কোর্টের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ভেঙে ফেলা হলো ঐতিহ্যবাহী পাঁচ স্থাপনা

কিছু স্থাপনা মোগল আমলের আবার কিছু ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সময়ে তৈরি। পুরান ঢাকার এমন ঐতিহ্যবাহী বহু ভবন ভাঙা হয়েছে এই করোনা লকডাউনের মধ্যেই। কোর্টের নিষেধাজ্ঞা ও থানায় জিডি থাকা সত্ত্বেও এই স্থাপনাগুলো ভাঙা থেকে সরে আসেনি ভবনের মালিকরা। ইতিহাসবিদরা বলছেন, সংরক্ষণ করার মানসিকতা ও কারো দায়বদ্ধতা না থাকায় এগুলো ভাঙা হয়েছে।

কালের সাক্ষী হিসেবে এসব স্থাপনাগুলো একদিকে যেমন অতীতের ভুল, সাফল্য ও গৌরবগাথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তেমনি তখনকার স্থাপত্যবিদ্যাকেও সামনে নিয়ে আসে। কিন্তু সেই স্মৃতিচিহ্নগুলোর বড় অংশই ধীরে ধীরে সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে। অথচ এসব ভবনের সংরক্ষণ করে পুরান ঢাকা হতে পারে একটি পর্যটন এলাকা।

করোনা লকডাউনের সময় যেসব স্থাপনা ভাঙা হয়েছে সেগুলো হলো—শাঁখারীবাজারের                ১৩৫ নম্বর বাড়ি, যেটি মোগল আমলে নির্মিত বলে জানা যায়। যেটির বেশির ভাগ অংশ ভাঙা হয়ে গেছে। অথচ এটি ভাঙার ক্ষেত্রে কোর্টের স্থগিতাদেশ রয়েছে। নিকোলাস পোগোজের বাড়ি, যেটি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সময়ে নির্মিত ভবন। যা ভাঙা নিয়ে কোর্টের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ৩০/১ সুভাস বসু এভিনিউ। এটি না ভাঙতে সূত্রাপুর থানায় জিডি করা হয়েছে। তবু করোনা লকডাউনে এটি ভাঙা হয়েছে। মদন সাহা লেনের পুরাতন মসজিদ। ব্রিটিশ ঔপনিবেশের সময়ে তৈরি। করোনার সময় পুরাতন ভবন ভেঙে নতুন ভবন তোলা হচ্ছে সেখানে। তাঁতীবাজারের ৬৭ নম্বর বাড়ি। এটিও ব্রিটিশ ঔপনিবেশের সময় তৈরি। করোনার লকডাউনের ভেতর এই ভবনটিও ভেঙে ফেলা হয়েছে। ঢাকার হেরিটেজ সংরক্ষণের দাবিতে আন্দোলনরত সংগঠন আরবান স্টাডি গ্রুপের পক্ষ থেকে করা এক রিট আবেদনে হাইকোর্ট ২০১৭ সালে পুরান ঢাকার ২ হাজার ২০০ ঐতিহ্যবাহী ভবন ও স্থাপনার ধ্বংস, পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। এর মধ্যে মদন সাহা লেনের পুরাতন মসজিদ। তাঁতীবাজারের ৬৭ নম্বর বাড়ি এবং ৩০/১ সুভাস বসু এভিনিউ ভবনও রয়েছে। কিন্তু কোর্টের নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করেই এসব ভবন ভাঙা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাড়ি যত পুরোনোই হোক না কেন তা ঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হলে জীর্ণ ও অনিরাপদ হয় না। যেগুলো রক্ষণাবেক্ষণে ও সংস্কারে সারবে না সেগুলো রেট্রোফিটিংয়ের (কাঠামো মজবুতকরণ) মাধ্যমে ঠিক রাখা যাবে। আর ঢাকার ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা গেলে শুধু পুরান ঢাকাকে ঘিরেই বড় পর্যটন শিল্প গড়ে তোলা যায়।

কবি নজরুল কলেজের শিক্ষার্থী ও পুরান ঢাকার স্থায়ী বাসিন্দা বিরাজ ভাস্কর নাথ বলেন, বর্তমানে সবার মধ্যে একটা ধারণা তৈরি হয়েছে যে পুরান ঢাকার বিরিয়ানি বিখ্যাত। অথচ এই পুরান ঢাকার কত সমৃদ্ধ ইতিহাস আছে। কিন্তু ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার ব্যাপারে তেমন কারো আগ্রহও নেই। এসব এখনি সংরক্ষণের উদ্যোগ না নিলে খুব শিগিগরই সব বিলুপ হয়ে যাবে।

এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক এ কে এম শাহনেওয়াজ বলেন, সরকারিভাবে মূলত ঐতিহ্যবাহী ভবন সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ঐতিহ্যবাহী ভবনের সামনের অংশ নকশা রক্ষা করে পেছনের অংশে ভবন নির্মাণ করা যেতে পারে।

কেনা সূত্রে মালিক নিকোলাস পোগোজের বাড়ির মালিক এনায়েত হোসেন মারুফ বলেন, আমরা প্রায় ১৭ জন এই সম্পত্তির মালিক। এটি কোনোভাবেই নিকোলাস পোগেজের বাড়ি না। আর সরকারিভাবে ঐতিহ্যবাহী যে স্থাপনার নাম প্রকাশ করা হয়েছে সেই লিস্টেও এই ভবনের নাম নেই। আর সরকার যদি এসব ভবন না সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়। তাইলে আমরা টাকা দিয়ে কিনে কী করতে পারব।

এ বিষয়ে জানার জন্য প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের উপপরিচালক রাখী রায়কে ফোন দিলে তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান।