মানুষের আদি মস্তিষ্ক নাকি তিনটি বিশেষ ভাবনা দ্বারা সকল সময় তাড়িত হয়। এই ব্যাপারে কানাডার কগনিটিভ নিউরোসায়েন্স রিসার্চের গবেষকগণ কিছুদিন পূর্বে জানাইয়াছেন—মানুষের আদি মস্তিষ্ক সর্বক্ষণ চারিপাশের পরিবেশ এবং অবস্থাকে জরিপ করিয়া চলিতেছে এবং আশপাশের প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে ভাবিয়া চলিতেছে তিনটি ভাবনা—‘আমি কি ইহাকে “খাদ্য” হিসাবে গ্রহণ করিতে পারি?’; দ্বিতীয়ত, ‘আমি কি ইহার সহিত যৌনতায় লিপ্ত হইতে পারি?’ এবং সর্বশেষ, ‘ইহা হইতে আমার কি প্রাণসংশয় হইতে পারে?’ অর্থাত্ মানুষের আদি মস্তিষ্ক কেবল তিনটি বিষয় সম্পর্কে সচেতন—খাদ্য, যৌনতা ও বিপদ। গবেষকেরা আরো ব্যাপক অর্থে বলিয়া থাকেন, ইহা কেবল মানুষের নহে, সকল প্রাণীর ক্ষেত্রেই সত্য।
আসলে মানুষ তো কেবল একটি সাধারণ প্রাণী নহে, সৃষ্টিকর্তার হিসাবে—আশরাফুল মাখলুকাত—অর্থাত্ সৃষ্টির সেরা জীব। সেই সেরা জীব প্রায়শই এমন সব কাণ্ড করিয়া বসে, যাহা পশুদেরও হার মানায়। গত সপ্তাহে সিলেটের মুরারীচাঁদ কলেজ এলাকায় স্বামীর সহিত বেড়াইতে গিয়া একজন নারী গণধর্ষণের শিকার হন, যাহা সারা দেশের মানুষকে প্রচণ্ডভাবে নাড়া দিয়াছে। গতকাল শুক্রবার ইত্তেফাকে প্রকাশিত সংবাদ হইতে জানা যায়, সিলেটের এমসি কলেজ ও আশপাশের এলাকায় অপ্রতিরোধ্য হইয়া উঠিয়াছিল ধর্ষণকাণ্ডে গ্রেফতার হওয়া ছাত্রলীগের সহিত জড়িত বখাটে তরুণরা। কলেজ ঘিরিয়া গড়িয়া তোলা হইয়াছিল অপরাধ সিন্ডিকেট। বান্ধবী বা স্ত্রীকে সঙ্গে লইয়া কেহ ক্যাম্পাসে বেড়াইতে গেলেই এই বখাটেদের হাতে লাঞ্ছিত হইতে হইয়াছে। এমনকি কোনো তরুণীর বন্ধু প্রতিবাদ করিলে ঐ তরুণীকেও গণধর্ষণ করিয়াছে গ্রুপটি। আর বেড়াইতে আসা অতিথিদের নিকট হইতে ছিনতাই, লুট এবং তাদের মারধর করিবার ঘটনা ছিল নিয়মিত। ইত্তেফাকের সরেজমিন রিপোর্টে জানা গিয়াছে, গত পাঁচ বত্সরে এমসি কলেজ ক্যাম্পাসের পিছনের টিলায় অন্তত ১০টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটিয়াছে। এমনকি অভিযোগ রহিয়াছে যে, এই সকল অনেক ঘটনাই নাকি প্রশাসন জানিত! অথচ তাহারা কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে পারিত না। কারণ ঐ সিন্ডিকেটের নিকট জিম্মি ছিল কলেজ প্রশাসনও। এইদিকে, বান্ধবীর বাসার কাজের মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেফতার হইয়াছে ছাত্রলীগের ঢাকা মহানগর উত্তরের সহসভাপতি সবুজ।
আমরা বিস্ময়ের সহিত লক্ষ করিতেছি, গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে ক্ষমতাপুষ্ট ছাত্ররাজনীতির ছায়াতলে এমন সকল আগাছার জন্ম হইয়াছে, যাহারা চরমভাবে কলুষিত করিয়াছে ছাত্ররাজনীতিকে। অথচ আমাদের রহিয়াছে ছাত্ররাজনীতির অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল দীর্ঘ অতীত। প্রশ্ন হইল, আগাছা তো উর্বর জমিতে জন্মাইতেই চাহিবে, কিন্তু তাহা নির্মূল না করিয়া উহার গোড়ায় জলসিঞ্চন করিবার কারণ কী? ইহাতে আড়ালে এবং আখেরে কাহারা লাভবান হইতেছেন? ইহার উত্তর জানা দরকার। বহুদিন ধরিয়া আমরা দেখিয়া আসিতেছি, ক্ষমতাসীন দলের ভুঁইফোঁড়রা অত্যাচার-নির্যাতন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, টেন্ডার দখল, অফিস দখলে মত্ত হাতির ন্যায় আচরণ করে। ক্ষমতার রাজনীতি এই আগাছাদের নিকট শর্টকাটে বিপুল অর্থ উপার্জন এবং প্রভাব-বলয় তৈরির উপায় ছাড়া আর কিছু নহে। ক্ষমতাসীন দলই হউক বা ক্ষমতার বাহিরে থাকা দলই হউক, সকলেরই উচিত দলকে যে কোনো ধরনের অপব্যবহার হইতে মুক্ত করা। বিশেষ করিয়া, যেই দল সরকারে থাকে তাহাদের জন্য ইহা গুরুদায়িত্ব। একটি দল ক্ষমতায় থাকিতে অপাঙেক্তয় ব্যক্তিদের দ্বারা যতটা দূষিত হয়, দল ততই দুর্বল হইতে থাকে। ক্ষমতাসীন দল এই সত্য হইতে বিস্মৃত হইলে ইহার জন্য দেশ ও জাতিকে অনেক অধিক মূল্য চুকাইতে হয়।