কোভিড-১৯ বিশ্বকে বদলে দিয়েছে। এই বদল হওয়া অব্যাহত থাকবে দির্ঘ সময় ধরে। স্বাভাবিকভাবেই বিশ্ব পর্যটনেও এর প্রভাব অনস্বীকার্য। তবে তাত্পর্যপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, কোভিড-১৯-পরবর্তী বিশ্বে পাঁচটি খাত ব্যাপকভাবে ও বহুমাত্রিকতা নিয়ে আবির্ভূত হবে। উল্লিখিত পাঁচ খাতের একটি হচ্ছে ডোমেস্টিক ট্যুরিজম বা অভ্যন্তরীণ পর্যটন। এখানে হাতে গোনা যে দেশগুলোর সফল হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি, তার মধ্যে বাংলাদেশ একটি বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। সম্প্রতি জাতিসংঘের মহাসচিবও তার বিশেষ বার্তায় বলেছেন, পর্যটন হবে কোভিড-১৯-পরবর্তী বিশ্বে ঘুরে দাঁড়ানোর অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। বাংলাদেশও একটি হওয়ার কারণ বহুবিধ। পর্যটন সম্ভাবনা বিবেচনায় বাংলাদেশকে বলা হয় ‘ইউনিক ডেল্টা অব সেভেন টিএ (7TA or Seven Tourist Attractions)। এই সেভেন টিএ হচ্ছে নদী, সমুদ্র, পাহাড়, বন, ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি, ঋতু বৈচিত্র্য ও আতিথেয়তা। অর্থাত্, কোনো স্থানে বা কোনো দেশে এই সেভেন টিএর একটি যদি উপস্থিত থাকে পর্যটনের জন্য, তাকে বলা হয় GOOD, যদি দুটি থাকে তাকে বলা হয় BETTER, আর যদি দুইয়ের অধিক থাকে তবে বলা হয় BEST। সেই বিচারে বাংলাদেশের অবস্থান হচ্ছে BEST +++।
উপরন্তু, বিভিন্ন গবেষণা ও পরিসংখ্যান বলছে, পোস্ট কোভিড-১৯ পৃথিবীতে ১৮ থেকে ২৪ মাস (সম্ভাব্য ডিসেম্বর ২০২২ সাল পর্যন্ত) সাধারণভাবে কেউ ছুটি কাটাতে বা পারিবারিক অবসর সময় উপভোগ করতে কিংবা যে কোনো প্রকার হলিডে মেকিং করার জন্য ১০০ থেকে ৩০০ মাইল বা ১৬১ কিলোমিটার থেকে ৪৮২ কিলোমিটার দূরত্বের ভ্রমণকে প্রথম পছন্দরূপে অগ্রাধিকার দেবেন। ফলে অভ্যন্তলীণ পর্যটন আরো ব্যাপকভাবে বেগবান হবে। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ ট্যুরিস্ট পুলিশের হিসাব অনুযায়ী দেশে ডোমেস্টিক টুরিস্টের সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৫৭ লাখ। বিভিন্ন সূত্রের তথ্যানুযায়ী, এই পর্যটকদের গড় খরচের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা। একই সময়ে প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে তাত্পর্যপূর্ণসংখ্যক পর্যটক নানা কারণে বিদেশে ভ্রমণ করেন; যার মধ্যে ভারতে যান প্রায় ২৯ লাখ বাংলাদেশি পর্যটক, থাইল্যান্ডে যান ৬ লাখ, মালয়েশিয়ায় ভ্রমণ করেন প্রায় ৩ লাখ, সিঙ্গাপুরে যান ২ লাখ। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, সৌদি আরবসহ ইউরোপ, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়া ভ্রমণ করেন আরো ৫ দশমিক ৫ লাখ মানুষ। অর্থাত্, প্রায় ৪৬ লাখ বাংলাদেশি পর্যটক ফিবছর বিদেশে যান। একই সঙ্গে উল্লেখ্য যে প্রতি বছর শুধু যুক্তরাজ্য থেকে সিলেটে আসেন ১ দশমিক ৫ লাখ বাংলাদেশি ব্রিটিশ নাগরিক এবং তারা সম্পদশালী। