আমরা সবাই কল্যাণমূলক, সম্প্রীতিময় সমাজে বসবাস করতে চাই। যেখানে থাকবে না আতঙ্ক, যেখানে থাকবে না অন্যায়-অবিচার কিংবা অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। এই সম্প্রীতিময় সমাজ গঠন আদৌ সম্ভব কি না তা নিয়ে বহু বিতর্ক হয়তো হতে পারে কিন্তু আমরা প্রত্যেকে যদি নিজ নিজ অবস্থান থেকে চেষ্টা করি তবে তা অসম্ভব নয়। এক্ষেত্রে আমাদের দায়িত্বটাই বেশি। সম্প্রীতিময় সমাজ গঠনের জন্য সবার আগে প্রয়োজন পারস্পরিক ভালোবাসা। এই পারস্পরিক ভালোবাসা মানে সমাজের শ্রেণি-ধর্ম-বর্ণ-পেশা নির্বিশেষে সবাইকে ভালোবাসা। এক্ষেত্রে ভালোবাসা পাওয়ার আগে ভালোবাসার চেষ্টা করতে হবে। এটা কোনো প্রশিক্ষণমূলক বা হাতেকলমে শেখার বিষয় না বরং স্বেচ্ছায় ভালো আচরণের চর্চা এবং সকলের সঙ্গে সৌজন্যমূলক ব্যবহারই আমাদের ভালোবাসতে শেখাতে পারে।
আমরা ছোটবেলা থেকেই যে শিক্ষাটা সাধারণত পেয়ে থাকি তাহলো বাবা-মা, ভাইবোন, নিকটাত্মীরাই আমাদের আপনজন। প্রথমত আমাদের এই মনোভাব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে যে নিকটাত্মীয় মানেই আপনজন নয় বরং যে সমাজে আমরা বসবাস করি, যাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তায় আমাদের দৈনন্দিন জীবন অতিবাহিত হয় তারা সকলেই আমাদের আপনজন। আমরা তো তাদের ওপর প্রবলভাবে নির্ভরশীল। দূর শহরে বা অন্যত্র বসবাস করা আমাদের আত্মীয়দের সঙ্গে বছরে দুই-একবার সাক্ষাত্ হওয়া, তাদের কাছ থেকে টুকটাক উপহার পাওয়া আর নিয়মিত ফোনে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কথাবার্তা হওয়ার মাধ্যমে তারা আপনজন হয়ে যায়। অন্য দিকে কাজের বুয়া বা কাজের ছেলেটা, মেয়েটা আমাদের সকালের নাস্তা থেকে শুরু করে ঘর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা, কাপড় ধোয়া থেকে নিত্যনৈমিত্তিক সব কাজের প্রধান সহায়ক। তাহলে তারা কেন আপনজন নয়? আমরা এমনভাবে ভাবতে শিখিনি। অশুদ্ধ ভাষা, ময়লা ময়লা চেহারা আর ছেঁড়া কাপড় পরা কেউ আমার আপনজন হতে পারে না এমন মনোভাব পোষণ করি। আমরা যদি কাজে সহায়তাকারী বা কাজের ছেলেমেয়েটাকে আপনজন ভাবতে পারতাম তবে তাদের চেহারা, পোশাক-পরিচ্ছদের অবস্থা কখনোই অমন হতো না।
আমাদের যাদের অনেক টাকা আছে কিংবা পৈতৃক বা ব্যক্তিগত যোগ্যতায় বড় পর্যায়ে পৌঁছে যাই তারাই সমাজের অন্যদের তাচ্ছিল্য করতে শুরু করি। সেটা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলে। শুধু এটুকু বদলে ফেললেই আমাদের মধ্যে ভালোবাসার বীজ বপন হয়ে যাবে। যা ভালোবাসার সুন্দর বৃক্ষে পরিণত হয়ে সম্প্রীতিময় সমাজ গঠন করবে। প্রথমে আমি থেকে ভালোবাসার শুরুটা করতে হবে, দেখা যাবে ধীরে ধীরে সেটা তুমি, তোমরা সবার মধ্যে পৌঁছে যাবে। বাসের হেলপারের সঙ্গে ভালোভাবে কথা বললে সে কখনোই পালটা খারাপভাবে কথা বলবে না। দোকানে গিয়ে দোকানির দোষত্রুটি ধরতে থাকলে সে কখনোই ভালো ব্যবহার করবে না। সমাজের এটা খুব স্বাভাবিক নিয়ম। তাই নিজেদের মধ্যে আচরণগত মূল্যবোধের পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।
তাই ভালোবাসতে হবে নিজেকে, নিজের আপনজনকে, সমাজে বসবাস করা সকল শ্রেণিপেশার মানুষকে। এই পারস্পরিক ভালোবাসাই আমাদের এনে দেবে সম্প্রীতিময় সুন্দর সমাজ।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়