অবৈধ অস্ত্র রাখার মামলায় রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. সাহেদ ওরফে সাহেদ করিমকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রায়ে আদালত বলেছে, ‘সাহেদ অত্যন্ত চালাক ও ধুরন্ধর। তার মতো ভদ্রবেশী অপরাধীরা আমাদের সমাজে রয়েছে। এ রায় সাহেদের মতো সমাজে থাকা ভদ্রবেশী অপরাধীদের জন্য একটা বার্তা।’ ঢাকা মহানগর দায়রা জজ কে এম ইমরুল কায়েশ জনাকীর্ণ আদালতে গতকাল সোমবার এই রায় ঘোষণা করেন। রায় শুনে কাঠগড়ায় নির্বাক দাঁড়িয়ে ছিলেন আসামি সাহেদ। পরে তাকে সাজা পরোয়ানা দিয়ে কারাগারে পাঠিয়ে দেন বিচারক। সাহেদের বিরুদ্ধে ভুয়া করোনা টেস্টসহ প্রতারণার অভিযোগে অর্ধশত মামলা রয়েছে। বেশ কিছু প্রতারণার মামলার তদন্ত করছে পুলিশ।
অবৈধ অস্ত্রের মামলায় সাহেদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনের ১৯ (ক) ও (চ) ধারায় অভিযোগ গঠন করে আদালত। এর মধ্যে অবৈধ অস্ত্রের জন্য ১৯ (ক) ধারায় যাবজ্জীবন এবং গুলি রাখার দায়ে (চ) ধারায় সাত বছরের কারাদণ্ড দেয় আদালত। দুটি সাজা একত্রে চলবে বলেও রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া ঐ অস্ত্র ও গুলি বাজেয়াপ্ত এবং যে গাড়ি থেকে অস্ত্রটি উদ্ধার করা হয়েছে, তার মালিকানা যাচাই করে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতেও রাষ্ট্রপক্ষকে বলা হয়েছে।
রায়ে মামলার বাদীর জবানবন্দির অংশবিশেষ তুলে ধরে বিচারক বলেছেন, আসামি সাহেদ মাদক মামলায় হেফাজতে থাকাবস্থায় তার স্বীকারোক্তিমতে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের সোনারগাঁও জনপথের পরিত্যক্ত গাড়ির সিটের নিচ থেকে অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করা হয়। জব্দ তালিকার সাক্ষীও গাড়ি থেকে অস্ত্র উদ্ধারের কথা বলেছেন। পরে তদন্ত কর্মকর্তার তদন্তে উঠে আসে যে, ঐ গাড়িটি সাহেদ কিস্তিতে ক্রয় করেছিলেন।
রায়ে বলা হয়েছে, আসামি সাহেদ এতই চতুর যে অস্ত্রের কথা জানা সত্ত্বেও বিচার চলাকালে একবারও আদালতে তা স্বীকার করেননি। আসামিপক্ষের আইনজীবী বলেছেন, এই অস্ত্রটি সাহেদের মালিকানায় ছিল না এবং তিনি তা জানতেনও না। যে গাড়ি থেকে অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে তা সাহেদের নয়, এটি পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। অথচ সাহেদ কিস্তিতে গাড়িটি ক্রয় করেছেন বলে তদন্তে বেরিয়ে আসে। তার কাছ থেকে সরবরাহ করা চাবি নিয়েই তালাবদ্ধ গাড়িটি খুলে অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। তাই এতে প্রমাণিত হয় অস্ত্র সম্পর্কে সাহেদ জানতেন এবং তার মালিকানাধীন গাড়ি থেকেই তা উদ্ধার করা হয়েছে। সুতরাং এখানে তার অস্ত্র সম্পর্কে জানা থাকা ও মালিকানার বিষয়টি প্রমাণিত হয়। এছাড়া আসামি সাহেদ এতই ধুরন্ধর যে গাড়ির মালিকানার বিষয়টি তিনি কখনো আদালতে স্বীকার করেননি। তাই তিনি এখানে কোনো অনুকম্পা পেতে পারেন না।
রায়ের পর ঢাকা মহানগর পিপি আব্দুল্লাহ আবু বলেন, সাহেদ যে অপরাধী তা মামলার রায়ে প্রমাণিত হয়েছে। এ রায় সমাজে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। অতিরিক্ত পিপি তাপস কুমার পাল বলেন, বিচারের শুরু থেকেই আসামি সাহেদ বিচারককে বলেছেন, যে প্রাইভেট কার থেকে অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে সেই গাড়িটি তার নয়। কিন্তু পূবালী ব্যাংক, নাজিমউদ্দিন রোড শাখার ম্যানেজার কাগজপত্র নিয়ে এসে আদালতে বলেন ২০ লাখ টাকা লোন নিয়েই সাহেদ এই গাড়িটি কিনেছেন। গাড়িটি ব্যাংকের জিম্মায় দেওয়ার আবেদন জানান তিনি। তখন সাহেদ আদালতে স্বীকার করে বলেন, এই গাড়ি তার। এই প্রসঙ্গ তুলে আদালত রায়ে বলেছেন, সাহেদ যে কত বড় প্রতারক এই ঘটনাটি তা প্রমাণ করে।
