করোনার ধাক্কায় গত বছরের মার্চ থেকে লাইনচ্যুত হওয়া রাজস্ব এখনো সঠিক ‘ট্র্যাকে’ ফিরতে পারেনি। যদিও নতুন অর্থবছরে অর্থনীতিতে গতি কিছুটা ফিরেছে। এর সঙ্গে রাজস্ব আদায় কিছুটা বাড়লেও লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বেশ পিছিয়ে রয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হিসাবে, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই ও আগস্টে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি প্রায় ১০ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা। আলোচ্য সময়ে ৪০ হাজার ৯৪৭ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ৩০ হাজার ১৬২ কোটি টাকার রাজস্ব। সূত্র জানিয়েছে, গত জুলাইয়ে আদায় না বেড়ে উলটো কমে গিয়েছিল। তবে আগস্টের আদায়ের ওপর ভর করে দুই মাসে সার্বিকভাবে আদায় বেড়েছে ০.১৬ শতাংশ। অথচ বিপুল পরিমাণ লক্ষ্যমাত্রা থাকায় এ বছর এনবিআরকে রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে ৪৮ শতাংশ হারে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমের বিবেচনায় লক্ষ্যমাত্রা অনেক বেশি দেওয়া হয়েছে এনবিআরকে। ফলে ঘাটতি বেশি মনে হচ্ছে। তারা বলছেন, মাত্রাতিরিক্ত লক্ষ্যমাত্রা নেওয়ায় এবারও অর্থবছর শেষে বিপুল রাজস্ব ঘাটতি দেখা যাবে। অর্থনীতিবিদ ও পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর ইত্তেফাককে বলেন, আদায়ে প্রবৃদ্ধি বলতে গেলে নেই। অথচ বাড়াতে হবে প্রায় ৫০ শতাংশ হারে। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে না। গত বছরের মতো এবারও শেষ পর্যন্ত অন্তত ৮০ হাজার কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম আদায় হবে। বাস্তবতা বিবেচনায় লক্ষ্যমাত্রা না নেওয়ায় রাজস্ব তথা সার্বিক বাজেট দিনে দিনে মানুষের কাছে অর্থহীন হয়ে যাবে। অন্যদিকে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর জন্য এনবিআরের যে কাঠামোগত সংস্কার করা দরকার, তাও হচ্ছে না। কার্যকর সংস্কার না করে মরা ঘোড়া পিটালে তো দৌড়াবে না।
গত ২০১৯-২০ অর্থবছরেও শুরুতে ৩ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়। বছর শেষে দেখা গেল আদায় হয়েছে ২ লাখ ২৩ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা। অর্থাত্ প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ঘাটতি ছিল ১ লাখ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছর এনবিআরকে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। অথচ করোনার ধাক্কা থেকে কেবল মাথা তুলে দাঁড়াতে শুরু করেছে অর্থনীতি।
এক দিকে বিপুল লক্ষ্যমাত্রা দেওয়ায় রাজস্ব আদায় হচ্ছে না, অন্যদিকে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে গিয়ে মাঠ পর্যায়ে হয়রানির অভিযোগ করছেন ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইও অতীতে মাত্রাতিরিক্ত রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়ায় ব্যবসায়ীদের ওপর হয়রানির অভিযোগ তুলেছিল।
এফবিসিসিআইর সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ প্রকৌশল শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক ইত্তেফাককে বলেন, মাঠ পর্যায়ে ভ্যাট কর্মকর্তাদের হয়রানি চলছে। বিপুল রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয় আমাদের (ব্যবসায়ীদের) কলিজা খুইলা খাওয়ার জন্য। এছাড়া এনবিআরের বিভিন্ন নীতির কড়া সমালোচনা করেন তিনি।
সূত্র জানায়, রাজস্ব আদায়ের সঠিক খাত চিহ্নিত করতে প্রয়োজনীয় গবেষণাও নেই। এছাড়া রাজস্ব কাঠামো সংস্কার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বহু আলোচনা হলেও তাতেও প্রত্যাশিত গতি নেই। ফলে জিডিপিতে রাজস্বের অবদান এখনো অনেক নিচে। এমনকি দক্ষিণ এশিয়ায় জিডিপিতে বাংলাদেশেই রাজস্বের অবদান সবচেয়ে কম। অন্যদিকে ব্যবসায়ী এবং করদাতাদের কাছ থেকে হয়রানির অভিযোগও শুনতে হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ পরিস্থিতিতে রাজস্ব আদায় বাড়াতে দ্রুত অটোমেশনে যাওয়ার বিকল্প নেই।
এনবিআরের হিসাবে অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই ও আগস্টে ১৫ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ভ্যাট আদায় হয়েছে ১১ হাজার ৩৫২ কোটি টাকা। অর্থাত্ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ঘাটতি ৪ হাজার ১১৩ কোটি টাকা। ১৫ হাজার ৪৬৩ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে শুল্ক আদায় হয়েছে ১০ হাজার ৯ কোটি ও ১০ হাজার ২০ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আয়কর আদায় হয়েছে ৮ হাজার ৮০৩ কোটি টাকা।
অবশ্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি বাড়তে থাকায় আগামী মাসগুলোতে রাজস্ব আদায় আরো বেশি হারে বাড়বে বলে আশা করছেন এনবিআর কর্মকর্তারা।
চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা। এছাড়া আয়কর ১ লাখ ৫ হাজার ৪৭৫ কোটি এবং শুল্ক আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে ৯৫ হাজার ৬৫২ কোটি টাকা।