নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়ছেই

চালের দাম বাড়ছেই, পেঁয়াজের দামও কমছে না, পণ্যমূল্য আকাশছোঁয়া, পাইকারি বাজারের সঙ্গে ভোক্তামূল্যে এত ফারাক কেন? চাহিদা অনুযায়ী পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া সত্ত্বেও তার সুফল অনেক সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় পরিবহন চাঁদাবাজি ও মজুতদারির কারণে। এবারও বেড়েছে। চলতি সরকারের অধীনেই বাজার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে ছিল। এখন নেই। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এভাবে বেড়ে যাওয়ায় ক্ষুব্ধ ক্রেতারা। সারা দেশে দ্রব্যমূল্য সহনীয় রাখা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিভাগীয় এবং জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে কাজ করছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন। কিন্তু তাতেও কি দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আছে? বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আর জেলা প্রশাসনের তাবত্ হুমকিধমকিকে কি পাত্তা দিচ্ছে ব্যবসায়ীরা? চালেও চলছে চালবাজি। কোনো কোনো পণ্য লাফিয়ে বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। কাঁচামরিচ, বেগুন ও অন্যান্য সবজি সবটার দামই বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ, তিন গুণ হয়েছে। শুধু তরিতরকারি নয় ছোলা, ডাল, মাছ-মাংস সবকিছুর দামই এখন বেশ চড়া।

পণ্যের দাম বাড়তে পারে। এটা চলমান প্রক্রিয়া। ফি বছরই হয়। তবে সকালে ৬০ দুপুরে ৮০ আর রাতে ১০০ টাকা—এভাবে কি পৃথিবীর আর কোনো দেশে দাম বাড়ে? এদেশে হুটহাট পণ্যমূল্য বেড়ে, বাড়ে জনগণের নাভিশ্বাস। এটা নতুন নয় যে কোনো অজুহাত মানেই পণ্যমূল্যের দাম বেড়ে যাওয়া। দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন পাগলা ঘোড়া ছুটছে তো ছুটছেই। বর্তমানে অস্থির হয়ে উঠেছে বাজার। কোনোই সুখবর নেই। চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ, রসুন, ডিম, আলু, খেজুর, মাছ, মাংস, মসলা, কাঁচামরিচ, শাকসবজি, ফলমূলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রতিটি পণ্যের দাম বেড়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় হেন পণ্য নেই, গায়ে মূল্যবৃদ্ধির উত্তাপ নেই—তফাতটা শুধু ডিগ্রির, কোনোটার বেশি কোনোটার কম। ব্যবসায়ী-মজুতদাররা মুনাফায় পকেট ভারী করার মওকা ছাড়ে না। সুযোগমতো দুটো পয়সা কামিয়ে নিতে এরা কোমর বেঁধে প্রস্তুতি নেয়। মজুত গড়ে তোলে, দফায় দফায় মূল্য বাড়িয়ে সাধারণ ভোক্তাদের নাভিশ্বাস তুলে ছাড়ে। এসব মুনাফাখোররা এদেশের অসহায় মানুষের কথা ভাবে না। এখন নিম্ন-আয়ের মানুষ তাদের চাপিয়ে দেওয়া দাম দিয়ে খাবার কিনতে পারছে না। ওরা দুই বেলা পেট পুরে খেতে পারছে না। আসলে মানুষকে জিম্মি করে অধিক মুনাফা লাভের ব্যবসায়ীদের এই খেলা কোনো সরকারই বন্ধ করতে পারে না, এ কথা কেউ বিশ্বাস করবে না। সরকারের সত্ ইচ্ছা থাকলে এই খেলা বন্ধ করা অবশ্যই সম্ভব। কিন্তু এই সম্ভবকে অসম্ভবের হাত থেকে বাঁচাতে সরকারকে অবশ্যই হার্ডলাইনে চলতে হবে। প্রথমে চিহ্নিত করতে হবে সেসব অসাধু ব্যবসায়ীদের, যারা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে তাদের সব বিবেকহীন আয়োজন সম্পূর্ণ করেছে।

অর্থনীতিতে একটা কথা আছে, চাহিদার তুলনায় উত্পাদন যত কম হবে পণ্যের দাম বাজারে তত বেশি হবে। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সহজ কাজ নয়। সেনানিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও চারদলীয় জোট সরকার এবং বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের সময় দেখেছি, যতবার পণ্যের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে, ততবার বাজারে মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে।

দ্রব্যসামগ্রী অর্থাত্ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসমূহের মূল্য স্থিতিশীল রাখার ব্যাপারে বর্তমান পরিস্থিতিতে যা করা দরকার তা হলো—সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে তাদের নেওয়া পদক্ষেপগুলো কার্যকর করতে হবে। যে কোনো মূল্যে মধ্যস্থানীয় শ্রেণির কারসাজি বন্ধ করতে হবে। সরকারকে ব্যবসায়ীদের ওপর বাজার নিয়ন্ত্রণের নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর মূল্য সামঞ্জস্য আছে কি না নিয়মিত তা তদারক করতে হবে। দোকানদারদের কাছ থেকে চাঁদাবাজদের চাঁদাবাজি বন্ধের ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। পরিবহন খাতের চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। বাজারে যেসব পণ্যের চাহিদা বেশি, তা বেশি করে জোগান দিতে হবে। পাইকারি বাজার থেকে মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণি যাতে স্বার্থ হাসিল না করতে পারে, সেজন্য পাইকারি বাজার থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত সরকারি নিজস্ব পরিবহন ও জনবলের মাধ্যমে খুচরা বাজারে পণ্যসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে। তাতে করে চাঁদাবাজদের চাঁদাবাজিও বন্ধ হবে; বেশি করে পণ্য আমদানি করে সুষ্ঠুভাবে বণ্টন করা। আরো বেশি করে সরকারি বিক্রয় কেন্দ্র স্থাপন করে সুষ্ঠু ও স্বচ্ছভাবে বণ্টনের ব্যবস্থা করা। সর্বোপরি ব্যবসায়ীদের শপথ নেওয়া উচিত—‘আমরা পণ্যসামগ্রী মজুতের মাধ্যমে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়াব না এবং পণ্যসামগ্রীতে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন করব না।’ আগাম সতর্ক বার্তার মতো উচ্চারণ করা যায়, বাজার একবার চড়লে সেই চড়া বাজার আর নামতে চায় না। এটা হচ্ছে অতীতের অভিজ্ঞতা। সেজন্য পণ্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতে যা যা করা দরকার তা সরকারকে করতে হবে। এজন্য বাজার মনিটরিংয়ে সরকারকে আরো চৌকশ হতে হবে। আর তাতে হয়তো কিছুটা মুক্তি মিলতে পারে।

n লেখক : গবেষক