সাহেদের আইনজীবী মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি করায় ন্যায়বিচার পেলাম না। আমরা এ রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাব।’
প্রসঙ্গত, সাহেদের মালিকানাধীন রিজেন্ট হাসপাতালে ভুয়া করোনা টেস্ট করানো হতো। এই ভুয়া টেস্টের প্রমাণ পাওয়ায় গত ৬ জুলাই ঐ হাসপাতালের উত্তরা ও মিরপুর শাখায় অভিযান চালায় র?্যাব। অভিযানে ভুয়া করোনা পরীক্ষার রিপোর্ট প্রদান, করোনা চিকিত্সার নামে রোগীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়সহ নানা অনিয়ম বেরিয়ে আসে। এ ঘটনার পর পালিয়ে যান সাহেদ। গত ১৫ জুলাই সাহেদকে সাতক্ষীরার সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে বোরকা পরিহিত অবস্থায় গ্রেফতার করে র্যাব। পরে তাকে হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় আনা হয়। এরপর করোনা পরীক্ষার নামে ভুয়া রিপোর্টসহ বিভিন্ন প্রতারণার অভিযোগে দায়েরকৃত মামলায় রিমান্ডে নেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। রিমান্ডে থাকাবস্থায় ১৯ জুলাই তাকে নিয়ে অভিযানে যায় পুলিশ। ঐদিন তার উত্তরার বাসার সামনে অভিযান চালিয়ে ডিবি পুলিশ সাহেদের প্রাইভেটকার থেকে পাঁচ বোতল বিদেশি মদ, ১০ বোতল ফেনসিডিল, একটি পিস্তল ও গুলি উদ্ধার করে। এরপর উত্তরা পশ্চিম থানায় অস্ত্র ও মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনে দুটি মামলা করে পুলিশ। এই মামলায় ১০ দিনের মধ্যে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা। অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে ২৭ আগস্ট আসামি সাহেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ। এরপর শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ। রাষ্ট্রপক্ষে ১৪ জন সাক্ষীর মধ্যে ১১ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ, রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে গতকাল ঐ রায় ঘোষণা করেন বিচারক।
মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির অনন্য নজির
আট কার্যদিবসে অস্ত্র মামলাটি নিষ্পত্তি করেছেন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ কে এম ইমরুল কায়েশ। অভিযোগ, গঠন, সাক্ষ্যগ্রহণ, রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে মামলাটির রায় ঘোষণা করা হয়। আইনজীবীরা বলছেন, পুলিশ দ্রুত তদন্ত রিপোর্ট দাখিল করেছে এবং বিরতিহীন সাক্ষ্যগ্রহণ করায় এটা সম্ভব হয়েছে। এত কম সময়ে এর আগে আর কোনো ফৌজদারি মামলার রায় হয়নি বলেও জানান রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিরা।
ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা সাহেদের
রায় ঘোষণার পর সাহেদকে কাঠগড়া থেকে আদালতের হাজতখানায় নেওয়া হয়। সেখান থেকে তাকে প্রিজনভ্যানে তোলা হয়। এ সময় সাহেদ বলেন, ‘আমি ন্যায়বিচার পাইনি। উচ্চ আদালতে যাব। সেখানে আমি ন্যায়বিচার পাব।’