শিল্পসমৃদ্ধ উন্নত বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যে ১৯৫৭ সালে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশন বা বিসিকের জন্ম হয়। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম শিল্পের বিকাশ, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য বিমোচনে এই জাতীয় প্রতিষ্ঠান অনন্য ভূমিকা পালন করিয়া আসিতেছে। ইহা ভারসাম্যপূর্ণ আঞ্চলিক উন্নয়নেও অবদান রাখিতেছে। বৃহত্ শিল্পের খুচরা যন্ত্রপাতি উত্পাদনকারী সাবকনট্রাকটিং ইউনিট তালিকাভুক্তিকরণ এবং বৃহত্ শিল্পের সহিত এই তালিকাভুক্ত ইউনিটের সাবকনট্রাকটিং সংযোগ স্থাপনে ব্যাপক ভূমিকা রাখিতেছে। তবে বাংলাদেশে বর্তমানে অনেক বিসিক শিল্পনগরী ভালো অবস্থায় নাই। যেই উদ্দেশ্যে এই সকল শিল্পনগরী গড়িয়া তোলা হয়, তাহা অদূরদর্শিতার অভাবে বহুলাংশে বাস্তবায়িত হইতেছে না। এইখানে অবকাঠামোসহ বিভিন্ন সমস্যা বিরাজমান। যেমন—নেত্রকোনা বিসিক শিল্পনগরীর কথাই ধরা যাউক। ২০০৫-০৭ অর্থবত্সরে ৬ কোটি ৪৯ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ১৫ একর জমির উপর এই বিসিক শিল্পনগরীটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। দীর্ঘ ১৩ বত্সর পরও এইখানে অধিকাংশ শিল্পকারখানা চালু হয় নাই। ৭০টি প্রস্তাবিত শিল্প-প্রকল্পের মধ্যে মাত্র ২৬টি প্রকল্প চালু হইয়াছে। ইহার মূল কারণ এইখানে গ্যাস সরবরাহের ব্যবস্থা না থাকা। এমন কিছু শিল্প-প্রকল্প রহিয়াছে, যাহা আসলে গ্যাসনির্ভর। ইহা না থাকায় অনেকে কারখানা চালুই করিতে পারিতেছেন না। ইহাতে ব্যাংকঋণ লইয়া তাহারা বিপদে পড়িয়াছেন। কিস্তি চালাইতে গিয়া ফতুর হইয়া যাইতেছেন। তাহাদের কারখানায় যন্ত্রপাতি পড়িয়া থাকিয়া নষ্ট হইয়া যাইতেছে। কেহ কেহ কারখানা চালু করিয়া বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করিতেছেন বটে। তবে তাহাতে বাড়িতেছে উত্পাদন খরচ, যা সাশ্রয়ী ও লাভজনক নহে। এই জন্য তাহারা হতাশ ও হতোদ্যম।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশনের (বিসিক) ময়মনসিংহ মুক্তাগাছা শিল্পনগরীর অবস্থা আরো খারাপ। ১৯৮৯ সালে কাজ শুরু হইলেও গত ৩০ বত্সরেও তাহা বাস্তবায়িত হয় নাই। সেইখানে এখনো জমি অধিগ্রহণ ও মাটি ভরাটের কাজ চলিতেছে। তাহা কবে নাগাদ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করিবে তাহা কেহ জানেন না। জমি অধিগ্রহণে মামলা-মোকদ্দমার মুখোমুখি হইতে গিয়া কালক্ষেপণ তৈরি হইতেছে। বিসিক শিল্পনগরীটি কোনো কোনো ক্ষেত্রে গোচারণভূমিতে পরিণত হইয়াছে। অরক্ষিত থাকায় ইহার জমি বেদখলও হইয়া যাইতেছে। গ্যাস, বিদ্যুত্সহ সকল ধরনের সুবিধা থাকা সত্ত্বেও শিল্পনগরীটি চালুই করা যাইতেছে না। প্রায় ৭০ বত্সর পূর্বে গড়িয়া উঠা বরিশাল বিসিক শিল্পনগরীর কাহিনি আরো শোচনীয়। পাকিস্তান আমলে ষাটের দশকে ইহার অগ্রযাত্রা শুরু হইলেও এখনো ইহা পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করে নাই। অনেক প্লট এখনো ফাঁকা পড়িয়া রহিয়াছে। এইখানকার সমস্যা কিছুটা ভিন্ন। এইখানে অবকাঠামোগত ও আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা অপ্রতুল। তবে সম্প্রতি সেইখানে কিছু উন্নয়নমূলক কাজ হইয়াছে। ঝালকাঠি, ভোলা, শ্রীমঙ্গল প্রভৃতি বিসিক শিল্পনগরীর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
শিল্পনগরী স্থাপনে জমির সমস্যা হইবে কেন? জমির মালিকদের ন্যায্যমূল্য দিলে জমি অধিগ্রহণে কোনো সমস্যা থাকিবার কথা নহে। বিসিকের কাজই হইল তাহার অধীন শিল্পনগরগুলিতে উন্নত রাস্তাঘাট, পানি, বিদ্যুত্, গ্যাস ইত্যাদি সুবিধার সম্প্রসারণ করা; কিন্তু অধিকাংশ স্থানে এই উদ্দেশ্য পূরণে সংস্থাটি কেন ব্যর্থ হইতেছে তাহা লইয়া গভীরভাবে চিন্তাভাবনার দরকার। আমরা মনে করি, এতকিছুর পরও আমাদের অধৈর্য হইবার কোনো কারণ নাই। ওয়ান স্টপ সার্ভিসসহ কত কী চালু হইল, তবু দেশের শিল্পায়নের গতি ত্বরান্বিত হইল না। তবে বিভিন্ন বিসিক শিল্পনগরীতে বর্তমানে যে শিল্পগুলি রহিয়াছে, তাহাদের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকিয়া থাকিবার মতো রসদ সরবরাহ করিতে হইবে। এই ব্যাপারে দিতে হইবে বিশেষ নজর।