ফকির বৃত্তান্ত

g তারেকুর রহমান

 

বিকালবেলা বাসা থেকে বের হলাম। ইয়া বড় বড় চুলওয়ালা এক লোক হাজির। চেহারাটা এক অদ্ভুত রকমের। মাজারের জন্য সাহায্য চাইল। যদিও মাজার-টাজার কিছু না। জাস্ট মানুষকে ধোঁকা দিয়ে টাকা ইনকামের ফন্দি। তার কথা না শোনার ভান করে চলে যাচ্ছিলাম। লোকটি আমার পথ আগলে ধরে বলল, ‘বাবা, মাজারের জন্য কিছু দান করো।’

আমি এবারও কিছু না বলে হাঁটতে শুরু করলাম। লোকটি পিছন থেকে আমাকে ডাকতে লাগল, ‘ও লাল কোর্তাওয়ালা (গায়ে লাল টি-শার্ট ছিল) দান করবি না? টাকা নাই? বেটা ফকির।’

তার শেষ কথাটা শুনে একটু থমকে দাঁড়ালাম। অবাক হলাম, একটু আগে যে আমাকে বাবা বলে সম্বোধন করল, সে এখন তুই বলে সম্বোধন করছে। সে আমাকে ফকির বলছে! কীভাবে বুঝল আমার কাছে টাকা নেই?

 

 

ঢাকার ফুটপাতে ৩০০ টাকার এনার্জি লাইট মাত্র ১০০ টাকার মতো এখন নতুন আরেকটি পণ্য এসেছে। সেটি হলো যেকোনো লুঙ্গি মাত্র ১৩০ টাকা। আমি সাধারণত খুব কমই লুঙ্গি কিনি। একটা কিনলে কয়েক বছর চলে যায়। লুঙ্গি যতদিনে ছিঁড়ে কৈ মাছের জালের মতো না হয় ততদিনে কিনি না। ১৩০ টাকার অফার দেখে এগিয়ে গেলাম।

—মামা, লুঙ্গি কত?

—শুনতাছেন না কত বলতেছি?

—একটু কম হবে না?

—১৩০ টাকার লুঙ্গি আবার কম কীসের?

—মামা, ৮০ টাকা রাখো।

লোকটি মনে হয় আমার এই কথার জন্য প্রস্তুত ছিল না। খুব বিরক্তি নিয়ে বলল, ‘শুনেন এই দামে গামছাও পাইবেন না। আর যদি কোথাও পান হেইটা দিয়া লুঙ্গি বানাইয়া পইরেন।’

বুঝলাম সে আমার উপর বিরক্ত। কিছু না বলে চলে এলাম। আর পিছন থেকে একটা শব্দ শুনলাম, ‘বেডা ফকির, ৮০ টেকা দিয়া লুঙ্গি কিনতে আইছে!’

 

 

কয়েকজন বন্ধু মিলে হোটেলে নাস্তা করলাম। নাস্তা মানে নাস্তা না, সে এক বিশাল আয়োজন। দশ দিন খাইলে একদিন অন্তত খাওয়াতে হয়। আজ আমার পালা ছিল। সবাই মিলে বরাবর ৩০০ টাকা খেলাম। বেয়ারাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘বিল কত হইছে?’

—মামা, ২৯০ ট্যাকা।

—ভালো করে হিসেব করো, আরও বেশি হবে।

—৩০০ ট্যাকা হয় ২৯০ ট্যাকা দিলে হবে।

বেয়ারারা খুব শেয়ানা তারা কিছু টাকা কম রাখার চেষ্টা করে যেন সে টাকাটা তাকে কাস্টমার দেয়। বেয়ারা আমার প্রতি মিনিমাম ১০ টাকা আশা করছিল। আমিও তাকে হতাশ করলাম না। তার হাতে দুই টাকার একটা নোট গুঁজে দিলাম। লোকটি দুই টাকা দেখে এমন অভিব্যক্তি দেখাল, তা এখানে লিখে প্রকাশ করতে পারব না।

—মামা, এই ট্যাকা লইয়া যান।

—কেন?

—আমার ট্যাকা লাগব না।

বুঝলাম সে সন্তুষ্ট না। আমিও তাকে আর সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করলাম না। বেরিয়ে এলাম। আসার সময় বেয়ারা বিড়বিড় করে বলে উঠল, ‘বেটা ফকির, পরথম মনে অয় হোটেলে আইছে।’