‘গত ২৬ জুন রাত সাড়ে ১০টায় বাড়িতে ফিরে আমি ভাত খেতে চাই। এ সময় চার বছর বয়সি ছোট বোন ঘরে ঘুমিয়ে ছিল। বাবা ভাঙ্গারহাট বাজারের নৈশপ্রহরীর ডিউটিতে ছিলেন। মা হাসি রানী পান্ডে আমাকে ভাত দিতে গিয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে হঠাত্ প্লেট ছুড়ে মারেন। ভাতের পাতিলে লাথি মেরে ফেলে দেন। এক পর্যায়ে আমি চিত্কার-চেঁচামেচি করলে, মা বটি দিয়ে আমাকে কোপাতে আসেন। আমি জ্বালানি কাঠ দিয়ে মায়ের মাথায় পেছনে আঘাত করি। এতে মায়ের মৃত্যু হয়। আমি ভয় পেয়ে যাই। এর আগে প্রবল বর্ষণ হয়। তাই আশপাশে কোনো মানুষজন ছিল না। লাশ কোলে করে নৌকায় তুলি। বাড়ি থেকে অর্ধ কিলোমিটার দূরে নিয়ে একটি উঁচু জায়গায় লাশ নৌকা থেকে নামিয়ে রাখি। পরে পাশের বাড়ি থেকে লুকিয়ে পাটখড়ি ও জ্বালানি কাঠ এবং নিজেদের ঘর থেকে কেরোসিন নিয়ে গভীর রাতে মায়ের লাশ পুড়িয়ে ফেলি। পরে মাকে পোড়ানো কয়লা, ছাই, নৌকা পরিষ্কার ও গোসল করে বাড়ি ফিরে এসে ঘুমিয়ে পড়ি।’
আদালতে মাকে হত্যা করে লাশ পুড়িয়ে প্রমাণ লোপাটের বর্ণনা দিয়েছে কিশোর ছেলে আকাশ পান্ডে (১৬)। গত শুক্রবার বিকাল ৫টায় গোপালগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হুমায়ুন কবিরের আদলতে আকাশ এ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করে।
গত বৃহস্পতিবার রাতে গোপালগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে একদল পুলিশ কোটালীপাড়া উপজেলার কালিকাবাড়ি গ্রামে অভিযান চালিয়ে আকাশকে গ্রেফতার করে। এ সময় পুলিশ লাশ পোড়ানোর কাজে ব্যবহূত কেরোসিনের বোতল উদ্ধার করে। আকাশ পান্ডে কোটালীপাড়া উপজেলার রাধাগঞ্জ ইউনিয়নের কালিকাবাড়ি গ্রামের মনোরঞ্জন পান্ডের ছেলে। সে ভাঙ্গারহাট তালিমপুর তেলিহাটি উচ্চ বিদ্যালয়ের ৯ম শ্রেণির ছাত্র।
হত্যাকাণ্ডের শিকার মা হাসি রানী পান্ডে (৩৫) গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার রাধাগঞ্জ ইউনিয়নের কালিকাবাড়ি গ্রামের মনোরঞ্জন পান্ডের স্ত্রী। তিনি মাদারীপুর সদর উপজেলার কলাগাছিয়া গ্রামের জুড়ান বাড়ৈর মেয়ে ।
মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন জানান, আকাশ পান্ডের পিতা মনোরঞ্জন পান্ডে (৩৭) ভাঙ্গারহাট বাজারে নৈশপ্রহরীর কাজ করেন। ২৬ জুন রাতে নৈশপ্রহরীর ডিউটি শেষে ২৭ জুন সকালে মনোরঞ্জন বাড়িতে ফিরে স্ত্রীকে ঘরে দেখতে না পেয়ে ছেলে-মেয়ের কাছে জানতে চান তাদের মা কোথায় গেছে? উত্তরে ছেলে-মেয়ে বলে মা মামা বাড়িতে গেছে। মনোরঞ্জন তার শ্বশুরবাড়িসহ আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে খোঁজ নিয়েও স্ত্রীর সন্ধান পাননি ।
ঐ কর্মকর্তা আরো জানান, এ ঘটনায় মনোরঞ্জন গত ১ জুলাই কোটালীপাড়া থানায় শ্বশুর-শাশুড়িসহ চার জনের বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। পরে অবার একই ঘটনায় মনোরঞ্জন ৮ জুলাই কোটালীপাড়া থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। কোটালীপাড়া থানা পুলিশ অভিযোগ ও জিডির তদন্ত করে এ ঘটনার কোনো কিনারা করতে পারেননি। এদিকে শ্বশুর জুড়ান বাড়ৈ ক্ষিপ্ত হয়ে গত ২৪ সেপ্টেম্বর গোপালগঞ্জ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে জামাতা মনোরঞ্জন পান্ডে, তার ভাই, ভাবী, বোন ও বোনের স্বামীর বিরুদ্ধে যৌতুক আইনে একটি মামলা করেন। ঐ মামলার তদন্তে নেমে পুলিশ বৃহস্পতিবার গৃহবধূ হাসি রানী পান্ডে হত্যা রহস্য উদ্ঘাটন করে। আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদানের পর কিশোর আকাশকে গোপালগঞ্জ জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে।