁদে পা দিলেই বিপদ। ইমিগ্রান্ট ভিসা দেওয়ার লোভ দেখিয়ে সর্বস্বান্ত করা হচ্ছে অনেককে। সরকারি বিভিন্ন দপ্তর-অধিদপ্তরে লোভনীয় চাকরি দেওয়ার নামে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নেওয়া চক্রের তত্পরতা চলছে দেশ জুড়েই।
খাদ্য অধিদপ্তর, বিজিবি, কাস্টমস বিভাগসহ সরকারি বিভিন্ন সংস্থার নামে দেওয়া ভুয়া নিয়োগপত্র দেখিয়ে বেকার তরুণদের কাছ থেকে লক্ষাধিক টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন ম্যারেজ মিডিয়ার সহযোগিতায় প্রতারণার নতুন ফাঁদ খুলে বসেছে রাজধানীর কিছুসংখ্যক তরুণীর সংঘবদ্ধ চক্র। রূপসী তরুণীদের নেতৃত্বে গজিয়ে ওঠা এসব চক্রের অপতত্পরতা বন্ধ হয়নি এখনো। প্রতারণার আগ্রাসী থাবার সামনে প্রেমও আর নির্বিঘ্ন থাকছে না। ভুয়া মসজিদ-মাদ্রাসার নামে টাকা তোলে একদল প্রতারক। চিকিত্সাবিজ্ঞান এখন অবধি করোনার সফল ভ্যাকসিন বানাতে না পারলেও কবিরাজেরা করোনার ভুয়া প্রতিষেধক বিক্রি করছে। হাতুড়ে ডাক্তার ও লতাগুল্মের মতো এসব ভুয়া কবিরাজে সয়লাব হয়ে আছে গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত সর্বত্র। জাদুটোনা দিয়ে শত্রুকে বশে আনা, অন্যের স্ত্রী বশীকরণ, মনের মানুষকে পাওয়ার অব্যর্থ কবচ, এমনকি অপারেশন না করে ঝাড়ফুঁক দিয়েই পেটের পাথর অপসারণ করার মতো কামেল লোকের ছড়াছড়ি আছে দেশে। দয়াল চেংরা বাবার দোয়ায় নানান সমস্যা কেটে যায়, বহু আশা পূর্ণ হয়। দালালেরা ইচ্ছাকৃতভাবে অ্যাক্সিডেন্ট করিয়ে সুস্থ পথচারীদের অসুস্থ বানিয়ে চুক্তিবদ্ধ হাসপাতালে নিয়ে চিকিত্সার নামে মোটা অঙ্কের বিল ধরিয়ে দিচ্ছে। বহুদিন ধরে বিদেশে উচ্চশিক্ষার নামে একধরনের প্রতারণা মহামারি রূপে দেখা দিয়েছে। সঠিক তথ্য জানা না থাকায় অনেকে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে এসব প্রতিষ্ঠানে। রাতে রাজধানী জুড়ে পুলিশ সোর্স পরিচয়ধারীদের ভয়ংকর প্রতারণার জালে পড়ে শত শত মানুষ বিপাকে পড়ছে। অনেক পথচারী তাদের এই আবেগমিশ্রিত মিথ্যার জালে আটকে যায়। কিছু মহিলার প্রতারণা অন্য মাত্রার। তারা দেখতে ধনী মনে হয় এমন পথচারীদের থামিয়ে বলে, সে তার ছেলের জন্য অপেক্ষা করছে, কিন্তু তার কাছে মোবাইল না থাকায় ছেলেকে ফোন করতে পারছে না। এতে ঐ পথচারী তার নিজের ফোনে তার সেই কথিত ছেলেকে কল করে। ফলে প্রতারক চক্ররা তার নম্বর পেয়ে যায়। সুযোগমতো তাকে কল করে বিভিন্ন প্রতারণার জালে আটকে হাতিয়ে নেয় তার সর্বস্ব। বিদেশি বন্ধুর পাঠানো ভুয়া উপহার আনতে গিয়ে অনেকে হারাচ্ছে লক্ষাধিক টাকা। বিকাশে প্রতারণার ফাঁদে পড়ে অনেক বিকাশ এজেন্ট লাখ লাখ টাকা হারাচ্ছে। রাজধানীতে ঘটমান সব প্রতারণার বর্ণনা দিতে গেলে কলামের পর কলাম লিখতে হবে। তবু শেষ হবে না বর্ণনা।
চারদিক দিয়ে ‘প্রতারকমণ্ডলী’ দ্বারা পরিবেষ্টিত পুরো সমাজব্যবস্থাই যেন প্রতারণাময় হয়ে উঠেছে। প্রতারকদের এহেন রাজত্ব থেকে দেশের নাগরিকেরা মুক্তি চায়, কিন্তু দেশের প্রশাসনের কাজের ধীরগতির কারণে কাঙ্ক্ষিত মুক্তি মিলছে না। তাদের আরো বেশি সক্রিয় হতে হবে। আইনের শাসন কঠোর করতে হবে। প্রলোভনে পা দেওয়া ব্যক্তিদেরও শাস্তির আওতায় আনতে হবে। রাজধানী ও দেশবাসীকে একটি প্রতারণার জালমুক্ত দেশ উপহার দিতে সরকারেরও সুদৃষ্টি প্রয়োজন। পাশাপাশি সচেতন ও শিক্ষিত নাগরিকদের এই সমস্যা নিরসনে ফ্রন্টলাইনার হতে হবে। দেশবাসীকে সচেতন করতে হবে। নয়তো নাগরিক জীবনের এই দুর্দশাপন্ন অবস্থা কখনোই কাটবে না।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়