বিভিন্ন দেশে লক্ষ করা যায়, যাহারা ক্ষমতায় থাকেন তাহারা জোর দাবি জানান যে তাহারা গণতন্ত্র দিয়াছেন। আবার বিরোধীরা বলেন, গণতন্ত্র নাই। বাস্তবতা হইল, আমরা আমাদের পূর্বপুরুষের সময় হইতেই ইহা কী বস্তু তাহা দেখি নাই। কেহ আমাদের শিখাইতে চাহিয়াছেন সমাজতন্ত্র তথা কমিউনিজম, কেহ মাথায় দিতে চেষ্টা করিয়াছেন গণতন্ত্র—প্রকৃত অর্থে যাহার কোনো অস্তিত্ব নাই। ফলে তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহে আমরা এক কিম্ভূতকিমাকার শাসন কায়েম হইতে দেখিতেছি। এই সকল দেশে গণতন্ত্রের নামে সৃষ্টি হইয়া থাকে একদল লুটেরা। অথচ লুটেরা সৃষ্টির নাম তো পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা নহে! পুঁঁজিবাদের একটি ইতিবাচক দিক হইল ইহা প্রতিযোগিতা শিখাইয়া থাকে। আর প্রতিযোগিতার জন্য প্রয়োজন হয় দক্ষতা। কিন্তু শক্তির ব্যবহার, ক্ষমতার ব্যবহার ঐ প্রতিযোগিতাকেও বিলীন করিয়া দিতেছে।
আমরা নিজ দেশের দিকে ফিরিয়া দেখিতে পারি। কী হইতেছে সমগ্র দেশে? একদল লোক সরকারি দলের পরিচয় দিয়া অবকাঠামো-উন্নয়নের কাজ না করিয়া বিল তুলিয়া লইয়া যাইতেছে। একদল লোক সরকারি দলের পরিচয়ে বিভিন্ন অফিস-আদালতে প্রভাব বিস্তার করিয়া চলিয়াছে। সরকারি দলের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মী পরিচয়ে ইয়াবা নামক জঘন্য মাদক ব্যবসায়ের সঙ্গে জড়িত থাকিতেছে। এমন লোকও এই সকল অপকর্মে তাহার পরিচয়কে ব্যবহার করিতেছে, যাহার গাড়ি অথবা বাড়ি অথবা আস্তানা তল্লাশি করিবার সাহস প্রশাসনযন্ত্রের নাই। সরকারি দলের পরিচয় এমনই কলুষিত হইয়া উঠিতেছে যে, রাজাকার-আলবদরের সন্তানরা সরকারি দলে নাম লিখাইয়া অথবা দলের সাইনবোর্ড টাঙাইয়া, অথবা মুজিব কোট গায়ে চড়াইয়া দম্ভের সহিত কাউকে হুমকি দিয়া বক্তব্য রাখিতেছে, ‘ধরিলে ছাড়িব না।’ দেশের প্রচলিত আইন আছে, নাগরিকদের শক্ত সুরক্ষার কথা বলা আছে, নাগরিকদের অধিকারের কথা বলা আছে। কিন্তু তাহাদের এই দম্ভোক্তির উত্স কোথায় তাহা খতাইয়া দেখা দলের নীতিনির্ধারকদের অবশ্যকর্তব্য হইয়া পড়িয়াছে। আমরা লক্ষ করিতেছি, সরকারি দল হইতে অনুপ্রবেশকারীদের ব্যাপারে যত উদ্বেগের কথা বলা হইতেছে ততই যেন এই সকল অনুপ্রবেশকারীর আস্ফাালন বাড়িতেছে। তাহারা যেন সংখ্যায়ও বাড়িতেছে! এমনকি ক্ষেত্রবিশেষ পুলিশের চোখে অপরাধি ব্যক্তিও দলে বিশেষ বিশেষ পদে মনোনীত হইতেছে। আমরা অবাক হইয়া দেখি, দলীয় প্রধানের সদিচ্ছা ও নির্দেশনা থাকিবার সত্ত্বেও বিভিন্ন অঞ্চলে কিছু কিছু ব্যক্তি তাহাদের আচার-আচরণে ও কর্মকাণ্ড দ্বারা সাধারণ মানুষের মধ্যে দলটির প্রতি আস্থাকে ধ্বংস করিয়া চলিয়াছে। ইহার প্রতিকার লইয়া কাল নহে, আজই ভাবিতে হইবে। নচেত্ দেরি হইয়া যাইবে।
এই দলবাজি বা ‘দলব্যবসায়’ যাহাই বলি না কেন, তাহা ছড়াইয়া পড়িয়াছে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও। অধিকন্তু উপজেলা ও গ্রামাঞ্চলের মানুষ অপেক্ষাকৃত অসচেতন হওয়ায় এই দলীয় পরিচয় ব্যবহারকারীরা সেই সকল এলাকায় অধিক সরগরম হইয়া উঠিয়াছে। ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারকদের মনে রাখিতে হইবে, দলটির ঐতিহ্য ও লক্ষ্য টিকাইয়া রাখিতে হইলে এই সকল আগাছা বাছিয়া উচ্ছেদ করিতেই হইবে। ইহাও মনে রাখিতে হইবে যে, দলের ভাবমূর্তির সঙ্গে আপস করিলে যে ক্ষতি হইবে তাহা কোনোক্রমেই আর উদ্ধার করা সম্ভব হইবে না। সুতরাং আমাদের সুপরামর্শ থাকিবে— এই সকল অপশক্তিকে স্তব্ধ করুন। তাহাতে উপকারই হইবে, দল স্থায়ী ক্ষতির হাত হইতে রক্ষা পাইবে।