কর্মসংস্থানে অবদান রাখছে দেশি সিরামিক ইন্ডাস্ট্রি

দেশের তরুণ প্রজন্ম প্রচলিত বা সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি বিষয় নিয়েও পড়তে বেশ আগ্রহী হয়ে উঠেছে। তারা এমন একটি বিশেষ সেক্টর বেছে নিতে চায় যাতে চাকরির বাজারে তাদের কম প্রতিযোগিতা করতে হয়। এমনই একটি খাত হলো সিরামিক খাত। এ খাতে বর্তমানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাঁচ লাখেরও বেশি দক্ষ লোকবল কাজ করছে। সম্প্র্রতি এ খাতের বর্তমান অবস্থা, চাকরির সম্ভাবনা ও লোকবলের চাহিদা নিয়ে দৈনিক ইত্তেফাকের সঙ্গে আলোচনা হয় পা-ওয়াং সিরামিক-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক, দেশের সিরামিক শিল্পের পুরোধা ব্যক্তিত্ব এস এম মাহবুব আলমের সঙ্গে। সাক্ষাত্কারটি নিয়েছেন মোজাহেদুল ইসলাম

সিরামিক সেক্টরের অতীত প্রেক্ষাপট বর্ননা দিতে গিয়ে এস এম মাহবুব আলম বলেন, আমাদের দেশের সিরামিক ইন্ডাস্ট্রি ধীরে ধীরে ভালো অবস্থানের দিকে এগুচ্ছে। এ ইন্ডাস্ট্রির বেশ কয়েকটি সাবসেক্টর রয়েছে। এগুলো হলো-বিল্ডিং ম্যাটারিয়ালসের সিরামিক ইন্ডাস্ট্রি (টাইলস,স্যানিটারিওয়্যার), টেবিল ওয়্যারের সিরামিক ইন্ডাস্ট্রি, অ্যাডভান্স সিরামিক ইন্ডাস্ট্রি ইত্যাদি। বিল্ডিং ম্যাটারিয়ালস বলতে আমরা সহজভাবে ফ্লোর বা ওয়াল টাইলস ও স্যানিটারিওয়্যারকে বুঝি। টেবিলওয়্যার সিরামিক ইন্ডাস্ট্রি বলতে থালা-বাসন, কাপ-পিরিচ, ডাইনিংয়ে ব্যবহারযোগ্য সিরামিক পণ্যকে বুঝি। অ্যাডভান্স সিরামিকের মধ্যে রয়েছে টেলিভিশনের পার্টস থেকে কৃত্রিম দাঁতসহ স্পেস ক্রাফটের মতো কিছু স্পর্শকাতর যন্ত্রাংশ।

তিনি জানান, উচ্চবিত্তের খাবার টেবিলে টেবিলওয়্যার হিসেবে সৌখিনতার জন্য এ দেশের মানুষ সিরামিক পণ্যের ব্যবহার শুরু করে বহু বছর আগে। বিশ শতকের শেষ দিকেও আমদানি এবং দেশের অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এ সৌখিন পণ্যের যোগান দিতো। তবে গত এক দশকে বছরে দেশে সিরামিক পণ্যের বাজারে এসেছে বড় পরিবর্তন। একটি বৃহত্ শিল্পে রূপ নিয়েছে বাংলাদেশের সিরামিক খাত। দেশে গড়ে উঠেছে ৬৮টি ফ্যাক্টরি/ব্র্যান্ড। প্রতিবছর স্থানীয় বাজারেই বিক্রি হচ্ছে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার পণ্য। গত বছর রপ্তানিও হয়েছে প্রায় চারশ’ কোটি টাকা। একেকটি ইন্ডাস্ট্রিতে ওয়ার্কার থেকে ইঞ্জিনিয়ার,সব মিলিয়ে গড়ে চারশ’র বেশি লোকবল কাজ করে। কোনো কোনো ইন্ডাস্ট্রিতে হাজারখানেক লোকবলও কাজ করছে।

তিনি জানান, ব্যাপকভাবে চিন্তা করলে একটি ইন্ডাস্ট্রিতে পাঁচ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হয়ে থাকে। যেমন ধরুন-‘র’ ম্যাটারিয়ালসের সঙ্গে কাজ করছে পাঁচশ’ শ্রমিক, ট্রান্সপোর্টের জন্য ড্রাইভার থেকে শুরু করে লোড-আনলোডে কাজ করছে বেশ কিছু লোক। এরপর ফিনিশিং পর্যায়ে প্রতিটি দোকানে টাইলস বিক্রিতে কাজ করছে ৫/৬ জন থেকে শুরু করে আরও বেশি লোকবল। এভাবে হিসাব করলে দেখা যাবে একটি ইন্ডাস্ট্রিতেই কাজ করছে অন্তত পাঁচ হাজার মানুষ। একটি সিরামিক ইন্ডাস্ট্রি জন্মের সঙ্গে সঙ্গে পাঁচ হাজার পরিবার বেকারত্ব থেকে মুক্তি পাচ্ছে।

তিনি আরো জানান, গুনগত মানের দিক থেকে আমাদের সিরামিক পণ্য দেশের বাইরের পণ্যের চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়। স্যানিটারি পণ্য, টাইলসে আমাদের কোয়ালিটি বিশ্বমানের। পা-ওয়াং সিরামিক ইন্ডাস্ট্রি রোমা ব্রান্ড-এর লাক্সারিয়াস টাইলস উত্পাদন করে। বিদেশ থেকে যে পণ্যগুলো দেশে আসছে আমরা ঠিক সেই মানের পণ্য উত্পাদন করি। সরকারও চাচ্ছে আমরা যেন উন্নত পণ্য উত্পাদনে বেশি গুরুত্ব দেই এবং শিল্পে স্বনির্ভরতা অর্জনের মাধ্যমে বিদেশি পণ্য পরিহার করতে পারি।

বাংলাদেশের সিরামিক ইন্ডাস্ট্রির মার্কেট সাইজ সম্পর্কে জানতে চাইলে মাহবুব আলম বলেন, সিরামিক ইন্ডাস্ট্রির মার্কেট সাইজ সারা বিশ্বের হিসাবে আমাদের ইন্ডাস্ট্রি রয়েছে এক শতাংশ। বিশ্বের সবচেয়ে বড় মার্কেট শেয়ার রয়েছে চীনের, প্রায় ৬০শতাংশ। বিশ্ব বাজারে-এর পরবর্তী অবস্থানে রয়েছে ইতালি। বাংলাদেশে সিরামিক ইন্ডাস্ট্রির মার্কেট সাইজ হলো পাঁচ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে আমদানি নির্ভর হচ্ছে টেবিলওয়্যার-১.১৪শতাংশ, টাইলস-১৯.৭৫ শতাংশ, স্যানিটারিওয়্যার-৭.৯১ শতাংশ। দুই বছর আগে এর পরিমান ছিল ১৫ শতাংশ।

এ ইন্ডাস্ট্রিতে দক্ষ লোকবল তৈরি ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে পা-ওয়াং সিরামিক ইন্ডাস্ট্রির এ পুরোধা ব্যক্তিত্ব বলেন, আমাদের ইন্ডাস্ট্রি শুরু করেছি ফ্রেশার ইঞ্জিনিয়ারদের নিয়ে। এখানের প্যাকিং সেকশনে কাজ করা লোকজন, লোড-আনলোডের লোকজন, নিরাপত্তাকর্মী ও দারোয়ান ছাড়া সবাই ইঞ্জিনিয়ার। তিন শতাধিক ইঞ্জিনিয়ারের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পেরেছি এ ইন্ডাস্ট্রির মাধ্যমে। মানুষ দক্ষ হয়ে জন্মায় না। দক্ষতা আসলে অর্জন করে নিতে হয়, দক্ষ লোকবল তৈরি করে নিতে হয়।  আমার ২৫ বছরের অভিজ্ঞতা, চিফ টেকনিক্যাল অফিসারের ২০ বছরের অভিজ্ঞতা ও অপর দুইজনের এক বছর ও দুই বছরের অভিজ্ঞতা দিয়ে মাত্র চার জন নিয়ে এ ইন্ডাস্ট্রি শুরু করেছিলাম। ফ্রেশার ইঞ্জিনিয়ারদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে আমরা আজ দক্ষতা সম্পন্ন লোকবল তৈরি করতে পেরেছি। এ খাতে সিরামিক ইঞ্জিনিয়ার, ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, অটোমেশন ইঞ্জিনিয়ার, থার্মাল ইঞ্জিনিয়ারদের চাহিদা রয়েছে।