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে বিয়ে, উত্সব ও পারিবারিক ছুটি কাটাতে দেশে ফেরেন আরো ২ মিলিয়ন বা ২০ লাখেরও বেশি প্রবাসী এবং এদের বড় অংশই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ‘লয়াল’ যাত্রী। বাংলাদেশের পর্যটন সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাব, দুর্বল প্রচারের কারণে উল্লিখিত প্রবাসীদের একটি বড় অংশ পারিবারিক ভ্রমণে (বোনাস হিসেবে মেডিক্যাল চেকআপ), বিয়ে-পরবর্তী হানিমুন উদ্যাপন কিংবা অবসর উপভোগ করতে পার্শ্ববর্তী দেশসমূহে ভ্রমণে চলে যান। এরা সেখানে মোটাদাগে খরচ করেন, প্লেনে ওঠেন, স্টার হোটেলে থাকেন, ভালো খাবার খান, উপহার কেনেন। কোভিড-১৯-পরবর্তী ২৪ মাস পর্যন্ত এই তাত্পর্যপূর্ণ পর্যটকগোষ্ঠী স্বাভাবিকভাবেই ছুটি কাটাতে বিদেশে যাবেন না, আবার লকডাউনের কারণে তারা দীর্ঘদিন ঘরবন্দি থেকে ক্লান্ত, উন্মুখ অপেক্ষায় আছেন সুবিধামতো সময়ে পরিবার নিয়ে ভ্রমণে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য। এক্ষেত্রে এই বিশাল শক্তিশালী পর্যটকদের কাছে একমাত্র বিকল্প গন্তব্য হচ্ছে অপরূপ বদ্বীপের বহু বৈচিত্র্যে ভরপুর বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গা ও কেন্দ্র। জাতিসংঘের পর্যটনবিষয়ক অঙ্গসংগঠন ইউএনডব্লিউটিও ইতিমধ্যে আভাস দিয়েছে, বিশ্বে অচিরেই ‘ডোমেস্টিক পর্যটন ট্রাফিক’ সৃষ্টি হবে। সর্বসম্প্রতি অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের রিসার্চ রিপোর্টে বলা হয়েছে, কোভিড-১৯ প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক পর্যটন ২০১৯-এর অবস্থানে ফিরতে বিশ্বকে অপেক্ষা করতে হবে ২০২৪ সাল পর্যন্ত। অর্থাত্, সার্বিক বিচার-বিশ্লেষণে এটা নিশ্চিত, লোকাল ট্যুরিজম নজিরবিহীনভাবে গতিশীল হবে।
পৃথিবীর পরীক্ষিত, প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত পরিসংখ্যান বলছে, পর্যটন ১০৯টি শিল্পকে সরাসরি প্রভাবিত করে, চালিত করে, প্রসারিত করে। একজন পর্যটক বা ট্যুরিস্ট যখন কোথাও যান, তিনি যাতায়াতের জন্য যানবাহন ব্যবহার করেন, প্লেনে ওঠেন, হোটেলে থাকেন, চাল-ডাল-রুটি-তেল-নুন-চিকেন-এগ-মিল্কসহ নানা কিছু আহার করেন, স্থানীয় পণ্য কেনাকাটা করেন; অর্থাত্, একজন ট্যুরিস্টের আগমনের ফলে অনেকগুলো ভোগ-উপভোগের সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পাদন হয়। একজন ট্যুরিস্টের আগমন ও উপস্থিতি কৃষি, পোলট্রিসহ নানাবিধ শিল্প উত্পাদনে অন্যতম সহায়ক ভূমিকা রাখে। পৃথিবীতে চলমান নানা দুর্যোগ ও অর্থনৈতিক বিপত্তির কারণে বহু মানুষ কর্মহীন হওয়ার পরেও পর্যটনক্ষেত্রে প্রতি আড়াই সেকেন্ডে একটি করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে যাচ্ছে। এক জন পর্যটকের আগমনে সেবা খাতে ১১ জনের সরাসরি কর্মসংস্থান হয়। পরোক্ষভাবে কাজ পান আরো ৩৩ জন। অর্থাত্, ১ লাখ পর্যটকের আগমনের সঙ্গে ১১ লাখ কর্মসংস্থান যুক্ত হয়। ১৭ কোটি মানুষের বাংলাদেশে এটি আরো ব্যাপকভাবে হতে পারে। কারণ এই জনগোষ্ঠীর ৬০ শতাংশ হচ্ছে তরুণ। সুতরাং পোস্ট কোভিড-১৯ মোকাবিলায় পর্যটনের এই অপার সম্ভাবনা হচ্ছে সত্যিকারভাবেই বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ‘পেনাল্টি শ্যুট’। ফুটবল খেলায় ‘পেনাল্টি