আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সরকারের পাশাপাশি সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগ করোনা দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। একমাত্র আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ছিল বলেই মানুষ এই সহযোগিতা পেয়েছে। এখানে অন্য কেউ থাকলে কত যে মানুষ মারা যেত, মানুষের কত যে দুরবস্থা, আর কত যে মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হতো—তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জনগণের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে আওয়ামী লীগের প্রায় ৫২২ জন নেতাকর্মী করোনায় মৃত্যুবরণ করেছেন। এই যে এত বড় সেক্রিফাইস আর কোনো দল তো বোধহয় করেনি। অন্যরা শুধু লিপ সার্ভিস দিয়েছে। গতকাল শনিবার সকালে গণভবনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে সূচনা বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীর সূচনা বক্তব্যের পর তার সভাপতিত্বে নেতৃবৃন্দের রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠক সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম আরো গতিশীল করার লক্ষ্যে দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্যদের সমন্বয়ে আট বিভাগের জন্য আটটি কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক কমিটি গঠন করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণসহ দেশ জুড়ে শাখাগুলো থেকে জমা পড়া পূর্ণাঙ্গ কমিটিগুলো যাচাই-বাছাইয়ের কাজ করবে এসব কমিটি। প্রত্যেক বিভাগীয় কমিটিতে কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়াম সদস্য রাখা হয়েছে। বিভাগীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করবেন।
এ সময় তৃণমূলে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে ‘মাই ম্যান’ নেতাদের জায়গা দেওয়া যাবে না বলে কঠোর নির্দেশনা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তৃণমূলে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে দলের দুর্দিন-দুঃসময়ের ত্যাগী, পরীক্ষিত ও নিবেদিত নেতাকর্মীদের ঠাঁই দিতে হবে। কোনো নেতা বা এমপিদের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে কমিটি গঠন করা যাবে না। কোনো অবস্থাতেই দলের অভ্যন্তরে বিতর্কিতদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া চলবে না। কোনো অপরাধী, কোনো ধরনের অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত কেউ যেন কোনো কমিটিতে প্রবেশ করতে না পারে। এসব বিষয়ে লক্ষ রাখতে আটটি বিভাগে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো কমিটি অনুমোদন দেওয়া হবে না।
সিলেটে জেলা কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি পদে শফিকুল রহমান চৌধুরীকে রাখার বিষয়ে আলোচনা হয়। কেন্দ্র থেকে আগেই বলে দেওয়া হয়েছিল তাকে সিনিয়র সহসভাপতি পদে রাখতে। কিন্তু জেলা শাখার সভাপতি তাকে সেই পদে রাখেননি। এতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সে ছাত্রলীগ করেছে, দুঃসময়ে ভূমিকা রেখেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, কমিটিগুলোতে সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক হলেই নিজেদের লোক দিয়ে মাই ম্যান (নিজস্ব বলয় সৃষ্টির জন্য) কমিটি গঠন করা যাবে না, কাউন্সিলে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে যারা প্রার্থী হয়েছিলেন তাদের মধ্যে যোগ্যতাসম্পন্ন ও পরীক্ষিত নেতাদের কমিটিতে রাখতে হবে।
কোনো অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না বলে সবাইকে সতর্ক করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষ সুশাসন চায়। কেউ অন্যায় করলে ছাড় পাবে না। শেখ হাসিনা বলেন, যেসব জেলায় সাংগঠনিক সমস্যা রয়েছে, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব রয়েছে, সেই সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করে ফেলতে হবে। আগামীতে যেসব স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সেই নির্বাচনের জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি।
দীর্ঘ সাত মাস পর অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের এ বৈঠক করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে সীমিত পরিসরে অনুষ্ঠিত হয়। সভায় আওয়ামী লীগের ৮১ সদস্যবিশিষ্ট কার্যনির্বাহী সংসদের সবাইকে ডাকা হয়নি। স্বাস্থ্যবিধি রক্ষার সুবিধার্থে ৩৩ জনকে সভায় উপস্থিত থাকার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।
বৈঠকে আটটি বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক নেতারা তাদের বক্তব্য তুলে ধরেন। তারা কোন জেলা কমিটিতে সিনিয়র-জুনিয়র জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করা হয়েছে, কারা কারা নিজেদের লোকদের জায়গা দিয়ে ত্যাগী পরীক্ষিত নেতাদের বাদ দিয়েছে সে বিষয়গুলো উপস্থাপন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, সাংগঠনিক কাজ করতে গিয়ে কে কোথায় কী সমস্যা ফেস করছে, সেটা আমাকে অবহিত করবে। তোমরা কাজ করতে গিয়ে কমিটি করতে গিয়ে কোথাও কী সমস্যা হচ্ছে তা আমাকে জানাবে। দলে সেক্রেটারি আছে তাকে জানাবে।
সূচনা বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সরকার করোনা ভাইরাস মোকাবিলার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখার জন্য প্রাণপণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। করোনার কারণে বিশ্বঅর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়লেও বাংলাদেশে অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে তার সরকার সময়োচিত পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ৫ লাখ কোটি টাকার ওপরে বাজেট দিয়েছি, যেটা একটা কঠিন কাজ ছিল। করোনা মোকাবিলায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী।
ঢাকা জেলায় দুর্বল সংগঠন
সূত্র জানায়, বৈঠকে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম বলেন, ঢাকা জেলায় সংগঠন দুর্বল। ঢাকা জেলাকে ঢেলে সাজানোর পরামর্শ দেন তিনি। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য সাঈদ খোকন বলেন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে কয়েক জনকে রাখা হয়েছে যারা মহানগরের বাসিন্দা না। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ঢাকা মহানগরের থানা শাখার নেতাদের ডাকা হলেও আসেন না।