করোনাকালীন সময়ে সিরামিক ইন্ডাস্ট্রির বাস্তবতা বর্ননা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ২০১৮ সালে পা-ওয়াং সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিযাত্রা শুরু করে। তখন সকল পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থাতেই ছিল। আমাদের দেশে চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে করোনার প্রাদুর্ভাব ব্যাপকভাবে শুরু হলেও আমরা ফেব্রুয়ারি থেকেই সতর্ক হয়েছি। চীনে করোনা সংক্রমণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের দেশের সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিতে তার প্রভাব পড়েছে। কারণ, আমরা বিদেশ থেকে অনেক কাঁচামাল আমদানি করে থাকি। আবার উত্পাদিত পণ্য রপ্তানিও করি।

তিনি আরও বলেন, করোনা শুরুর দিকে মানুষ এটিকে খুব ভয় পেতো, কাজে যেত না। এখনতো করোনাকে সাধারণ সর্দি-জ্বর হিসেবেই দেখছে। সবাই বুঝে নিয়েছে, করোনাকে সঙ্গে নিয়েই আমাদের কাজ কর্ম চালিয়ে যেতে হবে।

এ খাতে সরকারি প্রণোদনার বিষয়ে মাহবুব আলম বলেন, সরকারি প্রণোদনার একটি বরাদ্দ আমরাও পেয়েছি। কেউ কেউ-এর জন্য যাবতীয় প্রস্তুতি নিচ্ছে, আবার অনেকের প্রণোদনার দরকারও নেই। করোনার কারণে অনেক ইন্ডাস্ট্রি এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। কেউ কেউ তিন মাস পরই অপারেশন শুরু করে দিয়েছে।

এ খাতে লোকবলের কাজের আগ্রহের বিষয়ে তিনি বলেন,  এ খাতে কারও কাজ করার আগ্রহ অনেকগুলো বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। আমাদের কারখানা বগুড়ায়। কর্মীদের বিভিন্ন সমস্যাগুলো গুরুত্বসহকারে দেখে থাকি আমরা। আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে তাদের সুবিধা-অসুবিধাকে  প্রাধান্য দিয়ে থাকি।

সিরামিক পণ্য রপ্তানির প্রধান বাধাগুলো চিহ্নিত করে মাহবুব আলম বলেন, এক্ষেত্রে অন্য দেশের তুলনায় আমরা এখনো পিছিয়ে রয়েছি। অন্য দেশের তুলনায় আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যটি পৌঁছে দিতে আমাদের খরচ অনেক বেশি হয়। কাঁচামাল আমদানিতে ৩২ শতাংশ ট্যাক্স দিতে হয়। বিদেশে  সরাসরি ও দ্রুত পণ্য পৌঁছানোর যথাযথ কোনো ব্যবস্থা নেই। এ কারণে আমাদের পণ্য বিশ্ববাজারে পৌঁছতে অনেক বেশি মূল্য পড়ে যায়। চীনসহ অনেক দেশ সরাসরি এ পণ্যগুলো রপ্তানি করতে পারে বলেই তারা কমমূল্যে পণ্য দিতে পারে।