খুলনা আওয়ামী লীগের প্রস্তাবিত কমিটি নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে

খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের প্রস্তাবিত কমিটি নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে উঠেছে। চূড়ান্ত অনুমোদনের আগেই প্রকাশ হয়ে পড়া খসড়া তালিকায় নাম না থাকায় দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে দলের পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে বিগত নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া, সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের পরিবারের সদস্য, অতীতে আওয়ামী লীগ রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত না থাকা ব্যক্তি, রাজাকারপুত্র এবং বিগত সময়ে দলের কোনো কমিটিতে না থাকলেও অর্থবাণিজ্যের মাধ্যমে নতুন কমিটিতে অনেককে ঠাঁই দেওয়া হয়েছে।

এদিকে, খসড়া কমিটি থেকে বাদ পড়া সাবেক জেলা কমিটির ১৩ জন সদস্য কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ সভাপতির নিকট জেলা কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ এনে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

সূত্র জানায়, ২০১৯ সালের ১০ ডিসেম্বর নগরীর সার্কিট হাউজ মাঠে খুলনা জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে দুটি কমিটির (মহানগর ও জেলা) সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা করা হয়। কিন্তু করোনা সংকটের কারণে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় পূর্ণাঙ্গ কমিটির জন্য কেন্দ্র গত ১৫ সেপ্টেম্বর সময় বেধে দেয়। এ সময় মহানগর কমিটি কেন্দ্রে তালিকা পাঠালেও ব্যর্থ হয় জেলা কমিটি। জেলা সভাপতি শেখ হারুনুর রশিদ ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সুজিত্ কুমার অধিকারী কমিটির তালিকা প্রণয়নে ঐক্যমত হতে না পারায় গত ১৪ সেপ্টেম্বর পৃথক দুটি কমিটি নিয়ে আলাদাভাবে তারা ঢাকায় যান। গত ১৫ সেপ্টেম্বর বিকেলে খুলনা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক ও কেন্দ্রীয় সদস্য অ্যাডভোকেট গ্লোরিয়া সরকার ঝর্ণা এমপি আওয়ামী লীগের ধানমন্ডি কার্যালয়ে খুলনা জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হারুনুর রশিদ ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সুজিত্ কুমার অধিকারীকে নিয়ে সমঝোতা বৈঠক করেন। ঐ বৈঠক ব্যর্থ হলে পুনরায় ১৭ সেপ্টেম্বর বৈঠক হয়। এই বৈঠকে রাজশাহী বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেনের উপস্থিতিতে খসড়া জেলা কমিটি করা হয়। এতে সভাপতি শেখ হারুনুর রশিদ ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সুজিত্ কুমার অধিকারী যৌথভাবে স্বাক্ষর করেন।

