জীবনের মহাজন

ইদানিং মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কের বালাই নাই। যে যার মতো চলছে। দুই হাতে গাছের ছোট দুইটা ডাল নিয়ে এলোপাথারি তাল বাজাতে বাজাতে বটতলা থেকে বাজারের দিকে হেলেদুলে যাচ্ছে বরকত। এলাকার লোকজন তাকে ‘বরকইত্তা পাগলা’ ডেকে শান্তি পায়। কে কী ডাকল, কে কী করল বরকতের তাতে কিছু আসে যায় না। রাগ ক্রোধহীন বরকত দাঁত না মাজলেও একটা স্বর্গীয় হাসি দিয়ে পরিবেশকে সবসময় তরতাজা রাখে। স্বাধীন বাংলার একমাত্র স্বাধীন যুবক বরকত। সে কল্পনা করে—শেখ মুজিব তার কলিজার বন্ধু। দুইজন একসাথে মাছ ধরত, লাটিম খেলত, ডিগবাজি দিয়ে পুকুরে গোসল করত। বরকত যখন খুব ছোট, এলাকার মানুষ তখন থেকেই তাকে চেনে। ছোটকাল থেকেই বাজারে তার জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। কেউ কেউ বরকতের লুঙ্গি ধরে টান মারে। তাতে বরকত কিছুটা লজ্জিত হয়ে জিহ্বায় কামড় দিয়ে নিজ হাতে লুঙ্গিটাকে গুছিয়ে নেয়। কেউ কেউ মায়া করে দুয়েক টাকা দেয়, কেউবা আকিজ বিড়ি কিনে দেয়, কেউ রুটি-বিস্কুট-কলা। যার যা মনে চায় বরকতের সাথে তা-ই করে। এতে বরকতের কোনো আনন্দ বা দুঃখ কিছুই হয় না। বরকতকে কেউ পুরোপুরি আনন্দের ভাগ দেয় না এটা যেমন সত্য, আবার বরকতকে কেউ পুরোপুরি দুঃখও দেয় না এটাও সত্য। বরকতকে দেখে আমার একটু মায়া জাগল। জসিমের দোকান থেকে একটা রুটি কিনে বরকতের হাতে দিলাম। বরকত রুটিটা হাতে নিয়ে দেখল—তার হাতের তৈল চকচকে রুটিটার দিকে তিন দিক থেকে তিনটা কুকুর তাকিয়ে আছে। দ্বিতীয় কোনো চিন্তা না করেই রুটিটাকে তিন ভাগ করে বরকত তিনটা কুকুরের দিকে ছুড়ে মারল। আমি অবাক চোখে তাকিয়ে থাকলাম। যার নিজের খাবারের নিশ্চয়তা নাই সে কিনা এই দুর্দিনে অভুক্ত কুকুরকে নিজের পুরো ভাগটাই দিয়ে দিল। তিনটা কুকুর যে অনাহারে ভুগছে এতে সন্দেহ নাই। গত সপ্তাহেও এদের মধ্যে বেশ লাফালাফি ঝাঁপাঝাঁপি ছিল। আজ দেখি কেমন রুগ্ন মলিন মুখ। পেটের চামড়াও মিশে যাচ্ছে বুকের হাড়-হাড্ডির সাথে। বরকত কুকুরগুলোর রুটি খাওয়ার দৃশ্য দেখে মিটিমিটি হাসছে। বরকতের বাড়ি কোথায়, বাপ মা কে—এসব তথ্য মানুষের অজানা। মানুষ কেবল বরকইত্তা পাগলাকেই চেনে, জানে। একবার বাজারের এমাথা থেকে ওমাথা আবার ওমাথা থেকে এমাথা যাওয়া আসা করা লোকটার নামই বরকত। কোনো কোনো সময় দুয়েক জনকে চায়ের কাপটা এগিয়ে দেয়। বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে দোকানদারদের দুয়েক কলসি টিউবওয়েলের পানি এনে দেয়। এভাবেই কেটে যায় বরকতের সারাদিন। রাত গভীর হলে বাজারের যেকোনো দোকানের বারান্দায় ঘুমিয়ে থাকে বরকত। হঠাত্ বাজারে হুলুস্থুল শুরু হয়ে গেল। সকলের তাড়াহুড়া আর দোকানপাটের সাটার নামানোর শব্দ। একজন