এ বছর দেশে কয়েক দফা বন্যার পর সম্প্রতি আবারও বন্যা দেখা দিয়েছে কয়েকটি জেলায়। গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে এ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এতে প্রায় ২ হাজার হেক্টর আমনের খেত পানিতে তলিয়ে গেছে। অসময়ের বন্যায় তলিয়ে গেছে কৃষকের স্বপ্নও। কৃষি অফিস বলছে, দুই/এক দিনের মধ্যে খেত থেকে পানি নেমে গেলে তেমন একটা ক্ষয়ক্ষতি হবে না। তবে পানি না নামলে কৃষকরা অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর :
গঙ্গাচড়া (রংপুর) :কয়েক দফা উজানের ঢল ও অবিরাম বৃষ্টিতে সৃষ্ট বন্যায় গঙ্গাচড়ায় ৩৫০ হেক্টর আমনের খেত পানিতে তলিয়ে গেছে। কৃষকরা জানান, এ বছর চার/পাঁচ দফা বন্যা হয়। তবে বুধবারের বন্যা এ বছরে সবচেয়ে বড় বন্যা। উপজেলার কোলকোন্দ, লক্ষ্মীটারী, গজঘণ্টা ইউনিয়নের তিস্তা তীরবর্তী এলাকায় ক্ষতির পরিমাণ বেশি। ইতিমধ্যে কিছু আমনের খেত নষ্ট হয়েছে। কৃষকরা আশঙ্কা করছেন, আর দুই-এক দিন পানি স্থায়ী হলে অনেক আমন ধানখেত নষ্ট হয়ে যাবে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ শরিফুল ইসলাম বন্যার ভয়াবহতা প্রসঙ্গে বলেন, শুধু কোলকোন্দ, লক্ষ্মীটারী ও গজঘণ্টা ইউনিয়নে আমনের খেত তলিয়ে যাওয়ার পরিমাণ বেশি। তবে তিনি আশা করছেন পানি কমে গেলে সব স্বাভাবিক হবে।
ফুলবাড়ী (কুড়িগ্রাম) :পানিতে তলিয়ে গেছে ৫৫০ হেক্টর আমনের খেত। গতকাল দুপুরে উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চতুর্থ দফায় বন্যায় প্রান্তিক আমনের খেত তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। এ বছর অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলে কৃষকের একই জমিতে দুই থেকে তিনবার পর্যন্ত আমনের চারা রোপণ করেও শেষ রক্ষাটুকুও পায়নি। বার বার আমনের খেত তলিয়ে যাওয়ায় প্রান্তিক কৃষকরা বড় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। ভাঙ্গামোড় ইউনিয়নের কৃষক কার্ত্তিক চন্দ্র সরকার ও বড়ভিটা ইউনিয়নের কৃষক সিরাজুল হক ও বাবুল হোসেন জানান, তাদের প্রত্যেকের চার থেকে পাঁচ বিঘা জমির রোপণকৃত আমনের খেত তলিয়ে গেছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহবুবুর রশিদ জানান, এ উপজেলায় আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১১ হাজার ৪২৬ হেক্টর জমিতে। আমন রোপণ করা হয়েছে ১১ হাজার ৭২০ হেক্টর জমিতে। অতি বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে এ উপজেলায় ৫৫০ হেক্টর আমনের খেত তলিয়ে গেছে। আশা করছি, বৃষ্টিপাত কমার সঙ্গে সঙ্গে খেত থেকে পানি বের হলে ক্ষতির সম্ভাবনা নেই। তবে এ পর্যন্ত রোপণকৃত ৫৫ হেক্টর আমনের খেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
স্টাফ রিপোর্টার, বগুড়া :যমুনা নদীর পানি বেড়েই চলেছে। জেলার সারিয়াকান্দি পয়েন্টে ২৪ ঘণ্টায় পানি বেড়েছে ৮ সেন্টিমিটার। শনিবার সকাল ৬টার দিকে বিপত্সীমার ১১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়েছে। সারিয়াকান্দির ৯টি ইউনিয়নের সাড়ে ৩০০ হেক্টর জমির রোপা আমন, মাসকলাই, শাকসবজি ও মরিচের খেত তলিয়ে গেছে। নদী ভাঙনের কবলে পড়ায় চালুয়াবাড়ী ইউনিনের চরদলিকায় ২৫০ বাড়িঘর অন্যত্র সরিয় নেওয়া হয়েছে। উপজেলা কৃষি অফিসার আব্দুল হালিম বলেন, ‘পানি বৃদ্ধি পেতে থাকলে ফসলের আরো ক্ষতি হবে।’ চতুর্থ দফা বন্যার ক্ষতি কৃষকের কাটিয়ে ওঠা কঠিন।
