মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য আগামী ৪৮ ঘন্টা খুবই ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বলে মার্কিন গণমাধ্যমকে জানিয়েছে হোয়াইট হাউসের বিভিন্ন সূত্র। তারা বলেছেন, চিকিত্সকরা যতই বিষয়টিকে হাল্কা করে দেখছেন কিংবা কথা বলছেন বিষয়টি ততটা সরল নয়। গত ২৪ ঘন্টা আসলেই ট্রাম্প ভালো ছিলেন না। আর পরবর্তী দুই দিন আসলেই ‘ক্রিটিক্যাল’ হতে যাচ্ছে। তিনি কখন বা কিভাবে পুরোপুরি সুস্থ হবেন সে ব্যাপারে এখনো কোনো পরিস্কার ধারণা আমরা পাচ্ছি না। আর এতদিন প্রেসিডেন্ট যথেষ্ঠ মনোবল দেখালেও এখন তার চোখেমুখে যথেষ্ট উদ্বেগের ছাপ চলে এসেছে। আর বেশ কিছুক্ষণের জন্য তার শ্বাসকষ্টও হয়েছিল, যে জন্য তাকে অক্সিজেনও দিতে হয়েছিল। তবে এখন তিনি অক্সিজেন সাপোর্টে নেই। গতকাল হাসপাতাল থেকে ট্রাম্প টুইট করেন। সেখানে তিনি লেখেন, ‘আমাদের মহান আমেরিকার এখন প্রয়োজন উদ্দীপনা। আসুন সবাই একসাথে কাজ করে সেটি অর্জন করি।’ এই টুইট নিয়েও শুরু হয়েছে নানারকম জল্পনা কল্পনা।
তবে এর আগে শনিবার ট্রাম্পের চিকিত্সকরা আশার কথাই শুনিয়েছিলেন। তার প্রধান চিকিত্সক ডা. সিন কনলি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পুরোপুরি সুস্থ এবং ভালো মানসিক অবস্থায় আছেন। তিনি মনের জোর হারাননি। আশা করা যায় দ্রুতই সুস্থ হয়ে উঠবেন।’ ডাক্তাররা যখন সংবাদ সম্মেলন করছিলেন তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ মার্ক মিডোস। সাংবাদিকরা ডা. কনলির কাছে ট্রাম্পের হার্ট রেট, ব্লাড প্রেসার এবং শরীরের তাপমাত্রা সম্পর্কে জানতে চান। তিনি জানান, সবই ঠিকঠাক আছে। আমি চিন্তার কিছু দেখছি না। আর শুক্রবার সকাল পর্যন্ত জ্বর ছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন। তারপর তাপমাত্রা স্বাভাবিক হয়ে যায়।
ডাক্তারের সংবাদ সম্মেলনে দেয়া বক্তব্য এবং হোয়াইট হাউসের নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে দুই রকমের তথ্য আসায় একপ্রকার ‘ধোয়াশা’ তৈরী হয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলে। কোনো কোনো গণমাধ্যমের মতে, ডা. হয়তো সবার মনোবল চাঙ্গা রাখার জন্য ‘সব ঠিকঠাক’ আছে বলছেন। কিন্তু প্রকৃত অবস্থা জানতে গেলে আরেকটু সময় অপেক্ষা করতে হবে।
এর আগে স্থানীয় সময় শুক্রবার সন্ধ্যায় ট্রাম্পকে ওয়াল্টার রিড ন্যাশনাল মিলিটারি মেডিক্যাল সেন্টারে নেওয়া হয়। হোয়াইট হাউজের কর্মকর্তারা বলেন, পূর্ব সতর্কতা হিসেবেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তার শরীরে ‘মৃদু উপসর্গ’ ছিল। মৃদু জ্বর ও ঠান্ডার মতো ছিল। ওষুধ দেওয়ার পর তিনি ‘ক্লান্ত কিন্তু ভালো মেজাজে’ ছিলেন। ব্যাপক সতর্কতার জন্য এবং ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আগামী কয়েক দিন ওয়াল্টার রিডের প্রেসিডেন্সিয়াল অফিস থেকে কাজ করবেন। খবর সিএনএন, বিবিসি ও আলজাজিরার।
এদিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মেলানিয়া ট্রাম্প আক্রান্ত হওয়ার পর করোনার প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে হোয়াইট হাউজে। শনিবার সকালে করোনা সংক্রমণ ধরা পড়ে হোয়াইট হাউজের সদ্য সাবেক উপদেষ্টা কেলিয়ানে কনওয়ে এবং প্রেসিডেন্টের প্রচারণা ম্যানেজার বিল স্টেপিয়েনের শরীরে। গত সপ্তাহে ট্রাম্প সুপ্রিম কোর্টের মনোনয়ন ঘোষণা করেন। হোয়াইট হাউজের ঐ অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া দুই সিনেটরের করোনা ধরা পড়েছে। এছাড়া ঐ অনুষ্ঠানে না থাকা আরেক জন মার্কিন সিনেটর করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তবে মেয়ে ইভাঙ্কা ট্রাম্প, জামাতা জ্যারেড কুশনার, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওসহ অনেকের পরীক্ষায় ফল নেগেটিভ এসেছে। গত কয়েক দিনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডির সংস্পর্শে এসেছিলেন এমন ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। হঠাত্ করে প্রেসিডেন্টসহ শীর্ষ কর্মকর্তা ও রাজনীতিকরা করোনায় আক্রান্ত হওয়ায় সংকটে পড়েছে মার্কিন প্রশাসন।
