অর্থনীতিতে কর্মসংস্থানের সুযোগ

রেজাউল করিম খোকন

বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসের প্রকোপ কমছে না কোনোভাবেই। এই সংকটজনক পরিস্থিতি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে দিনে দিনে। যার আঘাতে দেশের অর্থনীতি মারাত্মক হুমকিতে পড়েছে। শিল্প-কারখানা, অফিস, আদালত ব্যাংক-বীমা খোলা হলেও মারাত্মক হুমকির মধ্যে পড়ে আছে শ্রমবাজার। একদিকে জীবন আশঙ্কা, অন্যদিকে জীবিকার তাগিদ। কোন দিকে যাবে মানুষ, ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। পুরোনো কর্মস্থলে স্বাভাবিকতা ফিরে আসেনি বলে সেখানে যেতে পারছেন না অনেকে। বিদেশ থেকে দেশে ফিরে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন অগণিত মানুষ। এখানেও কাজের তেমন সুযোগ সৃষ্টি হয়নি। ফলে এই সময়ে অর্থনীতিতে অন্য সব সমস্যা ছাপিয়ে বেকারত্বই প্রকট আকার ধারণ করেছে।  আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে করোনা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে দেশের অর্থনৈতিক সংকট আরো চরম আকার ধারণ করবে— বিশ্লেষণকরা মনে করছেন। করোনা পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বেকারত্বের সঙ্গে বাড়বে সামাজিক সংকটও। ইতিমধ্যে দেশে কয়েক লাখ মানুষ বেকার হয়ে পড়েছেন। সবার জীবন-জীবিকার যুদ্ধে পরাজিত লাখ লাখ মানুষ ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা মহানগর ছেড়ে পরিবারসহ নিজ নিজ গ্রামে ফিরে গেছে। দেশকে সমৃদ্ধ উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যেতে হলে, জনসংখ্যার বিরাট বোঝাকে অভিশাপ মনে না করে আশীর্বাদ হিসেবে গণ্য করতে হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি শিক্ষার বিস্তার এর কোনো বিকল্প নেই। কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণ-তরুণীরাই আমাদের অর্থনীতির চেহারাটা আরো বদলে দিতে পারে। দেশে তো বটেই, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভালো বেতনে চাকরি নিয়ে যেতে পারে তারা।

আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে উপযুক্ত এবং ভালো বেতনে চাকরির সুযোগ পেতে পারে তারা অনায়াসেই। এভাবে আমাদের প্রবাসী রেমিট্যান্স ধারায় বিপুল জোয়ার সৃষ্টি হতে পারে। বেকারত্ব আমাদের দেশে দীর্ঘমেয়াদি একটি সমস্যা। এখানে প্রতি বছরই শিক্ষিত ও অশিক্ষিত তরুণ-তরুণী বেকার তালিকায় উঠে আসছে। এ সবের মধ্যে গত কয়েক বছরে আমাদের যে প্রবৃদ্ধি হয়েছে তাকে অর্থনীতির ভাষায় ‘জবলেস গ্রোথ ইকোনোমি’ নামে অভিহিত করা হয়। এই প্রবৃদ্ধিতে কাজের সুযোগ খুব একটা বাড়েনি। অর্থাত্ যেভাবে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ঠিক সেভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়নি। ফলে দিন দিন ‘জবলেস গ্রোথ ইকোনমি’ যেমন বেড়েছে তেমনি সামাজিক বৈষম্যও প্রকট থেকে প্রকটতর হয়েছে।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় বিদেশ প্রত্যাগত শ্রমিক কর্মীদের আবার তাদের আগে কর্মস্থলে ফেরত পাঠাতে নানাভাবে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। যাতে তারা হারানো চাকরি ফিরে পান সেজন্য দেন দরবারও শুরু করেছেন। আর যারা ফেরত যেতে পারছেন না তাদের স্থানীয়ভাবে কাজের ব্যবস্থা করার পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আত্মকর্মসংস্থানকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়ন কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প হিসেবে এসএমই খাতকে চাঙ্গা করা হচ্ছে। চাকরি খোঁজার পরিবর্তে উদ্যোক্তা তৈরিকে অগ্রাধিকার দিয়ে এই দুটি খাতের ব্যাংকিংসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে।  করোনা ভাইরাসের প্রকোপ কবে নাগাদ প্রশমিত হবে তা এখনো নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। এ পরিস্থিতি এত দিন দীর্ঘায়িত হবে কেউ ভাবেননি। দীর্ঘ সময় ধরে সব ধরনের কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা অর্থনীতিতে যে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে তা এখন সুস্পষ্ট হয়ে উঠছে চোখের সামনে। কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে আসছে দিনে দিনে। কাজ-কর্ম, ব্যবসা-বাণিজ্য, দোকানপাট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক স্বচ্ছল মানুষও এখন দৈন্যদশায় পড়েছে। এ সংকট সহসা কাটবে বলে মনে হচ্ছে না। বরং তা আরো প্রকট হয়ে উঠতে পারে আগামী কয়েক মাসে। এ অবস্থায় কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির কোনো বিকল্প নেই। সরকার এ লক্ষ্যে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে তার যথাযথ বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সবাই বিশেষভাবে মনোযোগী হতে হবে। এ ক্ষেত্রে খামখেয়ালি, আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা ইত্যাদিকে প্রশ্রয় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কঠোর মনিটরিংয়ের মাধ্যমে অর্থনৈতিক পুনর্বাসনের কাজগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। স্রেফ সরকারি উদ্যোগ, পদক্ষেপ, ব্যবস্থাপনার দিকে তাকিয়ে না থেকে বেসরকারিভাবে দক্ষতা, মেধা, অভিজ্ঞতা এবং মূলধনের যথোপযুক্ত ব্যবহার সুনিশ্চিত করতে হবে। সমন্বয়হীনতা এ ধরনের উদ্যোগে বড় ধরনের বাধার সৃষ্টি করে সাধারণত। এ বিষয়টিও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে সংশ্লিষ্ট সবাইকে।

জনবহুল একটি দেশের বেশির ভাগ নারী-পুরুষ যদি কর্মক্ষম এবং উপার্জনক্ষম হন তাহলে সে দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি স্বাভাবিকভাবেই মজবুত হতে বাধ্য। আমাদের জনসংখ্যাকে আপদ না ভেবে জনশক্তিতে রূপান্তরের চেষ্টা চালাতে হবে। তখন তা জনসম্পদে পরিণত হবে। আমরা আমাদের জনসম্পদকে দেশের অভ্যন্তরে যেভাবে কাজে লাগাই না কেন, তা আমাদের জন্য সমৃদ্ধির নতুন বার্তা বয়ে আনবে। অর্থনীতিতে ভিন্ন মাত্রা যুক্ত করবে। জনশক্তিকে কারিগরি জ্ঞানে সমৃদ্ধ করে জনসম্পদে রূপান্তরের লক্ষ্যে আমাদের সবাইকে সচেতনভাবে এগিয়ে আসতে হবে। এটা দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়ার সঠিক ও কার্যকর উপায়। বেকার, কারিগরি জ্ঞানশূণ্য তরুণ-তরুণীদের মেধা, শ্রম ও মননশীলতাকে যথার্থভাবে কাজে লাগাতে না পারলে আমাদের জাতীয় জীবনে আরো অনেক দুর্যোগ এসে হানা দিতে পারে। আমরা কোনোভাবেই তা চাই না।

n লেখক :সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা ও কলাম লেখক