এদিকে বাঙালি নদীতে ভাঙনে নদী তীরবর্তী এলাকায় একের পর এক বসতভিটা ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। চরগোদাগাড়ী এলাকায় নদীভাঙনের কারণে চরগোদাগাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় অর্ধেক অংশ নদীর মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। ভাঙন অব্যাহত থাকলে যে কোনো সময় ভবনটি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ছাতক (সুনামগঞ্জ) : এক সপ্তাহ ধরে টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। অকাল বন্যায় হাজার-হাজার একর রোপা আমন ধান ও বীজতলা তলিয়ে গেছে। নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন এখানের কৃষকরা। সুরমা, পিয়াইন ও চেলা নদীসহ উপজেলার সব নদ-নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। যে কোনো সময় ছাতকের সঙ্গে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে। ছাতক-সিলেট সড়কের ফায়ার সার্ভিস সংলগ্ন এলাকায় বন্যার পানি ছুঁই-ছুঁই অবস্থায় রয়েছে। সুরমা নৌপথে বন্ধ রয়েছে কার্গো লোড-আনলোড। সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসেব অনুযায়ী শনিবার বিকাল পর্যন্ত সুরমা নদীর ছাতক পয়েন্টে বিপত্সীমার ১১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ তৌফিক হোসেন খান জানিয়েছেন, উপজেলায় ১৩ হাজার ১১৫ হেক্টর জমিতে রোপা আমন ধান চাষাবাদ হয়েছিল। এ বন্যায় অধিকাংশ ফসলের খেত তলিয়ে গেছে। ৫০ হেক্টর জমির রোপা আমন ধান বিনষ্ট হয়েছে। দ্রুত বন্যার পানি কমে গেলে ক্ষতির পরিমাণ অনেকটা কমে আসবে।
ডিমলা (নীলফামারী) :তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে সাতটি ইউনিয়নে অসময়ে বন্যা দেখা দিয়েছে। তিস্তা নদীবেষ্টিত খগাখড়িবাড়ী, পূর্বছাতনাই, টেপাখড়িবাড়ি, খালিশাচাপানী, ঝুনাগাছচাপনী, পশ্চিমছাতনাই ও পূর্বছাতনাই ইউনিয়নের বসতবাড়ি ও আবাদি জমি তলিয়ে গিয়ে বন্যা দেখা দিয়েছে। এসব এলাকায় ২০টি গ্রামের ৫ হাজার ৯০০টি পরিবার পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। অনেকে বাড়িঘর অন্যত্র সড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে পানিবন্দি পরিবারগুলোর মধ্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৪৭ দশমিক ৩০০ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। আরো ৫০ মেট্রিক টন চাল ও ৫০০ প্যাকেট শুকনো খাবারের বরাদ্দ পাওয়া গেছে। ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, বুধবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত নদীর পানি বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও শনিবার সকাল থেকে তিস্তা নদীর পানি কমতে শুরু করে। শনিবার বিকাল পর্যন্ত তিস্তা নদীর পানি বিপত্সীমার ১০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আমরা সতর্ক অবস্থায় রয়েছি এবং ডালিয়া তিস্তা ব্যারাজের সবকয়টি জলকপাট (৪৪) খুলে রাখা হয়েছে।