এদিকে গত ২১ সেপ্টেম্বর জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক ও রূপসা উপজেলার আইচগাতী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আশরাফুজ্জামান বাবুল স্বাক্ষরিত খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়া সাবেক কমিটির ১৩ জন সদস্য আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকট জেলা কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ এনে লিখিত অভিযোগ দেন। এতে তারা বলেন, খসড়া কমিটিতে ত্যাগী ও গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের নাম বাদ দিয়ে গ্লোরিয়া সরকার ঝর্ণা এমপি ক্ষমতার অপব্যবহার করে তার পছন্দের ৫-৬ জন অখ্যাত ও অরাজনৈতিক ব্যক্তিকে জেলা কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করেন। এ ছাড়া এই কমিটিতে দুদকের দুর্নীতি মামলার আসামি অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা প্রশান্ত কুমার রায়কে সহসভাপতি, উপজেলা নির্বাচনে নৌকার বিরুদ্ধের প্রার্থী শেখ মনিরুল ইসলামকে সহসভাপতি, রাজাকারপুত্র নূর ইসলাম বাদশাকে শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন সম্পাদক, এক সময়ের ছাত্র শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত রাজাকারপুত্র প্রভাষক মনোয়ার হোসেনকে সদস্য, পঞ্চম শ্রেণি পাশ দর্জির কাজ করা মোজাফফর মোল্লাকে শ্রমবিষয়ক সম্পাদক, কেন্দ্রীয় উপ-কমিটি থেকে বহিষ্কৃত এস এম জাহিদুর রহমানকে কোষাধ্যক্ষ, আওয়ামী লীগের প্রাথমিক পদ নেই গাজী মামুনুর রশিদকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক, প্রেমচাঁদ মণ্ডলকে সাংগঠনিক সম্পাদক, মৃণাল বিশ্বাসকে দপ্তর সম্পাদক এবং শ্রীমন্ত অধিকারী রাহুলকে ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক, উপজেলা নির্বাচনে নৌকার বিরুদ্ধের প্রার্থী গাজী এজাজ আহমেদকে উপপ্রচার সম্পাদক, জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হারুনুর রশিদের স্ত্রী মেহের নিগার স্বপ্না, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সুজিত্ কুমার অধিকারীর ভাতিজা অমিয় অধিকারী এবং অ্যাডভোকেট গ্লোরিয়া সরকার ঝর্ণা এমপির চাচাতো বোন অতসী সরকার, খালা দান কুমারী বিশ্বাস, নিকট আত্মীয় লিপিকা বৈরাগী, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা সরদার ইলিয়াছ হোসেন, রবার্ট নিক্সন ঘোষ ও  গত উপজেলা নির্বাচনে ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজিত প্রার্থী মোস্তফা সরোয়ারকে সদস্য করা হয়েছে। মোস্তফা সরোয়ারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি জাতির জনকের ম্যুরাল ভেঙে ছিলেন। তিনি এক জন বিতর্কিত ব্যক্তি ও একসময় বিএনপির ডাকসাইট নেতা ছিলেন।

দলের ত্যাগী নেতারা অভিযোগ করেন, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হারুনুর রশিদের স্ত্রী মেহের নিগার স্বপ্নাকে কখনোই রাজনীতির মাঠে দেখা যায়নি। অপরদিকে, দলের জন্য ত্যাগ শিকারকারী জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি অসীতবরণ বিশ্বাসকে আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক করা হয়েছে। আর তার থেকে জুনিয়র ও অখ্যাতদের বড় পদ দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে ফেসবুকে অসীতবরণ বিশ্বাস ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

খসড়া কমিটি থেকে বাদ পড়া বিগত জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক হুমায়ুন কবির ববি বলেন, দুর্নীতি-সন্ত্রাসমুক্ত নিষ্ঠাবান যোগ্য কর্মী দিয়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় আওয়ামী লীগকে যেভাবে গড়ে তুলতে চান খুলনা জেলা কমিটিতে তার প্রতিফলন নেই।

খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সুজিত্ কুমার অধিকারী বলেন, পদ প্রত্যাশী অনেকে পদ না পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে অনেক কথা বলতে পারেন। তবে, অর্থের বিনিময়ে কাউকে পদ দেওয়া হয়নি সেটা বলতে পারি। যারা এ ধরনের অভিযোগ তুলছে তারাও কতখানি স্বচ্ছ সেটাও দেখতে হবে। আমরা কেন্দ্রের কাছে কমিটি জমা দিয়েছি। তারাই নাম যাচাই-বাছাই করে কমিটি ঘোষণা করবেন।

জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হারুনুর রশীদ বলেন, দলের জেলা কমিটিতে রাজাকার পরিবারের সদস্য, বিতর্কিত ব্যক্তি ও হাইব্রিডদের ঠাঁই হবে না। তাছাড়া যারা বাদ পড়েছেন তারা আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন। অনেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। আর আমার স্ত্রী আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পাশে গত ৪০ বছর ধরে আছেন। এছাড়া অর্থের বিনিময়ে কমিটিতে কাউকে অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ সত্য নয়।