তবিবুল ইসলাম বাবু
সদ্য প্রয়াত বাংলাদেশ সরকারের প্রধান আইনজীবী অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলমের প্রয়াণে বাংলাদেশ নিঃসন্দেহে একজন বিশিষ্ট নাগরিককে হারাল। এই অপূরণীয় ক্ষতিতে আমরা ব্যথিত ও শোকাহত। মাহবুবে আলমের স্ত্রী বিনোতা মাহবুব আমার স্ত্রী নাট্যশিল্পী সাঈদা ইসলামের কলেজ সহপাঠী। সেই সুবাদে অনেক দিন ধরেই এই দম্পতির সঙ্গে আমাদের প্রগাঢ় বন্ধুত্ব। একজন ধীমান, সদালাপী, মিষ্টভাষী, সংস্কৃতিমান ও দক্ষ আইনজীবী মাহবুবের স্মৃতি ভোলার নয়। মাহবুবে আলম একজন সংগীতপ্রেমী ছিলেন। বিশেষ করে, উচ্চাঙ্গ সংগীতের একজন একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন। যেখানেই উচ্চাঙ্গ সংগীত, এমনকি কলকাতার বিখ্যাত বার্ষিক ডোভারলেন উচ্চাঙ্গ সংগীত সম্মেলনে তিনি নিয়মিত যোগদান করতেন। একবার তার বাসভবনে পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী মোহন সিং ও মনোজ মুরালী নায়ারকে ঢাকায় এনে নিজ বাসায় রেখে শহরে বিশিষ্ট সংগীতপ্রেমীদের আমন্ত্রণ জানিয়ে গানের জলসার পর নৈশভোজনে আপ্যায়িত করেছিলেন। আমি শান্তিনিকেতনে গিয়ে মাহবুবের পক্ষে তাদের আমন্ত্রণ জানিয়ে এসেছিলাম। গভীর রাতে মাহবুব দম্পতি শাহজালাল বিমানবন্দরে তাদের স্বাগত জানান।
মাহবুবে আলম অতিথি আপ্যায়ন ভালোবাসতেন। মিরপুরে আমরা কাছাকাছি থাকতাম। এক সন্ধ্যায় তার বাসায় বিশিষ্ট আইনজীবীদের আমন্ত্রণ জানান। ড. জহির প্রমুখ গান গেয়ে শোনান। অসুস্থতার কারণে আমার স্ত্রী অনুষ্ঠানে যোগদান করতে না পারায় সুগৃহিণী বিনোতা মাহবুব দুটো টিফিন ক্যারিয়ারে বাল্যবন্ধুর জন্য খাবার দেন। দুটো ঢাউস মাপের টিফিন ক্যারিয়ার হাতে নিয়ে দরজার কাছে রাখা পাম শু পরতে অসুবিধা হচ্ছিল। সবাইকে অবাক করে অতিথিরা প্রত্যক্ষ করলেন মাহবুব নিচু হয়ে আমার পায়ে জুতো পরিয়ে দিলেন।
আমার একমাত্র কন্যার জটিল অস্ত্রোপচারের সময় এক সকালে মাহবুব আমার বাসায় এসে নগদ ৫০ হাজার টাকা দিয়ে প্রয়োজন হলে চিকিত্সার ব্যয়ভার বহন করতে অনুরোধ করেছিলেন। আমার নাট্যদল নাট্যজনের তেভাগার পালা নাটকে জনৈক নির্দেশক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে আমি তাকে মহড়ার মাঝপথে অব্যাহতি দিই। তিনি নাট্যাঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের দ্বারা আমাকে অনুরোধ করে ব্যর্থ হলে দলপ্রধান হিসেবে আমার বিরুদ্ধে মামলা করে নাটকের মঞ্চায়নের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগে আদালতের দারস্থ হন। ঘটনাটি শুনে মাহবুবে আলম আমাদের পক্ষে স্বয়ং মামলা পরিচালনার দায়িত্ব নেন। আদালতে মাহবুব আলমের উপস্থিতি দেখে অন্য পক্ষের আইনজীবীরা চম্পট দেন, মামলা শেষ হয়। পরবর্তীকালে উনি নাট্যজনের উপদেষ্টা হন।
একবার অ্যাটর্নি জেনারেলের কামরায় দুপুরে একটি কাজে গিয়েছিলাম। কামরায় আইনজীবী প্রমুখের প্রচণ্ড ভিড়। এমন সময় মফস্সল থেকে জনৈক সরকারি আইনজীবী একজন আসামির জামিনের ব্যাপারে ফোন করেন। মাহবুবে আলম তাকে বললেন জামিনের প্রচণ্ড বিরোধিতা করতে। কারণ, জামিন পেলেই আসামি বিদেশে পালিয়ে যাবেন।
যা-ই হোক, একজন শখের চারুশিল্পী বিনোতা মাহবুব একজন গোছাল গৃহিণী। নিজেই শাড়ি নকশা করে ‘গাঁথন’ নামে একটি বুটিকের দোকান দিয়েছিলেন। ঘর ছিমছাম করে সাজিয়ে রাখেন। বাইরেও ছিমছাম মাহবুব আলম আমাদের মনে চিরদিন জাগরূক থাকবেন। প্রতিদিন সকালে অফিসে যাওয়ার আগে পথিমধ্যে সেগুনবাগিচায় ছোট নাতি-নাতনিকে দেখতে যেতেন। মাহবুবে আলম ওপারে তুমি চিরশান্তিতে থাকো—পরম করুণাময় আল্লাহতায়ালার কাছে এই প্রার্থনাই করি।
n লেখক :দলপ্রধান, নাট্যজন