১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার বঙ্গবন্ধু হত্যার ছয় সপ্তাহ বা ৪২ দিন পর, অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী ষড়যন্ত্রকারী খুনি ও স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট খোন্দকার মোশতাক ‘অর্ডিন্যান্স’-এর আকারে একটি ‘ইনডেমনিটি আইন’ পাশ করেছিল। ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্সের উদ্দেশ্য ছিল ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের যে কোনো বিচার ও শাস্তি থেকে মুক্তি দেওয়া। এই অর্ডিন্যান্সের শিরোনাম ছিল ‘ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স ১৯৭৫’ যা ছিল ১৯৭৫ সালের ৫০ নম্বর অর্ডিন্যান্স। এই অর্ডিন্যান্সের অর্থ হচ্ছে ষড়যন্ত্রকারীরা খুনের দায়ে কোনো আদালতে বিচারের সম্মুখীন হবে না, কারণ তারা যে হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছে তা ‘ঐতিহাসিক প্রয়োজনে’ ঘটিয়েছিল! এই ঘৃণ্য খুনি ও তাদের সহযোগীরা হত্যাকাণ্ড বা মানবতাকে ভূলুণ্ঠিত করার মাধ্যমে ‘আঁধারের’ অভিমুখে যাত্রাকে ‘ঐতিহাসিক প্রয়োজন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল! এ ধরনের আইন মানব সভ্যতার কলঙ্ক। অথচ এই আইনই ঘোষণা করা হয়েছিল এই দেশে। এই অধ্যাদেশটি দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথম অংশে বলা হয়েছে, ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট ভোরে বলবত্ আইনের পরিপন্থি যা কিছুই ঘটুক না কেন, এ ব্যাপারে সুপ্রীম কোর্টসহ কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না। দ্বিতীয় অংশে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি উল্লিখিত ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে যাদের প্রত্যয়ন করবেন তাদের দায়মুক্তি দেওয়া হলো।
খুনিদের আইনের বিচার থেকে মুক্তি দেওয়াই শুধু নয়, খোন্দকার মোশতাক বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের অন্যতম দুই জন খুনি সৈয়দ ফারুক রহমান এবং আব্দুর রশিদ খোন্দকারকে মেজর থেকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে পদোন্নতি দেয়। ১৯৭৫ সালের ৩ অক্টোবর স্ব্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট মোশতাক বেতার ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যাকারী এই দুই জন সেনা কর্মকর্তাকে ‘সূূর্য সন্তান’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়। তখন রাষ্ট্রপতি ছিল খোন্দকার মোশতাক। মোশতাকের নির্দেশেই কেন্দ্রীয় কারাগারের সুরক্ষিত স্থানে বন্দি থাকা জাতীয় চার নেতাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। এরপর জেনারেল খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে আর একটি সামরিক অভ্যুত্থান হয়। ১৯৭৬ সালের ৭ নভেম্বর খালেদ মোশাররফকে হত্যা করা হয়েছিল এবং এর পরে জিয়াউর রহমান সরাসরি মঞ্চে আবির্ভূত হন।
প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে জিয়াউর রহমান বিচারপতি সায়েমের কাছ থেকে দায়িত্ব গ্রহণ করে ১৯৭৬ সালের ২৯ নভেম্বর। এ সময় মার্শাল ল প্রোক্লেমেশন জারি করা হয়। সামরিক ফরমানের তৃতীয় ঘোষণায় বলা হয়, ‘দ্য অ্যাফেয়ার্স টু দ্য কান্ট্রি উইল বি কনডাকটেড অ্যাজ পার ল দ্যাট হি (জিয়াউর রহমান) উইল ডিসাইড অর প্রোমালগেট।’ এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে বাংলাদেশে তখন সামরিক স্বৈরাচার বা এক ব্যক্তির শাসন চলছিল। ‘ইনস্টিটিউশনালাইজেশন অব ডেমোক্র্যাসি ইন বাংলাদেশ’ গবেষণা গ্রন্থে বলা হয়েছে, ‘আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য তখন সামরিক আইন জারি করা হয়নি, এ আইন জারি করা হয়েছিল সম্ভাব্য প্রতিরোধের আশঙ্কায়।’
জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামে জাতির পিতার নেতৃত্বের ইতিহাস নিষিদ্ধ করে রেখেছিলেন। শুধু তাই নয়। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের জিয়াউর রহমান বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসে চাকরি দিয়েছিল। এমনকি বঙ্গবন্ধু শব্দের প্রতিও জিয়াউর রহমানের ভীতি ছিল। জেনারেল এরশাদ ও খালেদা জিয়াও বঙ্গবন্ধু হত্যার বেনিফিশিয়ারি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয় লাভ করে সরকার গঠনের পর ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর ইনডেমনিটি আইন বাতিল করা হয়। ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ৫ম সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করে বাংলাদেশ হাইকোর্ট। ইনডেমনিটি আইন বাতিলের পর ১৯৯৬ সালের ২ অক্টোবর ধানমন্ডি থানায় বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচারের জন্য একটি মামলা দায়ের করা হয়। ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর মামলার যাবতীয় কার্যক্রম শেষে ১৫ জন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। আসামিপক্ষের ১৫ জন উচ্চ আদালতে আপিল করার সুযোগ পায়। এই আপিলে ১২ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল এবং তিন জনকে খালাস প্রদান করা হয়। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার এই পর্যায়ে ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত-বিএনপি জোট ক্ষমতাসীন হয়। ফলে মামলার সার্বিক কার্যক্রম থমকে যায়।
২০০৮ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ জয় লাভ করার পর আওয়ামী লীগ সরকার বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার আবার চালু করেছিল। ২০০৯ সালে লিভ-টু-আপিলের মাধ্যমে এ বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। আপিল শেষে ১২ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন মহামান্য আদালত। ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি তাদের মধ্যে পাঁচ জনের ফাঁসির মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। পলাতকদের মধ্যে একজন বিদেশের মাটিতে মৃত্যুবরণ করেন এবং আরো একজন ক্যাপ্টেন মাজেদ দেশে এসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা দেয়। পরে তাকে দেওয়া আদালতের রায় কার্যকর করা হয়। ইনডেমনিটি আইন বাতিল হওয়ার কারণেই বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হয়েছে কিন্তু বঙ্গবন্ধুর খুনিদের মদতদানকারী ব্যক্তি ও গোষ্ঠী কর্তৃক দেশ ও মানবতাবিরোধী ষড়যন্ত্র করে বাংলাদেশকে আঁধারের দিকে ঠেলে দেওয়ার প্রচেষ্টা বন্ধ হয়েছে কী?
n লেখক : সাবেক চেয়ারম্যান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়