দশ দিগন্তে g আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
বহুল আলোচিত বরগুনা হত্যা মালার রায় দেওয়া হয়েছে। বরগুনার জেলা ও দায়রা জজ এই মামলার রায়ে ১০ আসামির মধ্যে ছয় জনকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছেন। চার জন খালাস পেয়েছেন। আসামির সংখ্যা ছিল ২৪। তাদের মধ্যে ১৪ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক বিধায় শিশু আদালতে তাদের বিচার হচ্ছে। এই রায়ের বৈশিষ্ট্য হলো, এই হত্যা মামলায় নিহত রিফাত শরীফের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে প্রথমে মামলার প্রধান সাক্ষী করা হয়েছিল। পরে মিন্নিকেও আসামি করা হয়। বিজ্ঞ জজ মিন্নিকেও ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন।
এই হত্যা মামলায় যে ছয় জনকে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়েছে, তাদের প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা জরিমানাও করা হয়েছে। আদালতের রায়ের প্রতি আমরা প্রত্যেকেই শ্রদ্ধাশীল। তবে বিচারকেরাও মানুষ, তাদেরও ভুলত্রুটি হতে পারে। সে জন্যই অনেক সময় দেখা যায় নিম্ন আদালত যে ব্যক্তিকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন, হাইকোর্টে আপিল মামলায় সেই ব্যক্তিই বেকসুর খালাস হয়েছেন। বরগুনা হত্যা মামলার রায়েও তাই ভুলত্রুটি থাকতে পারে। বিশেষ করে আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে ফাঁসির আদেশ দেওয়া কতটা সমীচীন হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মিডিয়ায় আলোচনা চলছে।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর এই মামলার রায় শোনার পর তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেছেন, ‘তিনি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তবে এই রায়ে মিন্নির প্রতি অবিচার করা হয়েছে। তিনি এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করবেন। একটি কুচক্রী মহল তার মেয়ে মিন্নিকে ফাঁসিয়ে দিয়েছে। তাই তার মেয়ে ন্যায়বিচার পায়নি।’ আমি মোজাম্মেল হোসেন কিশোরের সঙ্গে সহমত পোষণ করি। এই মামলায় মিন্নি ন্যায়বিচার পাননি। সেজন্য বিচারক দায়ী নন। একটি শক্তিশালী মহল ঘটনার শুরু থেকেই তাদের পালিত ষড়যন্ত্রের নেপথ্য নায়কদের বাঁচানোর জন্য অত্যন্ত সক্রিয় ছিল। তাদের এই কাজে স্থানীয় পুলিশেরও যোগসাজশ ছিল। তারাই সাক্ষী-প্রমাণ জোগাড় করে মিন্নিকে ফাঁসিয়েছে। এজন্যই রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে’।
এই রায়ের পূর্ণ বিবরণ আমি এখনো পড়িনি। শুনেছি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার জন্য মাত্র সাত দিন সময় দেওয়া হয়েছে। দণ্ডিত অন্য আসামিদের সম্পর্কে আমি কিছু বলছি না। কিন্তু মিন্নিকে উচ্চ আদালতে আপিল করার জন্য মাত্র সাত দিন সময় দেওয়ায় মনে নানা সন্দেহ জন্মায়। বরগুনা একটি প্রান্তিক জেলা। রাজধানী ঢাকা সেখান থেকে বহু দূরে। এই অবস্থায় হাইকোর্টে এসে আপিল রুজু করা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এজন্য আপিল করার সময়সীমা এত কম করার ব্যাপারেও প্রশ্ন উঠেছে।
বরগুনার চাঞ্চল্যকর হত্যাকণ্ডের কথা সবার জানা। ঘটনাটি ১৫ মাস আগের। এই হত্যাকাণ্ডের পর নিহতের স্ত্রী মিন্নি পুলিশের দ্বারা নানাভাবে হেনস্তা হচ্ছিলেন। তাকে গ্রেফতার করার পর প্রভাবশালী মহলের চাপে তাকে জামিনদানেও গড়িমসি করা হচ্ছিল। আমি তার প্রতিবাদ জানিয়ে এই ইত্তেফাকেই একটি কলাম লিখেছিলাম। হাইকোর্ট তাকে জামিন দেয়। এতদিন তিনি জামিনে বাবার সঙ্গেই ছিলেন।
