সিদ্ধান্ত লওয়াটা সহজ নহে

আমরা পূর্বেও বলিয়াছি—শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলিয়া দেওয়ার সিদ্ধান্ত সহজ নহে। বিশ্বের কোনো দেশই কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলিতে চাহে না। করোনা ভাইরাসের কারণে গত ১৭ মার্চ হইতে আমাদের দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রহিয়াছে। দফায় দফায় ছুটি বাড়াইয়া তাহা বর্তমানে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত করা হইয়াছে। করোনার বাস্তবতায় দীর্ঘদিন ধরিয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি বন্ধ থাকিবার কারণে অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে পড়িয়াছে প্রায় ৪ কোটি শিক্ষার্থীর পড়াশুনা। দীর্ঘকাল ধরিয়া শিক্ষাব্যবস্থায় এমন ভয়াবহ জটিলতা স্বাধীনতা-উত্তরকালের মধ্যে আর কখনো দেখা যায় নাই। আমরা অবশ্য দেখিতে পাইতেছি, করোনা ভাইরাস পরিস্থিতিকে বিবেচনায় লইয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না খোলা হইলেও সরকার ইতিমধ্যেই অফিস-আদালত এবং সকল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালু করিয়াছে। অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগিতেছে, জাতির ভবিষ্যেক এইভাবে অন্ধকারে আর কতদিন ডুবাইয়া রাখা হইবে?

ইহা লইয়া বিশ্বব্যাপীও কম টানাপোড়েন চলিতেছে না। প্রতিবেশী ভারতেও এখন অবধি প্রায় সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধই রহিয়াছে। বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের হারও পূর্বের তুলনায় অনেক হ্রাস পাইয়াছে বলিয়া সম্প্রতি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের রিপোর্টে বলা হইয়াছে বটে। কিন্তু আসন্ন শীতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ দেখা দিতে পারে—এই আশঙ্কা করিতেছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। এইদিকে করোনার কারণে বন্ধ থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতেও সেশনজট বাড়িতেছে। বেসরকারি স্কুল-কলেজগুলি পড়িতেছে আর্থিক সংকটে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বিকল্প ব্যবস্থা হিসাবে স্কুলপর্যায়ে টিভি ও রেডিওর মাধ্যমে ক্লাস প্রচার এবং কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন ক্লাসের উপর গুরুত্ব দেওয়া হইলেও তাহা সেই অর্থে কার্যকর হয় নাই। আসলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না খুলিবার নেপথ্যে বেশ কিছু বিষয় বিবেচনা করা হইতেছে। ইহার মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হইল—শিশুরা স্কুলে গিয়া করোনায় আক্রান্ত হইলে তাহার দায় কে লইবেন? তাহা ছাড়া, অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক রহিয়াছে পুরা মাত্রায়। কারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যবিধি কতটা মানা সম্ভব হইবে তাহা স্পষ্ট নহে। আমরা ইতিমধ্যে দেখিয়াছি বিশ্বের অনেক দেশেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলিয়া দেওয়ার পর তাহারা আবার বন্ধ করিতে বাধ্য হইয়াছে।

মুশকিল হইল দীর্ঘ প্রায় আট মাস এই অস্বাভাবিক বিরতিতে শিক্ষার্থীদের পড়াশুনা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছে তেমনি তাহারা মানসিকভাবেও ভালো নাই। সবচাইতে অধিক নেতিবাচক প্রভাব পড়িতেছে প্রাথমিক পর্যায়ের শিশুশিক্ষার্থীদের উপর। কারণ যেই বয়সটিতে শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করে, সেই সময় তাহাদের সামাজিকতা শিখিবার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্কুলে বিভিন্ন শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সহিত মিলামিশা, নানা ধরনের খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তাহাদের সমাজের সহিত পরিচিত হইতে সাহায্য করে। খোলা বাতাসে ঘরের বাহিরের আনন্দ হইতে তাহারা বঞ্চিত হইতেছে। আমরা মনে করি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলিয়া দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশ্বের সচেতন দেশসমূহের দিকে লক্ষ রাখিয়া এই কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত। অবস্থা এমন দাঁড়াইয়াছে যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলিতেও হইবে, আবার সংক্রমণ যাহাতে না হয় তাহাও দেখিতে হইবে—বিষয়টি অত্যন্ত জটিল। তবে কিছুদিন পরপর তারিখ বাড়াইলে, অর্থাত্ খোলা বা বন্ধ করা লইয়া বারবার নূতন তারিখ প্রদান করিলে শিশুদের উপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি হয়। ইহাও মনে রাখিতে হইবে।