উত্পাদন আর উত্পাদনশীলতা বিষয় দু'টির পার্থক্য সম্পর্কে আমাদের ধারণা এখনও পরিষ্কার নয়। আমজনতা উত্পাদন বাড়ানো মানেই উত্পাদনশীলতা বাড়ানো- এমন ধারণায় বিশ্বাস করেন। এমনকি যারা উত্পাদনশীলতা নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কাজ করেন, তাদের বাইরে অন্যদের মধ্যেও বিষয় দুটির মৌলিক পার্থক্য এখনো তেমন স্বচ্ছ নয়। এর কারণ উত্পাদনশীলতা বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক অধ্যয়ন কিংবা প্র্যাকটিস বাংলাদেশে খুব বেশি দিনের নয়।
উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধির সাথে উত্পাদন বৃদ্ধির একটি যোগসূত্র রয়েছে। আগে একটি ফার্নিচার কারখানায় ৪ ঘন্টায় ৪ জন শ্রমিক কাজ করে ৪ টি চেয়ার বানাতেন। আর এখন ওই কারখানায় ৪ জন শ্রমিক ৪ ঘন্টা কাজ করে ৫টি চেয়ার বানাচ্ছেন। এক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে উত্পাদনশীলতা বেড়েছে। অর্থাত্ কোনো শিল্প-কারখানায় আগের মতোই কাঁচামালসহ উত্পাদনের বিভিন্ন ফ্যাক্টর ব্যবহার করে যদি উত্পাদনের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়, তাহলে ওই কারখানার উত্পাদনশীলতা বেড়েছে।
উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধির সঙ্গে উত্পাদনের বিভিন্ন উপকরণ বা ফ্যাক্টরের দক্ষ ব্যবহার, কাঁচামাল ও সময়ের অপচয় রোধ, শ্রমিক বা মানবসম্পদের দক্ষতা, কর্মস্পৃহা ও আগ্রহ, ঝুঁকিমুক্ত উত্পাদনবান্ধব পরিবেশ এবং উন্নত মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি জড়িত। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ফলে এর সঙ্গে যোগ হয়েছে পরিবেশবান্ধব ও জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার, রোবটিক টেকনোলজি, ন্যানো টেকনোলজি, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সসহ নতুন নতুন প্রযুক্তির প্রয়োগ। এসব ফ্যাক্টরের অপটিমাম বা সর্বোচ্চ ব্যবহার করে যদি আগের চেয়ে বেশি পণ্য উত্পাদিত হয়, সেক্ষেত্রে উত্পাদনশীলতা বেড়েছে বলে প্রতীয়মান হবে।
শিল্পোন্নত জাপান বাংলাদেশের পরীক্ষিত বন্ধু। গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য উন্নয়ন অংশীদার। জাপানের আদলে বাংলাদেশেও উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধির উদ্যোগ জোরদার করা হচ্ছে। উত্পাদনশীলতা আন্দোলন বেগবান করার প্রয়াস চলছে। উত্পাদনশীলতার উন্নয়নে জাতীয় প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল প্রোডাক্টিভিটি অর্গানাইজেশন (এনপিও) কাজ করে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যে জাপানের কারিগরি সহায়তায় এনপিও দশ বছর মেয়াদী ন্যাশনাল প্রোডাক্টিভিটি মাস্টার প্লান প্রণয়ন করেছে। এ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের শিল্পখাতে উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধির পাশাপাশি পণ্যের গুণমান, প্রতিযোগিতার সক্ষমতা ও উদ্ভাবনী দক্ষতা সন্তোষজনক পর্যায়ে উন্নীত করা হবে। এনপিও’র প্রচেষ্টায় ১৯৯৫-২০১৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশের শ্রম উত্পাদনশীলতা ৩ দশমিক ৮ শতাংশ হারে বেড়েছে। এক্ষেত্রে এশিয়ান প্রোডাক্টিভিটি অর্গানাইজেশনের (এপিও) সদস্যভুক্ত এশিয়ার ২০টি দেশের গড় প্রবৃদ্ধির হার ২ দশমিক ৫ শতাংশ। মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের বার্ষিক গড় উত্পাদনশীলতা ৫ দশমিক ৬ শতাংশ হারে বাড়ানো হবে। এর মধ্যে কৃষিখাতে গড়ে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ, শিল্পখাতে ৬ দশমিক ২ শতাংশ এবং সেবাখাতে ৬ দশমিক ২ শতাংশ হারে উত্পাদনশীলতা বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।
গোটা বিশ্ব এখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এর প্রভাবে শিল্প উত্পাদন ব্যবস্থায় এখন ব্যাপক গুণগত পরিবর্তন এসেছে। শিল্প কারখানার উত্পাদন প্রক্রিয়ায় শ্রমের জায়গায় প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি, মানবীয় দক্ষতা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার ইত্যাদি স্থান করে নিচ্ছে। মানবীয় শ্রম ব্যবহার করে আগে যে পরিমাণ পণ্য বা সেবা উত্পাদিত হতো, আধুনিক প্রযুক্তি বা যন্ত্রপাতির কল্যাণে সেখানে উত্পাদনের পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে গেছে। ফলে বিশ্ববাজারের প্রতিযোগিতা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। এ ধরণের প্রতিযোগিতায় নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে বিভিন্ন দেশ যখন নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, তখনই কোভিড-১৯ বিশ্বসম্প্রদায়ের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে।
শিল্প সম্ভাবনার বিবেচনায় বাংলাদেশ একটি সমৃদ্ধ জনপদ। এদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি ‘অনাবিষ্কৃত রত্ন’ বলে মনে করা হয়। কোভিড-১৯ বিশ্ব অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি বদলে দিয়েছে। এর ফলে পেশার রূপান্তর ঘটেছে। উন্নত দেশগুলো শ্রমঘন শিল্পের পরিবর্তে জ্ঞানভিত্তিক শিল্পের দিকে ঝুঁকছে। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প কারখানার পরিমাণ বাড়িয়ে কীভাবে করোনার ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া যায়, এখন এটাই তাদের আরাধ্য। উত্পাদন প্রক্রিয়ায় মানবীয় শ্রমের ব্যবহার কমিয়ে কীভাবে যান্ত্রিক উপায়ে উত্পাদনশীলতা আরও বাড়ানো যায়, তাদের সকল প্রয়াস সে লক্ষ্যেই পরিচালিত হচ্ছে। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশে শ্রমঘন ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্ডাস্ট্রি স্থানান্তরের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে করোনা মহামারী আপাতত: বাংলাদেশের জন্য অভিশাপ হলেও এটি শাপেবর হতে চলেছে। এটি সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে যাচ্ছে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে দেশিয় শিল্প কারখানায় উত্পাদন নয়, উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধির প্রয়াস বেগবান করা সময়ের অনিবার্য দাবি।
n লেখক : উপপ্রধান তথ্য অফিসার (শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ডে উপপরিচালক হিসেবে প্রেষণে কর্মরত)