প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, ‘গত বছরের ২৬ জুন সকালে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে কলেজের ছাত্র রিফাত শরীফকে একদল দুর্বৃত্ত প্রকাশ্যে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। রিফাতের সঙ্গে সে সময় তার স্ত্রী মিন্নিও ছিলেন। এই ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হলে সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। সেই ভিডিওতে দেখা যায়, স্বামীকে বাঁচাতে মিন্নি প্রাণপণ চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। ঐ দিন বিকালে বরিশাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় রিফাত শরীফ মারা যান। রাতে শরীফের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ ১২ জনকে আসামি করে একটি মামলা করেন।’
খবরে আরও বলা হয়, এ মামলায় প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকেও প্রধান সাক্ষী করা হয়। মিন্নিও বরগুনা কলেজের ডিগ্রি প্রথম বর্ষের ছাত্রী। তার পরই হঠাত্ শুরু হয় মিন্নির বিরুদ্ধে থানার পুলিশের তত্পরতা এবং তাকে জেরা করার নামে ডেকে নিয়ে হেনস্তা করা। রিফাতের বাবা দুলাল শরীফ প্রথমে পুত্রবধূকে মামলায় প্রধান সাক্ষী করেন। অকস্মাত্ মত পালটে তাকে স্বামী হত্যার ঘটনায় সম্পৃক্ত থাকার দায়ে আসামি করেন। রহস্যের ব্যাপার, তার জামিনের আবেদন করার জন্য স্থানীয় আইনজীবীদের অধিকাংশই অসমর্থ হন। এজন্য ঢাকা থেকে আইনজীবী নিতে হয়েছিল এবং হাইকোর্ট পর্যন্ত দৌড়াতে হয়েছিল।
বরগুনা হত্যা একটি পৈশাচিক ঘটনা। এ ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের, এমনকি মিন্নিও দায়ী হয়ে থাকলে তারও আইনসম্মত শাস্তি হওয়া উচিত। কিন্তু এই হত্যা মামলার রায়ে জেলা ও দায়রা জজ বলেছেন, ‘এই মামলার প্রধান সাক্ষী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি ঘটনার শিকার রিফাত শরীফকে বাঁচানোর চেষ্টা করলেও হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার বিষয়টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।’ আমি বিজ্ঞ জজ সাহেবের রায় সম্পর্কে কোনো অশ্রদ্ধা না দেখিয়ে এই রায়ে বর্ণিত একটি মন্তব্য সম্পর্কে প্রশ্ন রাখতে চাই, যদি আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি স্বামীকে বাঁচানোর প্রাণপণ চেষ্টাই করে থাকেন, তাহলে ঘটনার পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত থাকার দায়ে তাকে চূড়ান্ত শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া সমীচীন হয়েছে কি? তার তো একটু কম শাস্তি (দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড) হওয়া উচিত ছিল।
মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী যে ৭১-এর নির্মম ঘাতক ও দালাল ছিলেন, জনমনে তার দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে। তিনি হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তা প্রমাণ হওয়া সত্ত্বেও স্বয়ং হত্যা, ধর্ষণ ঘটিয়েছিলেন কি না, তার প্রমাণের অভাবে পরিকল্পনায় যুক্ত থাকার দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন। আর বরগুনা হত্যাকাণ্ডের মামলায় স্বয়ং বিচারক তার রায়ে স্বীকার করছেন, ঘটনার সময় মিন্নি তার স্বামীকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। তার পরও হত্যার পরিকল্পনার সঙ্গে মিন্নিকে যুক্ত থাকার দায়ে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এখানেই হত্যা মামলার প্রদত্ত রায়ের অসংগতি।
মিন্নির যে রিফাত হত্যার পরিকল্পনার সঙ্গে সম্পৃক্ততা ছিল তার প্রমাণ কী? রায়ে বলা হয়েছে, হত্যাকারীদের সঙ্গে যে মিন্নির পূর্ব যোগাযোগ ছিল, তার প্রমাণ পাওয়া গেছে। মিন্নির বিরুদ্ধে তার শ্বশুরপক্ষের আরেকটি অভিযোগ, এই হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি সাব্বির আহমেদ নয়ন ওরফে নয়ন বন্ডকে মিন্নি বিয়ে করেছিলেন। এই বিয়ের কথা গোপন রেখেই মিন্নি রিফাত শরীফকে বিয়ে করেন। এখানে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা, রিফাত হত্যার পরপরই প্রধান আসামি নয়ন বন্ড পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে মারা যান বলা হয়।
প্রথম কথা, বরগুনায় একটা ওপেন সিক্রেট এবং বহু মানুষের অভিযোগ যে স্থানীয় এমপিপুত্রের নেতৃত্বে বরগুনায় একটি ভীতিপ্রদ মাস্তান বাহিনী গড়ে উঠেছিল। এই এমপিপুত্রের ডান হাত ছিলেন সাব্বির আহমেদ নয়ন। তিনি নিজেকে হলিউডি চলচ্চিত্রের জেমস বন্ডের নামের অনুকরণে নয়ন বন্ড বলে পরিচয় দিতেন। বরগুনায় এরা বিভীষিকার রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল।
রিফাতও এই দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নয়ন বন্ডের সঙ্গে তার বন্ধুত্বও ছিল। এই বন্ধুত্ব পরে ভেঙে যায়। এই ঝগড়া ড্রাগস বিক্রির মুনাফার ভাগ নাকি মিন্নিকে নিয়ে, তা আমি জানি না। তবে মিন্নি আগে নয়ন বন্ডকে বিয়ে করে থাকলে (মিন্নি যা অস্বীকার করেছেন) রিফাত জেনেশুনে তাকে বিয়ে করতেন কি? আর যেহেতু হত্যকারীরা নিহত রিফাতের পূর্ব বন্ধু, সেহেতু তাদের সঙ্গে রিফাতের স্ত্রী মিন্নির মেলামেশা থাকতেই পারে।
এখানে একটি প্রশ্ন আমার মনেও জেগেছে। বরগুনার কয়েক বিশিষ্ট ব্যক্তির কাছ থেকেও এই অভিযোগ পেয়েছি। রিফাত হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী ও নায়ক (প্রধান আসামি) নয়ন বন্ড পুলিশের সঙ্গে ক্রসফায়ারে মারা গেছেন বলা হয়। রিফাত হত্যা সংঘটিত হওয়ার পরপরই এই কথিত ক্রসফায়ারিংয়ে মৃত্যুটি ঘটে। সবারই অভিযোগ, স্থানীয় এমপিপুত্রের এই মাস্তান বাহিনীর সঙ্গে স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তাদেরও যোগসাজশ রয়েছে। রিফাত হত্যার পর পুলিশ মিন্নিকে ডেকে নিয়ে একটি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গ্রহণ করে। মিন্নি বলেছেন, পুলিশ এটি জোর-জবরদস্তি করে আদায় করেছিল। অভিযোগটি যদি সত্য হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবে এই প্রশ্নও ওঠে, রিফাত হত্যা মামলার আসল ও প্রধান আসামি নয়ন বন্ডকে ক্রসফায়ারিংয়ে মৃত ঘোষণা করে আসলে তাকে হত্যার দ্বারা ঘটনার সব সাক্ষ্য-প্রমাণ, আলামত গায়েব করার চেষ্টা হয়েছে কিনা? স্থানীয় যে এমপিপুত্রের মাস্তান বাহিনীর অত্যাচারে বরগুনার মানুষ পীড়িত, তাকে ও তার দলবলকে রক্ষার জন্য মিন্নিকে এখানে স্কেপ গোট করা হয়েছে কি না, সে প্রশ্নও এখানে বিচার্য!
রিফাত হত্যায় মিন্নি যদি দায়ী হয়ে থাকে, তাহলে তার শাস্তি হোক, তাতে কারো আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু মিন্নি যেন কোনো প্রভাবশালী মহলের চক্রান্তের শিকার না হয়, সেটা দেখার দায়িত্ব বিচারকদের। তারা তো জানেন, ব্রিটিশ আইনে বলা হয়, ‘বিচারে ১০০ জন অপরাধী নিষ্কৃতি পেলেও ক্ষতি নেই, কিন্তু এক জনও নিরপরাধী যেন বিচারকের ভুলে শাস্তি না পায়।’ মিন্নির ব্যাপারে এ কথা শতভাগ প্রযোজ্য।
মিন্নি অল্প বয়সের তরুণী। মাত্র কলেজের ডিগ্রি প্রথম বর্ষের ছাত্রী। সদ্য বিবাহিত জীবনের স্বাদ লাভ করেছিলেন। এমন একটি জীবন প্রথম বয়সের কোনো ভুলভ্রান্তির দরুন চরম দণ্ড পেলে দুঃখিত হব। তার পিতা যেন অবিলম্বে হাইকোর্টে এই দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপিল করেন। আমার বিশ্বাস, উচ্চ আদালতে মিন্নি ন্যায়বিচার পাবেন এবং অকালে তার জীবনাবসান হবে না।
[ লন্ডন, ৩ অক্টোবর, শনিবার, ২০২০ ]