কাসাভা চাষ চাহিদা ও সম্ভাবনা প্রচুর প্রয়োজন উদ্যোগের

 

কাসাভা। অনেকের কাছে এই নামটি অপরিচিত হলেও ‘শিমুল আলু’ বললে বেশ পরিচিত মনে হয়। দেশের পাহাড়ী অঞ্চলে বহু বছর ধরে অনেকটা অবহেলায় চাষ হওয়া আলু জাতীয় এই উদ্ভিদটি এখন বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় অর্থকরি ফসল। দেশের বাজারে এর প্রচুর চাহিদা ও সম্ভাবনা রয়েছে। প্রয়োজন শুধু সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে যথাযথ উদ্যোগ।

এই সম্ভাবনার কথা জেনে সিলেটের কানাইঘাটে পতিত ২০০ একর জমি এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় ১৫০ একর জমি লিজ নিয়ে কাসাভা চাষ শুরু করেছেন কৃষক মাসুক মিয়া। কিন্তু কেন? উত্তরে তিনি বলেন, আমি আগে সবজি চাষ করতাম। রোগবালাইয়ের কারণে ফসল কম হতো। এখন কাসাভা চাষ শুরু করেছি। এই ফসলে তেমন কোনো যত্ন নিতে হয় না। কোনো রোগবালাইও নেই। দু’টো জমিতে আমার প্রায় ৮০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। জমি লিজের টাকা বাদে এর পুরোটাই প্রাণ গ্রুপ দিয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে এ বছর প্রায় দেড় কোটি টাকা কাসাভা বিক্রির প্রত্যাশা করেন মাসুক মিয়া।

সম্ভাবনা দেখে এই কাজে উদ্বুদ্ধ হয়ে শ্রীমঙ্গল উপজেলার কালাপুর ইউনিয়নের মাজদিহি হুদার পাহাড়ের ৬০ একর পতিত জমিতে কাসাভা চাষ করছেন কৃষিবিদ রাজীব কুমার রায়। পাশাপাশি মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার জয়চন্ডি ইউনিয়নের রঙ্গিরকুল গ্রামের শুভদ্রা জিউ মন্দিরের প্রায় ২০০ একর পতিত জমিতে কাসাভা চাষ করছেন লিটন দত্ত। প্রত্যাশিত ফসল হলে খরচের প্রায় দ্বিগুণ লাভের আশা করছেন চাষীরা।

প্রতি একর জমি থেকে ৬-৭ টন কাসাভা পাওয়া যায়। এর পাতা ও অবশিষ্ট অংশ দিয়ে জৈব সার হয়। কাসাভা থেকে উন্নত মানের স্টার্চ হয়। কাসাভা দিয়ে গ্লুকোজ, বার্লি, সুজি, রুটি, নুডলস, ক্র্যাকার্স, কেক, পাউরুটি, বিস্কুট, পাঁপর, চিপসসহ নানাবিধ খাদ্য তৈরি করা যায়। এছাড়াও কাসাভা থেকে উত্পাদিত স্টার্চের বড় আকারের ব্যবহার রয়েছে বস্ত্র ও ওষুধ শিল্পে। পোশাক শিল্প, ঔষধ শিল্প এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে প্রতি বছর সাড়ে ৩ লাখ টন কাসাভা স্টার্চ প্রয়োজন। কিন্তু দেশে বছরে উত্পাদন হয় ৫ থেকে ৬ হাজার টন। বাকিটুকু ভারত, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করতে হয়। দেশে প্রতিবছর ১০-১৫% কাসাভা স্টার্চের চাহিদা বাড়ছে।    

