দালালেরা স্বপ্ন দেখিয়েছিল নতুন এক জীবনের। তারা জানিয়েছিল, ৩ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা খরচ করলেই লিবিয়া হয়ে অনায়াসে ইউরোপে পৌঁছানো যাবে। আর তখন প্রতি মাসেই আয় করা যাবে ৫ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা। এমন আশ্বাসের প্রলোভনে পড়ে ধারদেনা ও জমি বিক্রি করে দালালদের হাতে টাকা তুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু লিবিয়ায় পৌঁছার পরই সব স্বপ্ন মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। বাংলাদেশি ও লিবিয়ান দালালেরা নিয়ে যায় বন্দিশিবিরে। সেখানে নেওয়ার পর দালালেরা প্রতিদিন নির্যাতন করত। আর নির্যাতন থেকে বাঁচতে দেশ থেকে ৫ লাখ থেকে ৭ লাখ টাকা এনে দালালদের হাতে তুলে দিতে হয়েছে।
এ তথ্য জানিয়েছেন সম্প্রতি লিবিয়া থেকে দেশে ফেরা ৯ জন বাংলাদেশি, যারা চলতি বছরের ২৮ মে লিবিয়ার মিজদা শহরে মানব পাচারকারীদের বর্বরোচিত হামলার ঘটনায় গুলিবিদ্ধ ও বোমায় আহত হয়েছিলেন। ঘটনার চার মাস গত হলেও সেদিনের ঘটনা এখনো তারা কিছুতেই ভুলতে পারছেন না। এটা তাদের কাছে দুঃস্বপ্নের মতো। আহতদের মধ্যে কয়েক জনের শরীরে রয়েছে গুলির চিহ্ন। এক জনের দুই হাতের আঙুল ও আরেক জনের পা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। দেশে ফিরলেও এখনো আতঙ্ক কাটেনি ওদের।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম) বিশেষ পুলিশ সুপার সৈয়দ জান্নাত আরা। ঐ ঘটনায় নিহত হন ৩০ জন। এর মধ্যে ২৬ জনই বাংলাদেশি। আর অন্যদের সঙ্গে আহত হন ঐ ৯ জনসহ ১২ জন বাংলাদেশি। এরা হলেন—ফিরোজ ব্যাপারী, জানু মিয়া, ওমর শেখ, সজল মিয়া, তারিকুল ইসলাম, বকুল হোসেন, মোহাম্মদ আলী, সোহাগ আহমেদ ও সাইদুল ইসলাম। আর যাদের আনা সম্ভব হয়নি, তারা হলেন বাপ্পী দত্ত, সম্রাট খালাসী ও সাজিদ। গত ৩০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ও লিবিয়ার যৌথ উদ্যোগে বোরাক এয়ারের বিশেষ ফ্লাইটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তারা অবতরণ করেন। এদের গ্রামের বাড়ি ভৈরব ও মাদারীপুরে।
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার বলেন, লিবিয়ার মিজদা শহরে মানব পাচারকারীদের চালানো নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় মোট ২৬টি মামলা হয়েছে। ৪৪ জন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে সিআইডি ১৫টি মামলার তদন্ত করছে। বর্বরোচিত ঐ ঘটনার পর আহত ভিকটিমদের দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সিআইডি। তিনি জানান, মামলার তদন্তের সময় অনেক আসামিই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। বিদেশে অবস্থানরত দালাল ও মূল আসামিদের গ্রেফতারের জন্য অচিরেই রেড নোটিশ জারি করা হবে। তিনি আরো বলেন, এ ঘটনায় অচিরেই ভিকটিমদের (৯ বাংলাদেশি) আদালতে জবানবন্দি প্রদান করার জন্য উপস্থাপন করা হবে।
সেদিন যা ঘটেছিল
বিশেষ পুলিশ সুপার সৈয়দ জান্নাত আরা বলেন, দেশে ফিরিয়ে আনা ৯ বাংলাদেশি জানিয়েছেন, তারা বিভিন্ন সময়ে উন্নত জীবনের লোভে পড়ে লিবিয়ায় পৌঁছেছেন। সেখানে পৌঁছার পরপরই তাদের মাইক্রোবাসে করে নিয়ে যাওয়া হয় ত্রিপলি থেকে ১৮০ কিলোমিটার দক্ষিণের শহর মিজদার এক মরুভূমিতে। সেখানে সিমেন্টের ছাদবিশিষ্ট গোডাউন ঘরে (ক্যাম্প) বাংলাদেশি ও আফ্রিকান মিলে দেড় শতাধিক লোকের সঙ্গে ছিলেন তারাও। প্রতিদিন সকাল ১০টার দিকে দালালেরা এসে পালাক্রমে নির্যাতন করে টাকা আদায় করত, যার পরিমাণ ৫ লাখ থেকে ৭ লাখ টাকা। ঘটনা সম্পর্কে তারা জানিয়েছেন, নির্যাতনের প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে বন্দিশিবিরে আফ্রিকান নাগরিকদের হাতে এক দালাল নিহত হয়। এর পালটা প্রতিশোধ নিতে দালালচক্র এলোপাতাড়িভাবে ক্যাম্পবাসীদের ওপর গুলি ও বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে হতাহতের ঘটনা ঘটে।