‘প্রান্তিক’ এবং ‘প্রান্তিকতা’ বিষয়ে আমাদের অনেকেরই ধারণা অস্পষ্ট। বিভিন্ন মানদণ্ডে মানুষের ‘প্রান্তিকতা’ বিবেচনা করা যায়। আর্থ-সামাজিক বিবেচনায় ‘প্রান্তিকতা’ হচ্ছে মানুষের চরম নিম্নাবস্থা। সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সূচকে তাদের কোনো অর্জন নেই। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিত্সা, বাসস্থান, বিশুদ্ধ পানি পান, পয়ঃনিষ্কাশনব্যবস্থা, সঞ্চয়, মাথাপিছু আয়সহ প্রভৃতি সূচকে তাদের অবস্থা শোচনীয়। অবস্থাগত কারণে সমাজ তাদের প্রতি অবজ্ঞা ও অবহেলা প্রদর্শন করছে।
শহর এবং গ্রামের অনেক প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত যোগাযোগ আছে। বিশেষত নাপিত, ধোপা, দিনমজুর, সিএনজিচালক, রিকশাচালক, ভ্যানচালক ও কৃষিশ্রমিকসহ অনেকের সঙ্গে। এ করোনাকালে শুনছি তাদের দুর্দশার কথা। অনেকে মোবাইলফোনে আর্থিক সহায়তাপ্রাপ্তির কথা জানাচ্ছেন। বহুল জনতা ও জাতি-গোষ্ঠীর এদেশে বিভিন্ন জাতি, গোষ্ঠী ও সম্প্রদায় দীর্ঘকাল থেকে অবহেলিত এবং অনগ্রসর। দলিত ও হরিজন সম্প্রদায় চরমভাবে অবহেলিত। তারা নিজ পেশার মাধ্যমে সমাজের সেবা করে চলেছে। জেলে, কামার, কুমার, মুচি, ঋষি, বেহারা, নাপিত, ধোপা, হাজম, নিকারী, পাটানি, তেলি, ডোম, বাঁশফোর, তেলুগু প্রান্তিক জনগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত।
‘বেদে’ সম্প্রদায় যাযাবর। মালবেদে, সাপুড়িয়া, বাজিকর, টোলা, রিরসিকারী, সান্দার, গাইন বেদেসহ ৮টি গোত্রে বিভক্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়ায়। তাদের পেশা তাবিজ বিক্রি, সর্পদর্শন চিকিত্সা, সাপের খেলা দেখানো, আধ্যাত্মিক স্বাস্থ্যসেবা, ভেষজ ওষুধ বিক্রি, কবিরাজি, বানর খেলা ইত্যাদি। এ করোনাকালে এসব মানুষ সম্পূর্ণ কর্মহীন। হিজড়া সম্প্রদায় মানববৈচিত্র্যের একটি অন্যতম দিক এবং জনসংখ্যার অতি ক্ষুদ্রতম অংশ। তারাও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত। জনবৈচিত্র্যের এদেশে ৪৫-এর বেশি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস। তারা অধিকাংশই ভূমিহীন, দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষ। এসব প্রান্তিক মানুষ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাস করে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় পিছিয়েপড়া ৯ পেশার ৫৩ লাখ প্রান্তিক মানুষের সংখ্যা নিরূপণ করেছে। তাদের মধ্যে আছে বেদে, কুমার, জেলে, কামার, স্বর্ণকার, বাঁশ-বেতের কর্মী, কাঠ মিস্ত্রি, মিষ্টি প্রস্তুতকারক এবং নাপিত। আবার পরিসংখ্যা ব্যুরোর তথ্য মতে দেশে মোট বস্তির সংখ্যা ১৩,৯৪৩। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হয়ে অসহায় মানুষগুলো বস্তিবাসী হচ্ছে, যারা প্রান্তিক জীবন যাপন করছে।
উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ। করোনাকালে মানুষ কর্মহীন হয়েছে, শহর ছেড়েছে, ক্ষুদ্র ব্যবসা বন্ধ হয়েছে। প্রান্তিক মানুষদের অবস্থা চরম পর্যায়ে। সম্প্রতি বেসরকারি একটি সংস্থা উপকূলের ৬ জেলার ২৪০ দরিদ্র, নারীপ্রধান ও নিম্ন আয়ের পরিবারের ওপর জরিপ চালায়। তাতে দেখা যায়: লকডাউনে নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েছে ৫৪ শতাংশ, খাদ্য সংকটে পড়েছে ৫৭ শতাংশ পরিবার, মহাজন থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়েছে ৬৩ শতাংশ পরিবার, সঞ্চয় ভেঙেছে ৪৮ শতাংশ পরিবার এবং গরু-ছাগল বিক্রি করেছে ৩৫ শতাংশ পরিবার।
বর্তমান সমাজকল্যাণবান্ধব সরকার দেশের অসহায় ও বিপন্ন মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তাবলয়কে সুদৃঢ় করছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় অসহায়, নিগৃহীত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে ব্যাপক কর্মসূচি নিয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বয়স্কভাতা, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতাভাতা, অসচ্ছল প্রতিবন্ধীভাতা, ক্যাপিটেশন গ্রান্টসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে ১ কোটির অধিক ব্যক্তি সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ে সম্পৃক্ত হয়েছে। বিশেষত প্রান্তিক জনগোষ্ঠী তথা হিজড়া, বেদে ও অনগ্রসর এবং ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী জীবনমান উন্নয়নে বিশেষ ভাতা, শিক্ষা উপবৃত্তি, ব্যক্তিগত অনুদান ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে। তাছাড়া মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয় (ভিজিডি ও মাতৃত্বকালীন ভাতা) এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় (ভিজিএফ, খোলা বাজারে চাল বিক্রি, কাবিটা) প্রান্তিক মানুষের কল্যাণে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে চলেছে। পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় প্রান্তিক মানুষগুলোর টিকে থাকা এক মহা চ্যালেঞ্জ। পরিশেষে, সমৃদ্ধ জীবনের অংশীদার হোক সবাই। জয় হোক অসহায় প্রান্তিক মানুষের।
চট্টগ্রাম