বাংলাদেশে কাসাভা চাষ নিয়ে ২০০১ সাল থেকে কাজ করছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফসল (বিএইউ) উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সুলায়মান আলী ফকির। তিনি গবেষণা করে দু’টি জাত পেয়েছেন। তবে, এখনো অবমুক্ত করতে পারেননি। ভালো জাতের জন্য গবেষণা চালাচ্ছেন। দেশে কাসাভা চাষের সম্ভাবনা নিয়ে তিনি ইত্তেফাককে বলেন, এটি নির্ভর করে ব্যবহারের ওপর।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনষ্টিটিউটের কন্দাল ফসল গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. বিমল চন্দ্র বলেন, বাংলাদেশে চাষের জন্য কাসাভা অপেক্ষাকৃত নতুন ফসল। এটির জাত উন্নয়নে গবেষণা করার জন্য আমাদের পর্যাপ্ত জনবল নেই, যেটি আমাদের মূল সমস্যা। জনবল ছাড়া এর জাত উন্নয়ন সম্ভব নয়। কাসাভার ক্ষতিকর দিক নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কাসাভা চাষের প্রভাবে পরিবেশের যে ক্ষতির কথা সেটি খুব সামান্য। এতে সমস্যা হওয়ার কথা না। তবে, একই কেন্দ্রের উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এটিএম তানজিমুল ইসলাম বলেন, জাত উন্নয়নের জন্য আমরা ভিয়েতনাম থেকে কিছু উপাদান নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু অভিযোজন হয়নি। এই আবহাওয়ায় খাপ খায়নি।

ভিয়েতনাম, ভারত ও থাইল্যান্ডসহ বেশ কয়েকটি দেশে বছরে দুইবার কাসাভার ফলন হয়। এতে তাদের উত্পাদন বেড়েছে, খরচ কমেছে এবং সর্বোপরি চাষীরা লাভবান হচ্ছে। কাসাভার চাষের প্রধান সমস্যা পানি। তিন থেকে চার ঘণ্টা কাসাভা পানিতে থাকলে বা এর মাটি ভেজা থাকলে গাছ মারা যেতে পারে। তাই উঁচু ও শুষ্ক জমি প্রস্তুত রাখাও আরেকটি চ্যালেঞ্জ।

২০১৪ সালে কাসাভার কন্ট্রাক্ট ফার্মিং শুরু করে প্রাণ। হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে প্রাণের কাসাভা প্রক্রিয়াজাতকরণের প্ল্যান্ট রয়েছে। যেখানে প্রতি বছর প্রায় ৬০ হাজার টন কাসাভা প্রক্রিয়াজাত করা যাবে। এখানে স্টার্চ বাদেও কাসাভাজাত বিভিন্ন পণ্য তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। চলতি মৌসুমে চুক্তিবদ্ধ কৃষকেরা ৬ হাজার একর পাহাড়ি ও সমতল জমিতে কাসাভার চাষ করছে। ৫ হাজার চাষী এই ফসল চাষে সম্পৃক্ত আছে। টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, জামালপুর, কুমিল্লা, হবিগঞ্জ, সিলেট ও খাগড়াছড়ি জেলায় অনাবাদী এবং অপেক্ষাকৃত উঁচু জমিতে কাসাভা চাষ হচ্ছে। চাষীদেরকে কাসাভা চাষের প্রশিক্ষণ, আর্থিক প্রণোদনা, কৃষি উপকরণ সহায়তা এবং স্বল্পমূল্যে বীজ দিয়ে কাসাভা চাষীদের সহায়তা করছে প্রাণ।

এ বিষয়ে প্রাণ এগ্রো বিজনেস লিমিটেড চিফ অপারেটিং অফিসার মাহতাব উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশে চাহিদানুযায়ী স্টার্চ প্রায় পুরোটাই আমদানি নির্ভর। এজন্য এখাতে সম্ভাবনা অনেক। প্রাণ হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে দৈনিক ২০০ টন কাসাভা প্রক্রিয়াজাত করার ক্ষমতাসম্পন্ন কারখানা রয়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত কাঁচামাল নেই। উন্নত জাতের মাধ্যমে বছরে দুইবার কাসাভা চাষ করে প্রতি একর জমি থেকে ১৪-১৫ টন কাসাভা পাওয়া সম্ভব হবে বলেও তিনি মনে করেন।