ফরিদ উদ্দিন রনি
একটি দেশের উন্নয়ন সে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে। বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যাবে, যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিক শিক্ষা বাস্তবায়নে শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন নতুন কাঠামো তৈরি করছে। আর আমাদের দেশে বিপরীত—প্রচণ্ড স্বার্থপরতা, শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্যপূর্ণ ব্যবস্থা।
শিক্ষক মানুষ গড়ার কারিগর। অথচ সেই কারিগররা আজ সমাজে অবহেলিত। অনেকক্ষেত্রে তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। বাবা একজন শিক্ষক হওয়ার কারণে খুব কাছে থেকে দেখেছি তিনি কতটা যত্নবান ছিলেন তাঁর ছাত্রছাত্রীদের প্রতি। এটাও দেখেছি স্বল্প টাকায় কী নিদারুণ কষ্ট করে আমাদের ভাইবোনদের পড়াশোনা করিয়েছেন। পাশাপাশি গরিব ছাত্রদের পড়িয়েছেন। তার বিনিময় পেয়েছেন ভালোবাসা, সম্মান। অথচ নতুন প্রজন্মের কেউ শিক্ষক হতে চায় না! একাধিক চাকরি খোঁজার পর উপায় না দেখে শিক্ষক হতে আসে! শিক্ষকতার প্রতি বিমুখ হওয়ার কারণ, এই পেশার যথার্থ মূল্যায়ন করা হয় না। পারিশ্রমিক ঠিকমতো দেওয়া হয় না। তারা তাদের অধিকার আদায়ের দাবি তুললে, কপালে জোটে পুলিশের লাঠিপেটা, কাঁদানে গ্যাস, গরম জল...! আধুনিক জাতি গঠনে বিজ্ঞানমনস্ক করে ছাত্রদের গড়ে তোলার পেছনে শিক্ষকই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। অথচ তাঁদের যথার্থ পারিশ্রমিক না দেওয়ায়, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পর ক্লাস নেন কোচিং সেন্টারে। শিক্ষাকে ব্রত হিসাবে না দেখে অনেক শিক্ষকই এটাকে দেখে থাকেন লাভজনক বাণিজ্য হিসাবে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রতিটি দেশেই শিক্ষকদের সম্মান এবং বেতনভাতা অনেক বেশি, আমাদের দেশে তার উলটো। যেখানে অন্যান্য পেশার পারিশ্রমিকের কথা বললে মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষকদের পারিশ্রমিক বলতে হবে সর্বনিম্ন!
আমরা যে স্বপ্ন দেখি—একদিন বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে, সেটা কি মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় না এলে কখনো সম্ভব? আমরা দেশটাকে পরিবর্তন করতে চাই, কিন্তু পরিবর্তন করার জন্য যেটা প্রথমেই দরকার সেই শিক্ষা ও শিক্ষকের ধারেকাছেও যাই না। তাঁদেরকে নিয়ে এক মিনিটও ভাবতে চাই না। সময় এসেছে শিক্ষকদের নিয়ে কথা বলার, তাঁদের অধিকার আদায়ের কথা বলার। দেশকে সুশিক্ষিত আধুনিক সভ্য দেশ হিসাবে গড়ে তুলতে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক এবং উচ্চশিক্ষায় পাঠদানরত শিক্ষকদের যথাযথ মর্যাদা এবং বেতন নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজন হলে গঠন করতে হবে শিক্ষকদের জন্য আলাদা বেতন কাঠামো। মেধাবী মুখদের শিক্ষকতা পেশায় আকর্ষণ করতে হলে প্রাইমারি স্কুল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় স্তরের শিক্ষকদের মর্যাদা এবং বেতনভাতা বাড়াতে হবে। শিক্ষার মান ফিরিয়ে আনতে শিক্ষকদের যথার্থ মূল্যায়ন করতেই হবে। যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থার চাওয়া—বৈষম্যমুক্ত শিক্ষা, শিক্ষকতা পেশাই হোক সবার প্রিয়।
ঢাকা