ফুরফুরে বাতাস। গাছের লাউয়ের ডগার মতো কচি কচি পাতাগুলো বাতাসে দোল খায়। কদমগুলোও গাছের ডালপালার মধ্যে থেকে কানামাছি খেলছে। তন্নি এবার চতুর্থ শ্রেণিতে। বাড়ির জানালার পাশে বসলে চারপাশে চোখ পড়ে। বাড়ির পাশে পুকুরপাড়। আর পুকুরপাড়ের কোল-ঘেঁষে বেল গাছ। তন্নির দৃষ্টি বাইরে। বাইরে যাওয়া নিষেধ। পৃথিবীর অসুখ করেছে। সে অসুখে সব থেমে গেছে।
বাবা সাজিদ মেয়েকে উদাস দেখে কাছে এলেন। বললেন, ‘তন্নি মা, জানালার পাশে বসে কী করো? প্রকৃতি দেখ? কত্ত কদম ফুটেছে।’ বাবার কথায় তন্নি চনমনে হয়ে বলল, ‘বাবা, একটা কদম এনে দাও না। ওই যে দেখ পুকুরপাড়ে হাঁসেরা দলবেঁধে জলে বিলি কেটে সাঁতার কাটছে। চলো বাবা, একটু বাইরে নিয়ে চলো। আজ কতদিন ধরে বেড়াতে নিয়ে যাও না।’ বলেই তন্নি মন খচখচ করা ভঙিমায় টুলটুল করে বাবার দিকে তাকাল। সাজিদ সাহেবও মেয়ের দিকে তাকালেন। মাথায় আদরের হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, ‘মা, মন খারাপ কোরো না। এখন যে ভাইরাসের সময়। ভাইরাসটি একবার ধরলে আর রক্ষে নেই। পৃথিবী ছেড়ে পালাক, তখন ঘুরব-ফিরব, খাব-দাব।’ তন্নির মনপাখি আর ঘরে থাকতে চায় না। বলল, ‘হ্যাঁ, বাবা, বুঝলাম। কিন্তু সেই ভাইরাস কবে শেষ হবে? চলো না বাবা আমরা সবাই মিলে ভাইরাসটিকে মেরে ফেলি।’ মেয়ের কথায় সাজিদ সাহেব ফিক করে হেসে ফেললেন। বললেন, ‘না রে মা, সেটা সম্ভব নয়। ওকে দেখা যায় না।’ ভাইরাসের কথা মনে আসতেই ঠোঁট জড়িয়ে আসে। বুকের মধ্যে ঘড়ঘড় শব্দ হয় বাবা সাজিদের। বাবার কোল থেকে তন্নি নামতে চায় না। সাজিদ সাহেবের অফিসে যেতে দেরি হয়ে যাচ্ছে। মেয়েকে কোল থেকে নামিয়ে বললেন, ‘আচ্ছা মা এখন থাকো। আমি যাই। অফিসে যেতে দেরি হয়ে যাচ্ছে।’ তন্নি শুধু ‘হ্যাঁ’ বলেই ড্রয়িং রুমের দিকে ভোঁ দৌড় দিল। সাজিদ সাহেব তৈরি হয়ে অফিসের পথে রওনা দিলেন।
তন্নির মনে থইথই দুঃখ। দূর থেকে যেন ভেসে আসছে স্কুলের বন্ধুদের কণ্ঠের মধুর স্বর। ওর ভেতর আর বাহিরে বন্ধুদের আনাগোনা। চার মাস ধরে তন্নি বাড়িতে বন্দি। কী যেন কী হলো। সব পুতুলগুলো বের করল। ছাত্র-ছাত্রীর মতো মেঝেতে বসিয়ে দিল। হাতে স্কেল নিল। প্রিয় ম্যাডাম আফসারার মতো ঠোঁটে হালকা খয়েরি লিপস্টিক, কপালে ম্যাজেন্ডা কালারের ছোট টিপ দিল। মায়ের ওড়নাটা শাড়ি বানিয়ে পরল। দরজার বাইরে গিয়ে ম্যাডামের ভঙিমায় শ্রেণিকক্ষে ঢুকল। রোল কল করে বাংলা পড়ানো শুরু করল। বলল, ‘জিনু, বলো তো ‘চল্ চল্ চল্’ কবিতাটি কার লেখা? পারলে না তো। ওরে বোকা এটা আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা। ‘হাত পাতো’ বলেই তন্নি সামনে রাখা শিক্ষার্থীরূপী পুতুলকে সপাং করে মেরে দিল। তন্নি নিজেই কেঁদে ফেলল। চোখ কচলাতে কচলাতে বলল, ‘ম্যাম, সামনের দিনে পড়া হবে। আর ভুল হবে না।’ মা মেরিনা তখন কিচেন রুমে। কান্নার আওয়াজ কোথা থেকে আসছে। মেয়ে কাঁদছে কেন? বুক ধুকপুক করছে। দু’ ঘরের কোথাও তন্নিকে না পেয়ে মেরিনা হাঁপাতে হাঁপাতে ড্রয়িং রুমে গেলেন। এখানেই তন্নি কাঁদছে। মেয়েকে জড়িয়ে ধরে শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মোছাতে মোছাতে বললেন, ‘কাঁদছ কেন মা? এই তো আমি। ভয় পেয়েছ? বড়ো মোটা টিকটিকিটা আবার এসেছে?’ তন্নি সাহসী হলেও টিকটিকির কাছে চুনোপুঁটি। মাকে বিচলিত দেখে বলল, ‘ছাড়ো মা। আমি ভীষণ ব্যস্ত। ক্লাস নিচ্ছি দেখছ না। পড়া ধরছি। পারেনি। তাই মেরেছি। ওরা কাঁদতে পারছিল না। তাই আমি কেঁদে সাহায্য করছিলাম।’ মেয়ের কথা শুনে মেরিনা হাসবেন না কাঁদবেন বুঝে উঠতে পারলেন না। আকাশেও তুলোট মেঘের মধ্যে বৃষ্টিরা জমা হয়েছে যেকোনো মুহূর্তে ঝরবে।