কর্ণফুলী নদীতে চট্টগ্রাম বন্দরের ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রকল্পের ব্যয় সাত বছরের ব্যবধানে প্রায় সাড়ে চার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। কর্ণফুলী নদীর সদরঘাট কাস্টমস খালের মুখ থেকে শুরু করে শাহ আমানত সেতুর ৫০০ মিটার উজানে সোয়া দুই কিলোমিটার পর্যন্ত নদীর ড্রেজিংয়ের কাজ গত সাত বছর ধরে থেমে থেমে চলে আসছে।
ড্রেজিংয়ের কাজে ধারাবাহিকতা না থাকায় নদীর ঐ অংশে ময়লা-আবর্জনা-পলি জমার পরিমাণ অনেক বেড়ে গেছে। ফলে ২০১৩ সালে বুয়েটের সংশ্লিষ্ট বিভাগের জরিপে যেখানে চার মিটার ড্রাফট রাখার জন্য ৩৬ লাখ ঘনমিটার মাটি উত্তোলনের প্রয়োজন ছিল সেখানে ২০১৮ সালের জরিপ অনুযায়ী ৪৩ লাখ ঘনমিটার মাটি উত্তোলনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়। ২০২০ সালে ঐ সোয়া দুই কিলোমিটার নদীর গভীরতা ৪ মিটার রাখার জন্য ৫২ লাখ ঘনমিটার মাটি-বালি উত্তোলনের প্রয়োজন রয়েছে বলে বুয়েটের সংশ্লিষ্ট বিভাগের জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে।
সময়ের ব্যবধানে প্রতি ঘনমিটার মাটি-বালি উত্তোলনের দরও বৃদ্ধি পেতে থাকে। ২০১৩ সালে প্রতি ঘনমিটার মাটি-বালি উত্তোলনের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৯৮ টাকা। ২০১৮ সালে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪২৭ টাকা। সর্বশেষ সম্প্রতি প্রতি ঘনমিটার ধরা হয়েছে ৬১৯ টাকা। এর ফলে ২০১৩ সালে ৩৬ লাখ ঘনমিটার বালি-মাটি উত্তোলনের জন্য যেখানে ব্যয় ধরা হয়েছে ৭১ কোটি ২৮ লাখ টাকা সেখানে ২০১৮ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ১৮৩ কোটি ৬১ লাখ টাকা। সর্বশেষ সাম্প্রতিক সময়ে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩২১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।
২০১৩ সালে মালয়েশিয়ান মেরিটাইম ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন নামক একটি প্রতিষ্ঠান কর্ণফুলী নদীর ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রকল্প টেন্ডারের মাধ্যমে কার্যাদেশ পায়। প্রকল্পটি ২২৯ কোটি টাকা ব্যয়ে সম্পন্ন করার কথা ছিল। প্রকল্পের মধ্যে চারটি জেটি নির্মাণ, ৪০০ মিটার বাঁধ নির্মাণ, ওয়াকওয়ে এবং ড্রেজিংয়ের কাজ সম্পন্ন করা। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করতে না পারায় বন্দর কর্তৃপক্ষ তাদের কার্যাদেশ বাতিল করে। এরপর প্রকল্প মামলায় আটকা পড়ে যায়। ২০১৮ সালের শেষের দিকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ড্রেজিংয়ের কাজের জন্য বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে দায়িত্ব দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে নৌবাহিনী কল্যাণ সংস্থার মাধ্যমে ড্রেজিংয়ের কাজের দায়িত্ব পায় সাইফ পাওয়ার টেক নামক একটি সংস্থা। কিন্তু কাজ করতে গিয়ে দেখা যায়, চাক্তাই খালমুখসংলগ্নসহ বিরাট এলাকায় পলিথিন, কাপড়সহ বিভিন্ন কঠিন পদার্থের বিরাট স্তর পড়ে গেছে। কোনোভাবেই সাধারণ ড্রেজার ব্যবহার করে নদী খনন এবং মাটি-আবর্জনা উত্তোলন করা সম্ভব হচ্ছে না। এমনকি উন্নতমানের ৩২ ইঞ্চি ড্রেজার এনেও অনেক এলাকার মাটি উত্তোলনসহ পলিথিন কাপড়ের স্তর ভাঙা সম্ভব হচ্ছে না।
বুয়েটের পক্ষ থেকে বিশেষজ্ঞ টিম পরীক্ষা করে সদরঘাট থেকে উজানে সোয়া দুই কিলোমিটার নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে ব্যাপক পলিথিন ও কাপড়ের কয়েক মিটার স্তর পেয়েছে বলে জানা যায়। কর্ণফুলী নদীতে নগরীর ৫২টি খাল-নালা দিয়ে প্রতিনিয়ত সব ধরনের ময়লা-আবর্জনাসহ মলমূত্র পড়ছে। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ২০০ টন ময়লা-আবর্জনা নদীতে পড়ছে। এতে করে নদী যেমন ভরাট হওয়ার মাত্রা বাড়ছে, একইভাবে দূষণের পরিমাণও বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশাল পরিমাণ ময়লা-আবর্জনা ও দূষিত পদার্থের বিরাট অংশ ভাটার সময় সমুদ্রে চলে যায়। এর পরও কর্ণফুলী নদীতে ধারাবাহিক ড্রেজিং না করলে এবং দূষণ রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা গেলে নদীর গভীরতা কমে যাবে। এটি দূষিত পানিবাহী নদীতে পরিণত হবে বলে নদী বিশেষজ্ঞদের অভিমত। ড্রেজিংয়ের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করে এর নাব্যতা রক্ষার জন্য বিভিন্ন সময় ব্যবসায়ী ও নদী রক্ষা কমিটি দাবি জানিয়ে আসছে। ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রকল্পের পুনঃ উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (আরডিপিপি) নিয়ে কাল রবিবার নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মেজবাহ উদ্দিনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম বন্দর ভবনে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক জানান, আরডিপিপির প্রস্তাবের ব্যাপারে বৈঠকে সিদ্ধান্ত হওয়ার পর তা কার্যকর হতে একনেকে অনুমোদন হতে হবে। আরডিপিপি অনুযায়ী ৫২ লাখ ঘনমিটার মাটি-বালি উত্তোলন করতে হবে। এক্ষেত্রে নদীতে পলিথিন-কাপড়ের স্তরের জায়গায় পাঁচ-ছয় মিটার পর্যন্ত গভীরে খনন করতে হবে। অন্যান্য স্থানে চার মিটার পর্যন্ত গভীরতা রাখতে হবে। পলিথিন কাপড়ের স্তর ভেঙে উত্তোলনের জন্য বিশেষ ধরনের ড্রেজার আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।