আরেকজনকে বলতে লাগল, ‘বাড়িত যা বাড়িত যা’। আমি ও খায়ের স্কুল গেটের দেয়ালে স্লোগান লিখছি—‘নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখি, সদা সুস্থ-সবল থাকি’। বাজারের পশ্চিম দিক থেকে একটা হুইসেলের শব্দ এলো। ব্রাশে লাল রং নিয়ে আমি স্লোগান লেখায় মনোযোগী। খায়ের আমার কানের কাছে মাথাটা বাড়িয়ে মৃদুস্বরে বলল, ‘ভাই, দু-তিনটে সেনাবাহিনীর গাড়ি আসতেছে’। আমি ঘাড় ফিরিয়ে তাকিয়ে দেখলাম, গাড়ি থেকে সৈনিকরা নেমে মানুষজনকে কী যেন বলছে। আর পুলিশের কয়েকজন কনস্টেবল খোলা দোকান, রিকশা, সিএনজি ও বাজারে জমায়েত মানুষকে লাঠি হাতে তাড়া করছে। সবাই দৌড়াচ্ছে নিজের মতো। খায়ের আমাকে বলল, ‘ভাই, চলেন আমরাও যাই। পুলিশ এলে সমস্যা’। খায়েরকে বুঝালাম, ‘জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমরা মানুষের সচেতনতার লক্ষ্যে কাজ করছি। ভয় পেয়ো না। পুলিশ এলে আমি কথা বলবো।’ ততক্ষণে দেখলাম বরকতের সাথে দুজন সৈনিক কথা বলছে। দেখলাম বরকতের হাতে একজন সৈনিক একটা পোঁটলা দিল। বরকত পোঁটলাটা আবার ফেরত দিয়ে দিল। দূর থেকে সাদা লুঙ্গি পরা মেম্বার সাবও দেখছে এ দৃশ্য। মেম্বার সাবের দিকে আমার চোখ যেতেই মনে মনে একখান গালি দিলাম, ‘বাইঞ্চুদ, গরিবের হক মাইরা খাইয়া শরীরে তেলতেলা ভাব আনছোস! শালা চাল চোর, ডাল চোর। চোরের বাচ্চা চোর। কীভাবে দুইটা ডাকাইত্তা চোখ বের করে বরকতের পোঁটলার দিয়ে নজর দিচ্ছে।’ অথচ বরকত সৈনিকের দেওয়া পোঁটলা সৈনিককেই ফিরিয়ে দিল। ততক্ষণে বরকত যে পাগল সৈনিকদের তা বুঝতে আর বাকি থাকল না। অন্যজন কী যেন বিড়বিড় করে বলে বরকতকে একটা মাস্ক দিল। হাসিমুখে বরকত মাস্কটাকে গ্রহণ করল। মাস্কটা মুখে না দিয়ে বরকত বাম হাতের কব্জিতে বালার মতো বাঁধতে বাঁধতে পুবে রেললাইনের দিকে চলে গেল। ততক্ষণে আমার স্লোগান লেখাও শেষ। কয়েকজন সৈনিক দেখল এবং একটু শব্দ করে স্লোগানটা পড়ল। আমাদের দিকে একটু তাকাল, কিন্তু কিছুই বলল না। আমরাও ধীরপায়ে হেঁটে রেললাইনে গিয়ে দেখি রেললাইনের পাশের ডুমুর গাছতলায় বরকত শুয়ে হাসছে। হাসতে হাসতে স্বাভাবিক শব্দে বরকত বলছে, ‘মানুষ সব পাগল হয়া গেছে। এতদিন দেকতাম গরু-মইষের মুহে টোপা আর অহন দেহি মুহে টোপা পইরা মানুষগুলা সব গরু-মইষ হয়া যাইতাছে।’ আমি বরকতের কাছে গেলাম। বরকত অনর্গল হাসছে। হাসতে হাসতে বসন্ত বিকেলের মৃদু হাওয়ায় বরকতের চোখ বন্ধ হয়ে এল। হাতে হাতে বাহারি সদাই নিয়ে সকলেই বাড়ি ফিরছে। ছুটে যাচ্ছে যে যার নির্দিষ্ট খাঁচায়। বরকত স্বাধীন বাংলার একমাত্র স্বাধীন যুবক। বিড়বিড় করতে করতে চাল-খুঁটিহীন ঘরে পায়ের ওপর পা তুলে ঘুমিয়ে গেল তালাচাবিহীন মুক্ত জীবনের মহাজন ‘বরকইত্তা পাগলা’।

অলঙ্করণ :অভিজিত্ চৌধুরী