বৃহস্পতিবার প্রথম করোনা শনাক্ত হয় ট্রাম্পের উপদেষ্টা হোপ হিকসের শরীরে। এরপরই ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের শরীরে করোনার সংক্রমণ ধরা পড়ে। ট্রাম্পের শরীরে কিছু ‘মৃদু উপসর্গ’ দেখা দিলে প্রেসিডেন্টের হেলিকপ্টার মেরিন ওয়ানে করে হোয়াইট হাউজ প্রাঙ্গণ থেকে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হেলিকপ্টারে ওঠার সময় সাংবাদিকদের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ালেও কোনো কথা বলেননি ট্রাম্প। তিনি নিজেই হেলিকপ্টার থেকে হেঁটে নামেন। মার্কিন স্বাস্থ্য বিভাগ সিডিসির তথ্য অনুযায়ী ৭৪ বছর বয়সি ডোনাল্ড ট্রাম্পের শারীরিক অবস্থা জটিল হওয়ার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে। সূত্রের বরাত দিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, ঠান্ডার মতো লক্ষণ ছিল ট্রাম্পের। তবে ট্রাম্প নিজেই টুইট করে ইতিবাচক তথ্য দিয়েছেন। টুইটারে ১৮ সেকেন্ডের ভিডিও পোস্টে ট্রাম্প বলেন, আমি মনে করি—আমি ভালো আছি। তাকে পরীক্ষামূলক ‘ড্রাগ ককটেল ইঞ্জেকশন’ ও এন্টিভাইরাল ওষুধ রেমডিসিভির দেওয়া হয়েছে। এছাড়া তিনি জিঙ্ক, ভিটামিন ডি, ফ্যামোটিডাইন, মেলাটোনিন এবং অ্যাসপিরিন ওষুধও সেবন করছেন।
এদিকে ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প হোয়াইট হাউজেই আছেন। ট্রাম্পের ব্যক্তিগত চিকিত্সক জানিয়েছেন, তার মৃদু কাঁশি এবং মাথা ব্যথা আছে। তবে তার শারীরিক অবস্থা ভালো। আশা করা হচ্ছে, তিনি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ও তার স্ত্রী হিলারি, আসন্ন নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন ও তার রানিং মেট কমলা হ্যারিসসহ অনেকে। তার সুস্থতা কামনা করেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনও।
ট্রাম্প অসুস্থ হওয়ায় প্রশাসন সংকটের মুখে পড়তে পারে বলে অনেকেই আশঙ্কা করছেন। তবে মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট অসুস্থতার কারণে কাজ না করতে পারলে তিনি তার দায়িত্ব ভাইস-প্রেসিডেন্টের কাছে ন্যস্ত করতে পারেন। অর্থাত্ ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স সাময়িকভাবে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট হতে পারেন। তবে হোয়াইট হাউজের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখনো দায়িত্ব পালন করছেন।
অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আর মাত্র এক মাস বাকি আছে। এর মধ্যে ট্রাম্পের অসুস্থতা নতুন সংকটের তৈরি করেছে। ট্রাম্প অসুস্থ হওয়ায় নির্বাচনের আগে তার সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। কোলাহলপূর্ণ নির্বাচনি প্রচারণা থমকে গেছে। ট্রাম্পকে আক্রমণ করে দেওয়া একটি বিজ্ঞাপন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন প্রতিদ্বন্দ্বী জো বাইডেন।
‘বিপজ্জনক’ সেই
অনুষ্ঠান
ট্রাম্প করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে এখন হোয়াইট হাউজের এক সপ্তাহ আগের এক অনুষ্ঠান। সুপ্রিম কোর্টে বিচারক কনি ব্যারেটকে মনোনয়নের ঘোষণা দিয়ে গত শনিবার হোয়াইট হাউজের রোজ গার্ডেনে এই অনুষ্ঠান হয়েছিল। সেই অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া বেশ কয়েকজন আক্রান্ত হওয়ার পর এখন সমালোচনার ঝড় বইছে সেই আয়োজন নিয়ে, যাকে বিপজ্জনকও আখ্যায়িত করা হচ্ছে। কারণ সেদিন ট্রাম্পসহ উপস্থিত সিনেটর, অতিথিদের অধিকাংশের মুখেই মাস্ক ছিল না। তারা বসেছিলেনও গা ঘেঁষাঘেষি করে। প্রেসিডেন্ট ও ফার্স্টলেডির পর শুক্রবার ট্রাম্পের সাবেক উপদেষ্টা কেলিয়ান কনওয়েরও কোভিড-১৯ পজিটিভ এসেছে। ওই অনুষ্ঠানে ফার্স্টলেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের ঠিক পেছনেই বসেছিলেন কনওয়ে। অনুষ্ঠানে থাকা উটাহ’র সিনেটর মাইক লি এবং নর্থ ক্যারোলাইনার সেনেটর টম টিলিসেরও সংক্রমণ ধরা পড়েছে। সেদিন সাতজন রিপাবলিকান সিনেটর এক সারিতে বসেছিলেন। তার মধ্যে মাইক লির মুখে মাস্ক ছিল না। অনুষ্ঠান শেষে বিভিন্ন জনের সঙ্গে তার আলিঙ্গনাবদ্ধ হওয়ার ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে।