বিভিন্ন স্থানে হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল পানিতে নিমজ্জিত

টানা কয়েক দিনের অবিরাম বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে দেশের বিভিন্ন স্থানের নিম্নাঞ্চল তলিয়ে গেছে। এর মধ্যে গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ, নওগাঁ ও বগুড়ায় হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। এতে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন কৃষক। এছাড়া রংপুর, নীলফামারী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে লক্ষাধিক মানুষ। কুড়িগ্রামের রাজারহাটে ভেসে গেছে লাখ লাখ টাকার মাছ। ইত্তেফাক প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর।

রংপুর: ধীরগতিতে পানি নামাসহ দ্বিতীয় দিনেও প্রবল বৃষ্টিপাতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায়    ভাসছে মহানগরীর অধিকাংশ এলাকার মানুষ। পানিবন্দি হয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন কয়েক হাজার পরিবার। নগরীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়েছে প্রায় ৫০ হাজার হতদরিদ্র অসহায় মানুষ। রংপুর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে রংপুর সিটি করপোরেশন এর অনুকূলে ২০ মেট্রিক টন চাল হস্তান্তর করা হয়েছে। গতকাল সোমবার সরেজমিন দেখা যায়, নগরীর মুলাটোল, মেট্রোপলিটন কোতোয়ালি থানা এলাকা, মুন্সিপাড়া, গোমস্তপাড়া, পাকপাড়া গুপ্তপাড়া, খলিফাপাড়া, বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন সর্দারপাড়া, ঈদগাহপাড়া, জুম্মপাড়া, নিউ জুম্মাপাড়া, কেরানীপাড়া, হনুমানতলা, জলকর, নীলকণ্ঠ, কুকরুল, কামারপাড়া, চামড়াপট্টি, করঞ্জাই রোড, হকেরগলি, সেনপাড়াসহ অনেক এলাকায় এখনো হাঁটুপানি ও কোমরপানি রয়েছে। ফলে এসব এলাকার অনেক পরিবার আশপাশের বিভিন্ন স্কুল-কলেজ ও উঁচু ভবনে আশ্রয় নিয়েছে। অনেকেই আত্মীয়দের বাড়িতে চলে গেছে। তবে নগরীর বেশ কিছু এলাকা থেকে পানি নেমে যাওয়ায় ঘরে ফিরেছে স্থানীয়রা। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। শনিবার সন্ধ্যা থেকে রবিবার সকাল পর্যন্ত ৪৩৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হওয়ায় রংপুরের ইতিহাসে প্রথম এমন জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।

তারাগঞ্জ (রংপুর) :ভারি বৃষ্টিপাতে উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের অধিকাংশ নিম্নাঞ্চল তলিয়ে গিয়ে সহস্রাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। অপর দিকে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে যমুনেশ্বরী নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় নদী তীরবর্তী গ্রামগুলোতে দেখা দিয়েছে বন্যা। তাদের বাড়ি-ঘরে বুক সমান পানি উঠে পড়ায় গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি নিয়ে উঁচু ও নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে শুরু করেছেন। এছাড়া উপজেলায় শত শত পুকুরের মাছ পানিতে ভেসে গেছে।

গাইবান্ধা :গাইবান্ধায় সবগুলো নদনদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। করতোয়া নদীর পানি বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদীভাঙনে শত শত পরিবার ভিটেমাটি হারিয়েছে। অতি বর্ষণে ধসে গেছে মাটির ঘর। ডুবে গেছে বিস্তীর্ণ এলাকার ফসলের মাঠ। ভেসে গেছে পুকুরের মাছ। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত কয়েক দিনের অবিরাম বর্ষণে ৩ হাজার ৮৬০ হেক্টর জমির আমন ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। এছাড়া ৩৪৫ হেক্টর শাকসবজি ও ৪০ হেক্টর মাসকালাই পানিতে ডুবে গেছে। এছাড়া অতি বর্ষণে জেলার ২৫০টি পুকুরের প্রায় ৩২ মেট্রিক টন মাছ ভেসে গেছে। যার মূল্য প্রায় ৪০ লাখ টাকা। 

সিরাজগঞ্জ : হঠাত্ যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলার কাজীপুর, সদর, বেলকুচি, শাহজাদপুর, চৌহালী ও তাড়াশ উপজেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের রোপাআমন ধান, মাষকলাই, মরিচ, চীনা বাদাম পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন কৃষক। সদর  উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রস্তুম আলী জানান যমুনার পানি বৃদ্ধির ফলে উপজেলার ৫৪৯ হেক্টর জমির সবজি, রোপা আমন, মাষকলাই, মরিচ ও চীনা বাদাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি জানান, কৃষকদের এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পরেঙ্গধান ছিটিয়ে বোনার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

