স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে এখনো ভাবসম্প্রসারণ হিসাবে পড়ানো হয়—দাঁত থাকিতে মানুষ দাঁতের মর্ম বুঝে না। এই ভাবটি সম্প্রসারণে অবধারিতভাবে চলিয়া আসে পিতা-মাতার কথা। অর্থাত্ মানুষ বহু ক্ষেত্রেই পিতা-মাতা বাঁচিয়া থাকিতে তাহাদের মর্ম যথাযথভাবে উপলব্ধি করিতে পারেন না। নূতন যুগ, নূতন জীবন; মানুষ অধিক আত্মকেন্দ্রিক। ইহার সহিত রহিয়াছে পারিপার্শ্বিক শিক্ষা। সেই কারণে পত্রপত্রিকা খুলিলেই দেখা যায়, বিভিন্ন স্থানে বৃদ্ধ-বৃদ্ধা তথা ‘মাতা-পিতা’র উপর নির্যাতন চলিতেছে বিবিধ পন্থায়। বলা যায়, বয়স্ক বাবা-মায়ের করুণ কাহিনি পত্রিকার ক্ষুদ্র অক্ষরে ছোট্ট কোণে নীরবে কাঁদে। বেশিদিন পূর্বের ঘটনা নহে, গত বত্সরই আমরা সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে দেখিয়াছি—অসুস্থ বৃদ্ধ মাতাকে মাজারে ফেলিয়া রাখিয়া পালাইয়া গিয়াছে পাষণ্ড সন্তানরা। ঢাকার কমলাপুর রেল স্টেশনে বৃদ্ধ পিতাকে ফেলিয়া রাখার ঘটনাও খুব অধিক পুরাতন নহে। ইহার বাহিরে গৃহকোণে বৃদ্ধ বাবা-মাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতনের এমন অসংখ্য ঘটনা রহিয়াছে, যাহার খুব সামান্য অংশই চার দেওয়ালের বাহিরে আসিতে পারে। মনে হইতে পারে—যিনি তাহার পিতা-মাতাকে ‘বোঝা’ মনে করিতেছেন, তিনিও তো একদিন বৃদ্ধ হইবেন!
নিশ্চয়ই আমাদের সমাজে এখনো ভালো সন্তানের সংখ্যাই অধিক; কিন্তু মাত্র ১০ শতাংশও যদি কুপুত্র থাকে, তাহা হইলে মোট বয়স্ক জনগোষ্ঠীর মধ্যে কমপক্ষে অর্ধকোটি পিতা-মাতা প্রতিনিয়ত বিবিধ নির্যাতনের শিকার হইতেছেন। সংখ্যাটি কিন্তু বিপুল! এই জন্য ২০১৩ সালে পিতা-মাতার ভরণপোষণের জন্য আইন করা হয়। এই আইনটিই সভ্য সমাজে লজ্জার প্রতীকও বটে। কারণ, যাহাদের মাধ্যমে আমরা পৃথিবীর আলো-বাতাস পাইলাম, তাহাদের কিনা বৃদ্ধ বয়সে অসহায় অবস্থায় পরিত্যাগ করিলাম! এই ধরনের কুসন্তানদের জন্যই ‘সোজা আঙুলে ঘি উঠে না’ বিধায় ‘আঙুল বাঁকা করিয়া’ এই আইন তৈরি করিতে হইয়াছে বটে; কিন্তু দুঃখের সহিত বলিতে হয়, আইন আছে কি নাই, তাহা জানেনই না অধিকাংশ বৃদ্ধ বাবা-মা কিংবা নির্যাতনকারী সন্তান। এই কারণে আইন থাকা সত্ত্বেও দেখা যাইতেছে অনেক পরিবারেই বৃদ্ধ পিতা-মাতা সন্তানের নিকট হইতে ভরণপোষণ পাইতেছেন না; বঞ্চনার শিকার হইতেছেন। তবে কেবল বাংলাদেশেই নহে, পুরা বিশ্বেই আজ বৃদ্ধ বাবা-মায়েরা বোঝা হইয়া পড়িয়াছেন। যদিও তৃতীয় বিশ্বে এই চিত্র অধিক করুণ। কারণ, শেষ বয়সে নিজেদের ভরণপোষণের জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বৃদ্ধ বাবা-মাকে সন্তানের মুখাপেক্ষী হইতে হয়। অথচ তৃতীয় বিশ্বে ধার্মিক জনগোষ্ঠীর সংখ্যাও অধিক। নির্যাতনকারী সন্তানেরা কি জানেন না—মহান সৃষ্টিকর্তা পবিত্র কোরআন শরিফ ও হাদিসে বারংবার তাহার ইবাদতের পরই বাবা-মায়ের খেদমতের কথা বলিয়াছেন এবং বাবা-মায়ের খেদমত করাকে ফরজে আইন ইবাদত বলিয়া ঘোষণা করিয়াছেন! হিন্দুধর্মের মনুসংহিতায়ও বলা হইয়াছে—সন্তানের জন্য পিতা-মাতা যেই ক্লেশ সহ্য করেন পুত্রপুত্রী শত শত বত্সরে, শত শত জন্মেও সেই ঋণ পরিশোধ করিতে সামর্থ্য নহে।
প্রশ্ন হইল—যাহারা বৃদ্ধ পিতামাতাকে দেখভাল করিতে চাহেন না, তাহারা এমন ধৃষ্টতার শিক্ষা কোথা হইতে পাইলেন? রবীন্দ্রনাথের ভাষায় আমরা এই ক্ষেত্রে বলিতেই পারি—‘ওরে ভাই, কার নিন্দা করো তুমি। মাথা করো নত।/ এ আমার এ তোমার পাপ।’ গতকাল ছিল বিশ্ব প্রবীণ দিবস। এই দিবস পার হইলে বয়স্কদের জন্য বাকি ৩৬৪ দিন আমরা যেন নীরব না থাকি। ইহা ডিজিটাল যুগ। বয়স্কদের সকল প্রকারের সহায়তার জন্য সরকার একটি টোল-ফ্রি হেলপলাইন চালু করিবার কথা ভাবিয়া দেখিতে পারে।