শ্যুট’ পাওয়া জয়লাভের জন্য যেমন বড় সুযোগ, বাংলাদেশের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে কোভিড-১৯ ক্রাইসিস ‘পেনাল্টি শ্যুট’ অপরচুনিটি হিসেবে আমাদের দুয়ারে অপেক্ষমাণ। এই অমূল্য পেনাল্টি শ্যুটে গোল করার নেতৃত্বদানকারী শ্যুটার হচ্ছে সরকারের বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। পরিস্থিতি এবং স্থান-কাল-পাত্রভেদে নিত্যনতুন ট্যাকটিস ও প্র্যাকটিস প্রয়োগ করার মতো ‘ওনশিপ’ নেতৃত্বদক্ষতা ও উদ্যোগ না থাকলে এখানে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করা নিশ্চিতভাবেই কঠিন হবে, যেটা স্বাধীনতা-পরবর্তী ৪৯ বছর ধরে ঘটে আসছে দুর্ভাগ্যজনকভাবে। তবে আশা ও আকাঙ্ক্ষার বিষয় হচ্ছে, সেই অবস্থার বদল ঘটার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। উদ্যোগ শুরু হয়েছে। সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় কোভিড-১৯-পরবর্তী বিশ্বে বাংলাদেশের পর্যটনের জন্য সেরা পেনাল্টি শ্যুটকে সফল করার জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু কার্যকর উদ্যোগের বিকল্প নেই। সেই কাজগুলো সফলতার সঙ্গে সম্পন্ন করা গেলে শুধু অভ্যন্তরীণ পর্যটনে সাফল্যই অর্জিত হবে না, বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক পর্যটনের জন্য পথ বা ক্ষেত্র তৈরিও সুগম হয়ে যাবে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শততম জন্মবার্ষিকী ‘মুজিববর্ষ’ উদ্যাপনের অংশ হিসেবে এবং বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার স্বপ্ন পূরণের যাত্রায় এটি হবে অতুলনীয় ও অনিবার্য একটি দায়িত্ব সম্পন্ন করা। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ২০১৯ সালের সর্বশেষ ট্যুরিজম কম্পিটিটিভ রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশ আগের বছরের তুলনায় পর্যটনবান্ধব দেশ হিসেবে পাঁচ ধাপ এগিয়ে ১২০তম স্থানে উন্নীত হয়েছে। বিশ্বের ১৪০টি দেশের মধ্যে ২০১৮ সালে অবস্থান ছিল ১২৫তম। গত পাঁচ বছরে প্রতিষ্ঠানটির কার্যকর উদ্যোগ ও ভূমিকার ফলে বিশ্বের ১৪৭টি দেশের মধ্যে নিরাপত্তা ও সুরক্ষা পর্যটন খাতে বাংলাদেশ ১৮ ধাপ এগিয়েছে, ১২৩তম অবস্থান থেকে ১০৫তম স্থানে এসেছে।
বাংলাদেশ আগামী বছর তার ৫০তম জন্মবার্ষিকীর দ্বারপ্রান্তে। সাম্প্রতিককালে কানাডা, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ পৃথিবীর প্রায় অধিকাংশ দেশই তাদের ৫০, ১০০ বা ১৫০তম জন্মবার্ষিকী উদ্যাপন করেছে পর্যটনবর্ষ ঘোষণার মাধ্যমে। বাংলাদেশ সরকারও নীতিগতভাবে দেশের ৫০তম জন্মবার্ষিকীকে পর্যটনবর্ষ হিসেবে উদ্যাপনের জন্য ঘোষণা দিয়েছে গত ফেব্রুয়ারি মাসে। কোভিড-১৯-এর ফলে সেই অবস্থানে কোনো বত্যয় ঘটেনি বলে ইতিমধ্যে মন্ত্রণালয় গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছে। আজ ২০২০ সালের আসন্ন বিশ্ব পর্যটন দিবসে এ বিষয়ে আরো বিস্তারিত ঘোষণা আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
n লেখক : সম্পাদক, ভ্রমণ ম্যাগাজিন, অ্যাডজাংকট ফ্যাকাল্টি, ডেফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি