সৈয়দ ফারুক হোসেন
একটি দেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং প্রাকৃতিক অবস্থা সে দেশের জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। বিভিন্ন দিক থেকে জলবায়ুু পরিবর্তনে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে এবং এর জন্য আমরাই দায়ী। জলবায়ুু পরিবর্তন সংক্রান্ত ঝুঁকিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো দাবদাহ, অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও উপকূলীয় এলাকায় বন্যা, যা এরই মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে? কোনো জায়গার গড় জলবায়ুর দীর্ঘমেয়াদি ও অর্থপূর্ণ পরিবর্তন যার ব্যাপ্তি কয়েক যুগ থেকে কয়েক লাখ বছর পর্যন্ত হতে পারে তাকে জলবায়ু পরিবর্তন বলা হয়। জলবায়ুু পরিবর্তন বিভিন্ন নিয়ামকের ওপর নির্ভরশীল, যেমন—জৈব প্রক্রিয়াসমূহ, পৃথিবী কর্তৃক গৃহীত সৌর বিকিরণের পরিবর্তন, ভূ-ত্বক গঠনের স্তর, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুত্পাত ইত্যাদি। তবে বর্তমান কালে সামাজিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে জলবায়ু পরিবর্তন বললে সারা পৃথিবীর ইদানীং সময়ের মানবিক কাজকর্মের কারণে জলবায়ু পরিবর্তন বোঝায় যা ভূমনডলীয় উষ্ণতা বৃদ্ধি বেশি পরিচিত। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে পৃথিবী। সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, পার্বত্য এলাকায় অতিবৃষ্টি, বজ পাতসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের মূল কারণ জলবায়ু পরিবর্তন। মানুষের নানা কাজকর্মের পরিণতিতে অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন দ্রুত হারে সাগর-পৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে এবং বরফ গলছে। বিজ্ঞানীদের মতে, ২১০০ সাল নাগাদ সাগর-পৃষ্ঠের উচ্চতা ১.১ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। সেই সঙ্গে জীবজন্তুর বিভিন্ন প্রজাতি তাদের আবাসস্থল বদলাচ্ছে। পৃথিবী এখন মহাসংকটে। বিভিন্ন দিক থেকে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে এবং এর জন্য আমরাই দায়ী। খুব সংক্ষেপে বলতে গেলে—সাগর-পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়ছে, বরফ গলছে দ্রুত হারে এবং এর প্রভাব পড়ছে পুরো বিশ্বের প্রাণিজগতের ওপর। বিজ্ঞানীরা বলছেন, বরফের আচ্ছাদন বিলীন হওয়ার কারণে কার্বন নিঃসারণের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। যার ফলে, পরিস্থিতি দিনকে দিন বিপজ্জনক হয়ে পড়ছে। বিজ্ঞানীদের এখন কোনো সন্দেহ নেই যে সাগর-মহাসাগরে উষ্ণতা ১৯৭০ সাল থেকে অব্যাহতভাবে বাড়ছে। মানুষের নানা কর্মকাণ্ডের ফলে পরিবেশে যে বাড়তি তাপ তৈরি হচ্ছে, তার ৯০ শতাংশই শুষে নিচ্ছে সাগর। ১৯৯৩ সাল থেকে শুষে নেওয়ার এই মাত্রা দ্বিগুণ হয়েছে। সেই সঙ্গে গলছে গ্রিনল্যান্ড এবং অ্যান্টার্কটিকার বরফ। বাড়ছে সাগর পৃষ্ঠের উচ্চতা। ২০০৭ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত যে হারে অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলেছে তার আগের ১০ বছরের তুলনায় তিন গুণ। অ্যান্ডিজ, মধ্য ইউরোপ এবং উত্তর এশিয়ায় যেসব হিমবাহ রয়েছে, সেগুলোর বরফ ২০২১ সাল নাগাদ ৮০ শতাংশ গলে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলশ্রুতিতে পৃথিবীর জলবায়ু বিবর্তনের ফলে পৃথিবী এক মারাত্মক হুমকির মুখে পতিত হচ্ছে। এর প্রভাবে পৃথিবীর মানুষ নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হচ্ছে। ফলে অসংখ্য প্রাণহানি ঘটছে এবং ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। প্রতিটি সংকটে শিশুরা এবং বয়স্করা সবচেয়ে বেশি অসহায়। আজকের শিশুরা আগামী দিনের ভবিষ্যত্ তাই আমরা যদি আমাদের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারি তাহলে এই আগামী দিনের ভবিষ্যত্রা মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে।
আমাদের দেশে ছয়টি ঋতু। ১৬ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর অন্যতম। জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়াও নদী বিধৌত ব-দ্বীপ বাংলাদেশ আরো প্রাকৃতিক সংকটের মুখোমুখি হয়। তবে উষ্ণায়নের ফলে হিমালয়ের হিমবাহ গলতে থাকায় সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং প্রাণঘাতী দুর্যোগ ঝুঁকি আরো বাড়ছে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, জলোচ্ছ্বাস, টর্নেডো, ভূমিকম্প, নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা ও পানি বৃদ্ধি এবং মাটির লবণাক্ততাকে প্রধান প্রাকৃতিক বিপদ হিসেবে চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ সরকার। অনেক সময় বন্যার কারণে নদীভাঙন হয়। আবার নদী ভেঙেও লোকালয় পাবিত হয়। এর ফলশ্রুতিতে প্রাণহানি, জমি ও সম্পদ বিনষ্ট এবং বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। ষড়ঋতুর এই দেশে গ্রীষ্ম-বর্ষা-শরত্-হেমন্তর পরে শীত আর সব শেষে বসন্ত। যখন শীত আসে তখন ঢাকা শহরে শীতের কোনো প্রকট দেখা যায় না। তাহলে কি ঋতুচক্রের ওলটপালট ঘটে যাচ্ছে। অসময়েও গরম হয়ে উঠছে পৃথিবী। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের খপ্পরে পড়েছি আমরাও। গ্রীষ্ম কাল তো এমন ছিল না? বর্ষারও রূপ বদলে গেছে। শরত্, হেমন্ত, বসন্ত সব ঋতুই চরিত্র পালটে ফেলেছে। ষড়ঋতুর দেশে ঋতুর ধরনটাই বদলে গেছে। প্রকৃতি কেন এমন আচরণ করছে। আবহাওয়া বদলে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনে পরিবেশ ভারসাম্য হারাচ্ছে। যার নেতিবাচক প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহভাবে হাজির হয়েছে বাংলাদেশের সামনে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যতই চরম রূপ লাভ করছে এবং দৃশ্যমান হচ্ছে ততই তার বিরূপ প্রভাবে পানি ও বাতাসবাহিত রোগ-ব্যাধি, অপুষ্টি, দুর্যোগকালীন মৃত্যু ও আঘাতের হার বাড়ছে। গড় তাপমাত্রা ক্রমেই বাড়তে থাকায় ঋতুর আচরণ বদলে গেছে, এতে গোটা দক্ষিণ এশিয়ার কৃষির ওপর ইতিমধ্যে প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বাংলাদেশের নিচু ও উপকূলীয় এলাকা বেশি বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। বিশ্ব ব্যাংকের গবেষণা বলছে, আগামী দিনে এ ধরনের দুর্যোগ আরো শক্তি নিয়ে আসবে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য আমাদের আগে থেকেই প্রস্তুত থাকতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে। কেন জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে পড়ল বাংলাদেশ। এটা এখন সবচেয়ে বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িqছে বাংলাদেশের মানুষের জন্য। পৌষ মাসের প্রায় এক পক্ষকাল অতিক্রান্ত হয়ে যায়, কিন্তু শীতের দেখা মিলে না। বোঝা যায় না শীতের আমেজ। অথচ বাংলাদেশের ঋতু অনুযায়ী পৌষ এবং মাঘ মাসই হচ্ছে শীতকাল। শীতের প্রকৃতি অনুযায়ী যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশে প্রচলিত রয়েছে বহু রকম প্রবচন। কোন মাসে কী ধরনের শীত অনুভূত হয় তার বর্ণনা রয়েছে এসব প্রবচনে। এসব প্রবচনের মধ্যেই নিহিত শীতের আগমন ও বিদায়ের বার্তা। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, ‘আশ্বিনে শীত ধাইর-পীড়া বায়, কার্তিকে শীত ঘরে যায়, আগনে শীত শরীর বায়, পৌষ মাইয়া জারে মইষের সিং লড়ে, মাঘ মাইয়া জারে বাঘে ডাক ছাড়ে, চৈইত মাইয়া জারে ব্রাহ্মণ কাঁথার জন্য গাই বিক্রি করে’। এটিই হচ্ছে শীতসম্পর্কিত বাংলাদেশে প্রচলিত এবং লাগসই একটি প্রবচন। এই প্রবচনসমূহের প্রেক্ষাপট হচ্ছে ভাদ্র মাস এলেই বাঙালি গৃহিণীরা শীতের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। মাঘ মাসে যদি গরম লাগে কিংবা ফ্যান চালিয়ে ঘুমাতে হয় তাহলে তা ভাবনার কথাই বটে। আর একে রহস্যময় ঋতু পরিবর্তন বলতেই পারি কারণ ‘মাঘের শীতে বাঘ কাঁপে’ বলে প্রবাদটা আমরা নানি-দাদির মুখেই শুনেছি।
পরিবেশ সচেতন হওয়ার সময় এখনই। আমাদের জনগণ আমাদের পরিবেশ রক্ষায় উদ্যোগ নিতে হবে। কেবল সরকারের পক্ষেই পরিবেশ রক্ষা সম্ভব নয়; জনগণকেও এ বিষয়ে সচেতন হয়ে পরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা রাখতে হবে। এমনিতেই জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশে নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস, দীর্ঘমেয়াদি বন্যা, জলাবদ্ধতা, খরা, অতিরিক্ত লবণাক্ততা এসব সমস্যা এখন প্রকট। এসব সমস্যার কারণে প্রতি বছর দেশের লাখ লাখ মানুষ উদ্বাস্তুতে পরিণত হচ্ছে। এ অবস্থায় জলবায়ু পরিবর্তনে সময়োপযোগী দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে পরিবেশ ও মানুষের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মহামারি চলতে থাকবে।
n লেখক :ডেপুটি রেজিস্টার, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা