সোহাগ মনি
মানুষ তার জীবনে কয়েকটি কাল অতিক্রম করে। পর্যায়ক্রমে আসে এসব কাল, দিয়ে যায় একেক রকম অভিজ্ঞতা। একটা মানুষই হয়ে ওঠে কয়েকটি কালের অধিকারী। তার মধ্য জীবনের সবচেয়ে ক্রান্তিকাল বোধহয় বৃদ্ধকালই।
আমাদের সমাজ, দেশ এবং পারিবারিক অবকাঠামোগত দিক থেকে এই বৃদ্ধকালের মানুষগুলোকে কতটুকু মূল্যায়ন করি? তারা নিজেদের কতটুকুই সুখী মনে করে কিংবা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে জীবনের শেষ বেলায়! যন্ত্রমানবের এই যুগে তার খবরই-বা রাখে কজন। আমাদের সমাজের প্রেক্ষাপটে অনেকেই মনে করি, তাদের বেলা তো শেষই, যে কদিন আছে এমনিতেই চলে যাবে! কিংবা গুরুত্বের বিচারেও খুব একটা সামনে আনি না তাদের।
মানুষের জীবনের একেকটি দিনের মূল্য অনেক। একটি দিন বাঁচা মানুষকে জীবনের সংজ্ঞা পরিবর্তন করে দিতে পারে। আর সেই মানুষের শেষবেলার জীবনকে আমরা কেমন অবহেলায় রাখি। পরিবার, সমাজ, দেশকে তারা যা দিয়েছেন, তার কতটুকু পান তাদের শেষজীবনে? সমাজের কাছে অপ্রয়োজনীয়, নিজের পরিবারের কাছেও অবমূল্যায়ন। মানুষ হিসেবে মেনে নেওয়া খুবই কষ্টকর।
শেষজীবনে এই মানুষগুলো নিজেদের খুব একা মনে করে। আমাদের উচিত তাদের সঙ্গ দেওয়া, তাদের জীবনের অভিজ্ঞতা শোনা, এতে বৃদ্ধ মানুষগুলোকে ভালো রাখার পাশাপাশি তাদের জীবনের অভিজ্ঞতা কাজেও লাগানো যায়। যে জীবন তারা পার করে এসেছেন, সে জীবনের সমস্যা কিংবা সম্ভাবনার গল্পগুলো আমাদের চলার পথের পাথেয় হয়ে থাকতে পারে।
জীবনের ইতি কিভাবে, কখন ঘটবে সেই চিন্তা কেড়ে নেয় তাদের মুখের হাসিটুকুও, তাই তাদের সব সময় হাসিখুশিতে রাখার চেষ্টা করতে হবে আমাদের, যাতে জীবনের এই দিনগুলো তাদের কাছে তিক্তকর হয়ে না ওঠে। নিজেকে এই মানুষগুলোর জায়গায় চিন্তা করুন, দেখবেন কেমন অসহায়ত্ববোধ কাজ করে। আপনিই আগামী দিনে এই তিক্তকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হবেন, যে আপনি আজ খুব কর্মচঞ্চল প্রাণবন্ত, সেই আপনিই জীবনের প্রয়োজনে একদিন বৃদ্ধ হবেন, ঠিক তেমনি একটা সময় তারাও আপনার মতোই ছিল, শুধু সময়ের টানে আজ এ অবস্থার সম্মুখীন, অতএব এই মানুষদের সুখ-দুখের কথা ভাবুন, পরবর্তী প্রজন্মও তাহলে আপনাকে নিয়ে ভাববে, না হয় আপনারও এমন তিক্তকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হবে।
কোনো কাজের মতামতে আমরা বৃদ্ধদের প্রাধান্য দেই না খুব একটা। এতে তারা মানসিক পীড়ায় ভোগেন। তাঁরা নিজেদের অপ্রয়োজনীয় ভাবতে শুরু করেন, আর পৃথিবীতে থেকে নিজেকে এই পৃথিবীর অপ্রয়োজনীয় ভাবাটা বড় কষ্টের। তাই যে কোনো কাজের মতামতের ক্ষেত্রে অন্তত তাঁদের জানানো এবং মতামত নেওয়াটা জরুরি। এতে করে এই মানুষগুলো অন্তত নিজেকে কার্যকর মনে করতে পারবেন, জীবনকে আরো কিছুদিন উপভোগ করতে পারবেন। তাঁদের কথা আমাদেরই ভাবতে হবে। জীবনের শেষ দিকে তাঁদের চাওয়াপাওয়াকে গুরুত্ব দিতে হবে। সমাজের ধ্যানধারণা পরিবর্তন করা জরুরি এই মানুষগুলোর ভালো থাকার প্রয়োজনে। সমাজে কোনো ধরনের অবমূল্যায়ন যাতে না হয় সে দিকে দৃষ্টি দেওয়া জরুরি। সমাজের কাছ থেকে, কাছের মানুষের কাছ থেকে তাঁরা এতটুকু আশা করতেই পারেন।
দেশ-সমাজ-পরিবারের কাছে তাঁদের মূল্যায়ন হোক, জীবনের শেষদিকটায় কিছু সুখস্মৃতি থাকুক তাঁদের জীবনে, চাওয়াপাওয়ার প্রাপ্তি ঘটুক জীবনের অবেলায়, এমনটাই প্রত্যাশা সমাজ এবং মানুষের কাছে।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়