ব্রিটেন গত ৩১ জানুয়ারি ২০২০ সাল রাত ১১টায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পর্ক বিচ্ছেদের মধ্য দিয়ে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সুদীর্ঘ ৪৭ (১৯৭৩-২০২০) বছরের পথচলার অবসান ঘটিয়ে ‘একলা চলা’ নীতি গ্রহণ করেছে ব্রিটেনবাসী, যাকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন নতুন যুগের সূচনা বলে অভিহিত করেছেন। সেই সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দেন আগামী দিনে ব্রিটেনের বহুবিধ নয়া চ্যালেঞ্জের কথা। বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসের কারণে ব্রিটেনের নয়া চ্যালেঞ্জকে ইস্পাতের মতো আরো কঠিনতর করেছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা। অন্যদিকে বিরোধী দলের প্রধান বৈচিত্র্য ব্রিটেন গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন। মূলত ব্রেক্সিট নিয়ে ব্রিটিশ জনগণের মধ্যে টানাপোড়েনের সৃষ্টি হয় ২০১৬ সালের দিকে। তত্কালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেবিট ক্যামেরন ব্রেক্সিট ইস্যু নিয়ে গণভোটের আয়োজন করেন, যেখানে প্রায় ৫২ শতাংশ ব্রিটেন ব্রেক্সিটের পক্ষে রায় দেন। যদিও ক্যামেরন ব্রেক্সিটের বিরুদ্ধে ছিলেন এবং পরে তিনি অনেকটাই বাধ্য হয়ে পদত্যাগ করেন। সেই ব্রেক্সিট ইস্যু প্রশ্নে প্রায় চার বছরের চাপা উত্তেজনার আপাতত ইতি ঘটে গত ৩১ জানুয়ারি। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, ব্রেক্সিট-পরবর্তী ইউরোপসহ অন্যান্য মহাদেশের সঙ্গে ব্রিটেনের বর্তমান ও ভবিষ্যত্ সম্পর্ক কেমন হবে। এতে কতটুকু ইতিবাচক ফসল ঘরে ওঠাবে ব্রিটেনবাসী? প্রকৃতপক্ষে, সেই প্রশ্নের উত্তরের জন্য অপেক্ষা করতে হবে দীর্ঘদিন, সে কথা বলা বাহুল্য। দীর্ঘদিনের চাপা ক্ষোভ ও বিভিন্ন কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে আসা ব্রিটেনবাসীর কাছে তাত্পর্য ছিল, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ইস্যু হচ্ছে অভিবাসীর চাপ থেকে দূরে থাকা, নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের চর্চা করা ও ধরে রাখা, ইইউর বড় আর্থিক অনুদান লাঘব করা, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন থেকে মুক্তিলাভ, বেকারত্বের হার কমানো ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, বিশ্বের সঙ্গে অবাধ বাণিজ্য গড়ে তোলা, নিজ দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বিশ্বরাজনীতির মঞ্চে একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা ইত্যাদি।
উল্লেখ্য, আগামী ডিসেম্বর মাসে ইইউর সঙ্গে বাণিজ্যিক মেয়াদ শেষ হচ্ছে ব্রিটেনের। ইউরোপীয় ইউনিয়ন-পরবর্তী বর্তমান ব্রিটেনের রাজনৈতিক প্রসঙ্গে একটু ফিরে আসা যাক। একসময় দুর্দান্ত প্রতাপের সঙ্গে বিশ্ব শাসন করা ব্রিটেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত থেকে বিশ্বরাজনীতির মঞ্চে একক আধিপত্য বিস্তার করতে পারছে না। অথচ ব্রিটেন জাতিসংঘের স্থায়ী সদস্য, পারমাণবিক ও সামরিক শক্তিশালী, এ-৭ এবং আধুনিক অস্ত্রসজ্জিত দেশ, যেখানে ১৯৯১ সালে তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে দ্বিখণ্ডিত হওয়ার পরও রাশিয়া আজ বিশ্বরাজনীতিতে এককভাবে আবার পরাক্রমশালী দেশ হিসেবে আবির্ভূত হতে সক্ষম হয়েছে। তুরস্ক আন্তর্জাতিক রাজনীতির মঞ্চে এখন শক্তিশালী প্রতিপক্ষ, যেখানে ব্রিটেনের অবস্থা খুবই নাজুক। এখন ব্রিটেনবাসী চায় বিশ্বরাজনীতির মঞ্চে নিজের অবস্থান শক্ত করতে। এছাড়া ব্যাপক অভিবাসী ইইউভুক্ত দেশে, বিশেষ করে বড় একটা অংশ ব্রিটেনে আশ্রয় নেওয়ার কারণে বেড়েছে সহিংসতা, মুসলিম বিদ্বেষ ও জঙ্গিবাদের মতো ঘটনা, যা ব্রিটেনের জনগণকে স্বাভাবিকভাবে মর্মাহত করেছে। এমনকি দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যের প্রতি এসেছে বড় আঘাত, যা মুক্তমনা ব্রিটেনবাসী খুব সহজে মেনে নেয়নি। মূলত ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে আসার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হবে। কারণ তৈরি পোশাকের প্রায় ৬০ শতাংশ রপ্তানি হয় ইইউর দেশগুলোতে, যার বড় সুবিধা হলো বিনা শুল্কে ব্রিটেন ও ইইউর দেশগুলো পণ্য পাঠাত বাংলাদেশ। এখন আর এই সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা নেই, যার ফলে ব্রিটেনের সঙ্গে নতুন বাণিজ্যিক চুক্তি করতে হবে বাংলাদেশকে। যদিও ব্রেক্সিট চূড়ান্ত কার্যকর হতে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এর মাঝখানের সময় ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ব্রিটেন মুক্ত বাণিজ্য সম্পর্ক রাখতে পারে।
বর্তমান বৈশ্বিক মহামারি কোভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাবের ধকল এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি ইউরোপের অনেক দেশ, যেখানে ব্রিটেনের প্রাণহানি ও আক্রান্তের সংখ্যা নিছক কম নয়। এই ক্রান্তিলগ্নে ব্রিটেনের পাশে ছিল না ইউরোপের কোনো দেশ। কার্যত দীর্ঘদিনের মিত্র যুক্তরাষ্ট্রও কোনো সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়নি। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জুসেপ্পে কন্তেকে এই দুর্যোগকালে ইইউ থেকে কোনো সহযোগিতা না পেয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায়। এমনকি তিনি ইইউ থেকে বের হয়ে আসার হুমকি দেন, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের ব্যর্থতার সুস্পষ্ট প্রতিফলন। বলতে দ্বিধা নেই, ব্রিটেন ইইউ ত্যাগ করে ‘একলা চলা’ নীতি অনুসরণ করার ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বড় ধরনের নেতৃত্ব ও আস্থার সংকট সৃষ্টি হয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে ইইউর প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ব্রিটেনের ন্যায় অন্য দেশগুলো ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগ করে একলা চলা নীতি অনুসরণ করলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। বলা যায়, এখন ব্রিটেনের জনগণ ইউরোপীয় ইউনিয়নের তৈরি নীতিমালা ও আইনকানুন থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন। তাদের আর ইইউর কোনো আইন বা নিয়মনীতি মেনে চলতে হবে না। আগামী প্রজন্ম বেড়ে উঠবে পুরোনো ব্রিটেনে নতুন স্বাধীনতার স্বাদ নিয়ে। সেই সঙ্গে আগামী দিনে ‘একলা চলা’ নীতি গ্রহণে রাজনীতি ও নতুন অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্রিটেনবাসীকে এক কাতারে দাঁড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া