নওগাঁ : জেলার মোট ৪ হাজার ১০৯ হেক্টর বোরো আমন ধান তলিয়ে গেছে। বিভিন্ন নদীর পানি বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এদিকে গত বন্যায় আত্রাই, রাণীনগর ও মান্দায় আত্রাই নদের বাঁধের ভাঙা অংশ  মেরামত সম্পন্ন না হওয়ায় ঐ অংশ দিয়ে হুহু করে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করে আবারও বন্যা দেখা দিয়েছে। চতুর্থ দফায় এ বন্যায় আবারও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। মান্দা উপজেলার বিষ্ণুপুর, নুুরুল্লাবাদ ও কশব ইউনিয়নের প্রায় ২২টি গ্রাম, আত্রাই উপজেলার আসহানগঞ্জ, শাহাগোলা, কালিকাপুর, পাঁচুপর, বিশা ইউনিয়নের ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এ ছাড়াও রাণীনগর, বদলগাছী উপজেলার শত শত বিঘার ধান তলিয়ে গেছে।

কিশোরগঞ্জ (নীলফামারী) : কয়েক দিনের অবিরাম বর্ষণের ফলে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে উপজেলার প্রায় ১০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। গতকাল সোমবার দুপুর পর্যন্ত উপজেলার মাগুড়া ইউনিয়নের উত্তরপাড়া, দোলাপাড়া, আকালীবেচাপাড়া, গাড়াগ্রাম ইউনিয়নের কবিরাজ পাড়া, বুল্লাইপাড়া, রণচণ্ডি ইউনিয়নের কিসামত বীরচরণ, বাহাগিলি ইউনিয়নের উত্তর দুরাকুটি, মাছুয়াপাড়া, চাঁদখানা ইউনিয়নের ডাংগাপাড়া, বোর্ডপাড়াসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের প্রায় ১০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে। অধিকাংশ মত্স্যচাষির মাছ পানিতে ভেসে গেছে। 

সৈয়দপুর (নীলফামারী) : সৈয়দপুরে আমন ধানসহ মৌসুমি ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পুকুরের মাছ ভেসে  গেছে। এনিয়ে দুশ্চিন্তায় দিশেহারা কৃষক। শহরের মিস্ত্রিপাড়া, নিচু কলোনি, হাতিখানা, মাছুয়াপাড়া, বাঁশবাড়ী, কুন্দলসহ প্রায় মহল্লা ও বাসাবাড়িতে পানি ওঠায়  দুর্ভোগে পড়েছেন শহরের মানুষ। এমনকি হাতিখানা কবরস্থানও পানিতে তলিয়ে গেছে।

শিবগঞ্জ (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) : উপজেলার দাইপুখুরিয়া ইউনিয়নের ৪, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডে বর্ষায় ও পানি নিষ্কাশনে কালভার্টের দুই পাশ বন্ধ করে দেওয়ায় প্রায় ৩০০ পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। তলিয়ে গেছে ধান, মাসকলাই,  বেগুনসহ ফসলি জমি। পানিবন্দি পরিবারগুলো ছোট ছেলে-মেয়ে ও গরু-বাছুর নিয়ে অন্যের জায়গায় বসবাস করছে। খাবারের পাশাপাশি দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির সংকট।

রাজারহাট (কুড়িগ্রাম) : তিস্তার পানি বৃদ্ধি পেয়ে ভেসে গেছে উপজেলার ১১০টি পুকুরের প্রায় ২৭ লক্ষাধিক টাকার মাছ। এর ফলে মত্স্যচাষিরা আর্থিক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। গত কয়েক দিনের প্রবল বর্ষণে মত্স্য খামার ও পুকুর তলিয়ে গিয়ে বিভিন্ন জাতের মাছ বেরিয়ে গেছে। এখনো অনেক মত্স্য খামার পানির নিচে তলিয়ে আছে। উপজেলা মত্স্য কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্বে)  এ বিষয়ে আরা জানান, উপজেলায় ১১০টি মত্স্য খামার ও পুকুর তলিয়ে প্রায় ২৭.২৬ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।  

শেরপুর (বগুড়া) : উপজেলার খামারকান্দি ইউনিয়নের ঘোড়দৌড় এলাকায় নিম্নাঞ্চলের ডুবে যাওয়া  শত শত বিঘার ধান ও সবজি ফসল রক্ষায় প্রাণান্তকর চেষ্টা করছে ভুক্তভোগী কৃষকরা। তারা ফসলি মাঠের জলাবদ্ধতা দূর করার জন্য শ্যালো মেশিন বসিয়ে পানি অপসারণের চেষ্টা করছে। প্রায় পক্ষকাল পেরিয়ে গেলেও সরকারি কোনো দপ্তর কৃষকদের পাশে দাঁড়ায়নি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিয়াকত আলী সেখ বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহযোগিতা করতে সরকারিভাবে চেষ্টা চলছে।