সবচেয়ে প্রত্যন্ত দ্বীপে মানুষের জীবন কেমন

পৃথিবীর প্রত্যন্ত একটি দ্বীপ ত্রিস্তান ডি কুনহা। আটলান্টিক মহাসাগরের মাঝখানে অবস্থিত এই দ্বীপ। এই দ্বীপে যাওয়া খুবই কঠিন একটি কাজ। এই দ্বীপে যেতে হলে প্রথমে যেতে হবে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে। সেখান থেকে উঠতে হবে একটি নৌকায়। এরপর ১৮ দিন ধরে উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে যেতে হবে সেই দ্বীপে। রহস্যময় এই দ্বীপের পরিবেশ, খাবার, মানুষের জীবনযাপন পদ্ধতি—সবকিছুই অন্য যে কোনো স্থানের থেকে ভিন্ন।

দ্বীপটি ১০ কিলোমিটারের মতো প্রশস্ত হলেও এই দ্বীপে সমতলভূমি খুবই কম। চারপাশের দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা ঘিরে আছে পাথরের প্রাচীর, যা খাড়া নেমে গেছে উত্তাল সমুদ্রের গভীরে। অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে মানুষ ত্রিস্তান দ্বীপপুঞ্জে গিয়ে বসতি গড়ে তুলতে শুরু করে। সেখানে জনসংখ্যা কখনো কমেছে, কখনো বেড়েছে।

সর্বশেষ জরিপ অনুসারে ত্রিস্তান ডি কুনহা দ্বীপে মোট অধিবাসীর সংখ্যা ২৪৫। তাদের মধ্যে ১৩৩ জন নারী এবং ১১২ জন পুরুষ। তারা সবাই সেভেন সিজের এডিনবরায় বসবাস করে। দ্বীপে একটি কফি শপ আছে, সামাজিক আয়োজনের জন্য রয়েছে একটি হল, একটি পোস্ট অফিস এবং একটি পাব রয়েছে।

দ্বীপটি আকারে ছোট হলেও সেখানে একটি আধুনিক হাসপাতাল আছে। রয়েছে একটি স্কুলও। কেউ যদি সারা জীবন এই দ্বীপে কাটিয়ে দিতে চায়, তাহলে তাকে মজার কিছু অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়। এই যেমন যারা একসঙ্গে স্কুলে পড়ালেখা করেছে, তাদের সবাইকেই বাকি জীবন একসঙ্গে কাটাতে হবে। অর্থাৎ, স্কুলের প্রিয় বন্ধুদের কখনোই হারাতে হবে না। বিয়ের বহু বছর আগেই দেখা হয়ে যাবে ভবিষ্যৎ জীবনের স্বামী বা স্ত্রীর সঙ্গে। সেখানকার বাসিন্দাদের উত্তরসূরিদের নামের শেষে ছয়টি পদবির যে কোনো একটি থাকবেই।

এখানকার অধিবাসীদের মধ্যে মাত্র দুই জন এই দ্বীপে জন্মগ্রহণ করেননি। এদের এক জন পুরুষ আরেক জন নারী। কয়েক বছর আগে তারা দুই জনই দ্বীপের বাসিন্দাদের বিয়ে করে প্রত্যন্ত এই দ্বীপে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সেখানে এক জন ডাক্তার এবং এক জন শিক্ষকও রয়েছেন, যাদের ব্রিটেন থেকে পোস্টিং দেওয়া হয়েছে। কারণ এই দ্বীপ ব্রিটেনের বাইরে ব্রিটিশ শাসনাধীন এলাকা বা ব্রিটিশ ওভারসিজ টেরিটরি।

এখানকার পরিবেশ এতটাই শান্ত যে সেখানে ঘাস বড় হওয়ার শব্দও আপনি শুনতে পাবেন। আর জায়গাটি এতই নিরাপদ যে এখানে তালা বলে কিছু নেই। দ্বীপে রয়েছে ইন্টারনেট সংযোগও। তবে তা খুবই খারাপ। আর ভালো দিক হচ্ছে, এখান থেকে বিদেশে যত ফোন করা হয়, সেগুলো ফ্রি (যদি সংযোগ ঠিক থাকে)।

দ্বীপটির উপকূল জুড়ে তিন কিলোমিটার দীর্ঘ একটি রাস্তা আছে। এই সড়ক ধরে খোলা একটি জায়গায় যাওয়া যায়। সেখানে জমির পর জমি। এর চারপাশ পাথরের প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। তীব্র বাতাস থেকে লোকজনকে রক্ষা করতে এসব প্রাচীর তৈরি করা হয়েছে। সেখানে চাইলে যে কেউ সবজি চাষ করতে পারে। সেখানকার সাবেক একজন বাসিন্দা বলেন, ‘গ্রীষ্মে আমরা সেখানে যেতে পারি। শহরের বাইরে ছুটি কাটানোর জন্য ওটাই একমাত্র জায়গা।

দ্বীপের লোকজনের কাছে বারবিকিউ সবচেয়ে প্রিয় বিনোদন। আগুনে মাংস ঝলসে খাওয়াকে ব্রাই বলা হয়, যা ত্রিস্তান ডি কুনহার সবচেয়ে নিকটতম প্রতিবেশী দক্ষিণ আফ্রিকার সংস্কৃতি থেকে এসেছে। দ্বীপের গবাদি পশুগুলো মূলত এ কাজেই ব্যবহৃত হয়।

এই দ্বীপের যে তিনটি মেয়েকে মাধ্যমিক স্কুলের লেখাপড়া শেষ করার জন্য ব্রিটেনে পাঠানো হয়েছিল, তাদের এক জন উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে যাচ্ছে। এই মেয়ে হবে এই দ্বীপের প্রথম কোনো নারী, যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করবে। কেউ যদি সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে চায়, তাহলে তাকে দ্বীপের কাউন্সিলরের কাছ থেকে অনুমোদন নিতে হবে। তবে বেশির ভাগ আবেদনই ফিরিয়ে দেন কাউন্সিলর।—বিবিসি