নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের শিকার ঐ নারী আদালতে দেওয়া ২২ ধারার জবানবন্দিতে স্থানীয় ইউপি মেম্বার মোয়াজ্জেম হোসেনকে অভিযুক্ত করেছেন। জবানবন্দিতে ঐ নারী অভিযোগ করেন, তাকে নির্যাতনের সাত-আট দিন পর তিনি মোয়াজ্জেমের বাড়িতে গিয়ে ঘটনাটি জানান। কিন্তু কোনো সহযোগিতা না করে উলটো ঘটনাটি চেপে যাওয়ার জন্য বলেন এই মেম্বার। বিষয়টি ইত্তেফাককে নিশ্চিত করেছেন জেলা পুলিশ সুপার আলমগীর হোসেন। এদিকে ঐ নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ঘটনার আগে দুবার ধর্ষণ করেছিল স্থানীয় দেলোয়ার বাহিনীর প্রধান দেলোয়ার হোসেন। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের তদন্ত দলের কাছে নির্যাতনের শিকার ঐ নারী গতকাল মঙ্গলবার এমন অভিযোগ করেছেন। তদন্ত শেষে গতকাল বিকালে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পরিচালক (অভিযোগ ও তদন্ত) ও তদন্ত দলের প্রধান আল-মাহমুদ ফয়জুল কবীর সাংবাদিকদের এসব কথা জানান।
এদিকে নিপীড়ক ও ধর্ষকদের বিরুদ্ধে দেশ জুড়ে চলছে ধিক্কার, নিন্দা ও প্রতিবাদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও গতকাল কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে ‘সংস্কৃতিকর্মীদের প্রতিবাদী অবস্থান’ কর্মসূচি পালন করেছে। অব্যাহত বৃদ্ধি পাওয়া ধর্ষণ, নারীর প্রতি সহিংসতাসহ সব ধরনের সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি।
নোয়াখালী চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের মিলনায়তনে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পরিচালক (অভিযোগ ও তদন্ত) ও তদন্ত দলের প্রধান আল-মাহমুদ ফয়জুল কবীর সাংবাদিকদের বলেন, নারীর অভিযোগ অনুযায়ী দেলোয়ার প্রায় সময় তাকে অশোভন প্রস্তাব দিত। প্রস্তাবে সাড়া দিতে হুমকি-ধমকিও দেওয়া হতো। বছরখানেক আগে দেলোয়ার তার ঘরে ঢুকে তাকে প্রথমবার ধর্ষণ করে। ভয়ে ও লোকলজ্জায় তিনি এ ঘটনা প্রকাশ করার সাহস পাননি। এরপর গেল রমজানের কিছুদিন আগে দেলোয়ার তার সহযোগী কালামের মাধ্যমে ঐ নারীকে একটি নৌকায় ডেকে পাঠায়। সেখানে দেলোয়ার ও কালাম দুজনই তাকে ধর্ষণ করতে চায়। এ সময় তিনি দেলোয়ারের কাছে অনুনয়-বিনয় করলে কালামকে টাকা দিয়ে পাঠিয়ে দেয় দেলোয়ার। এরপর নৌকায় দ্বিতীয়বার তাকে ধর্ষণ করে দেলোয়ার।
এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে নোয়াখালীর পুলিশ সুপার আলমগীর হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, আগের অভিযোগের পাশাপাশি ঐ নারী এখন যেসব নতুন অভিযোগ করেছেন, সেগুলোও তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
আমাদের নোয়াখালী প্রতিনিধি জানান, নারীকে (৩৫) বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ঘটনায় আরো দুই জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে মামলার ৫ নম্বর আসামি মো. সাজু (২১) এবং অন্যজন ঐ ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন সোহাগ (৪৮)। মোয়াজ্জেম হোসেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। সাজুকে সোমবার রাতে ঢাকার শাহবাগ এলাকা থেকে এবং মোয়াজ্জেমকে রাতে স্থানীয় জয়কৃষ্ণপুর এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। এ ঘটনায় এজাহারভুক্ত চার আসামিসহ ছয় জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে পুলিশ আবদুর রহিম, মো. সাজু, রহমত উল্লাহ ও মোয়াজ্জেম হোসেনকে গ্রেফতার করে। অন্য দুই জন নূর হোসেন বাদল ও দেলোয়ার বাহিনীর প্রধান দেলোয়ারকে অস্ত্রসহ গ্রেফতার করে র্যাব। এর মধ্যে নূর হোসেনকে বেগমগঞ্জ থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। এদিকে বাদল ও মোয়াজ্জেমকে গতকাল আদালতে হাজির করা হয়। আদালত বাদলকে সাত দিন এবং মোয়াজ্জেমকে দুই দিনের রিমান্ড দিয়েছে।
রেড স্টার গ্যাং বাহিনীর প্রধান দেলোয়ার :পঞ্চম শ্রেণি পাশ করেই দেলোয়ার বেগমগঞ্জ এলাকায় বখে যাওয়া ছেলেদের তালিকায় নাম লেখায়। সমবয়সি ২০ জনকে নিয়ে গঠন করে ‘রেড স্টার’ গ্যাং বাহিনী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘রেড স্টার গ্যাং’ নামে একটি পেজ খোলে। এই পেজে নতুন ভিডিও আপ করার জন্য নিজেরাই ঘটনা তৈরি করে তা ভিডিও করে। এই ভিডিও তাদের পেজে আপ করার সঙ্গে সঙ্গে লাখ লাখ লাইক পড়ে। একেকটি ভিডিওর কমেন্টস ও শেয়ারের সংখ্যা বাড়তে থাকে। দেলোয়ার নিজেই বেগমগঞ্জ এলাকায় তরুণীদের ইভটিজিং করত। ইভটিজিং করার দৃশ্য তার বাহিনীর সদস্য দিয়ে ভিডিও করাত। ঐ ভিডিও তার রেড স্টার গ্যাং পেজে আপ করে দিত। এভাবে দেলোয়ার বাহিনী বেগমগঞ্জ এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। তার বাহিনী বেগমগঞ্জ ও মাইজদী এলাকায় বড় টেন্ডারবাজ গ্রুপের সঙ্গে টেন্ডারবাজিতে মহড়া দেয়। মহড়া দেওয়ার সময় দেলোয়ার বাহিনীর লোকজন সেটা ভিডিও করে তা তাদের পেজে আপ করে দেয়।
ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, অস্ত্রবাজি, দখল এমনকি নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েও দেলোয়ার বাহিনী ছিল ধরাছোঁয়ার বাইরে। স্থানীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা, বিভিন্ন সময়ে এমপির ছবি দিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময়ে পোস্টারিং ছিল দেলোয়ার বাহিনীর প্রধান দেলোয়ারের রাজনৈতিক হাতিয়ার। আর এই হাতিয়ারকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নানা অপকর্ম চালিয়ে এলেও পুলিশ কখনো এ বাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি। ১২টি ধর্ষণ, ৩টি হত্যাসহ দেলোয়ার ১৭ মামলার আসামি হয়েও কীভাবে বেগমগঞ্জ এলাকায় দাপিয়ে বেড়িয়েছেন এ নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে স্থানীয় সংসদ সদস্যের বিশেষ আশীর্বাদ থাকায় পুলিশ দেলোয়ার বাহিনীর প্রধান দেলোয়ার ও তার গ্রুপের সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কখনো ব্যবস্থা নিত না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় দিনের মতো বিক্ষোভ :আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও শাহবাগ মোড়ে গতকালও দিনভর আন্দোলন করেছে বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা। ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এ আন্দোলন করেন। গতকাল বেলা ১১টার দিকে রাজধানীর শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরের সামনে ‘নিপীড়নবিরোধী ছাত্র জনতা’র ব্যানারে এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। এদিকে দ্বিতীয় দিনের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে অবস্থান কর্মসূচি পালন অব্যাহত রেখেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয় শিক্ষার্থী। সন্ধ্যা ৭টায় ধর্ষণের প্রতিবাদ ও বিচারের দাবিতে মোমবাতি প্রজ্বালন করে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে এই মোমবাতি প্রজ্বালন কর্মসূচিটি কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে গিয়ে শেষ হয়। এদিকে সকালে শাহবাগ এলাকায় বিক্ষোভ কর্মসূচি শেষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অভিমুখে রওনা দেন ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকর্মীরা। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল এলাকায় যাওয়ার পর পুলিশি বাধার সম্মুখীন হন। এ সময় পুলিশের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা ও ধস্তাধস্তিকালে ছাত্র ইউনিয়ন নেতা আসনানি আশা, মাহমুদা দিপা, সাজ্জাদ হোসাইন শুভসহ পাঁচ জন আহত হন।
অব্যাহত ছয় শিক্ষার্থীর অবস্থান :এদিকে গতকাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে অবস্থান নেওয়া ছয় শিক্ষার্থী তাদের অবস্থান ধর্মঘট অব্যাহত রেখেছেন। দুই দফা দাবিতে অবস্থান নেওয়া ঐ ছয় শিক্ষার্থী ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত না করা পর্যন্ত তাদের অবস্থান ধর্মঘট চালিয়ে যাবেন বলে জানান। জানতে চাইলে অবস্থান করা শিক্ষার্থী কবি জসিম হল ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) ইমাম হাসান বলেন, আমরা একটি সুন্দর সকাল চাই। ধর্ষণের মতো কোনো নারকীয় ঘটনা যাতে আর না ঘটে, আমাদের প্রতিটি সকাল যেন সুন্দর হয়ে শুরু হয় সেজন্য আমরা অবস্থান নিয়েছি।
বিভিন্ন স্থানে ধর্ষণের প্রতিবাদে রাজধানীর উত্তরায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের কারণে সড়কের পশ্চিম পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তারা ধর্ষণের প্রতিবাদে স্ল্লোগান দিতে থাকেন। উত্তরার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা একত্রিত হয়ে এই বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেন।
অস্ত্র মামলায় দেলোয়ার দুই দিনের রিমান্ডে :আমাদের নারায়ণগঞ্জের স্টাফ রিপোর্টার জানান, দেলোয়ার হোসেনকে অস্ত্র মামলায় রিমান্ডে নিয়েছে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ। মঙ্গলবার বিকেলে তাকে তিন দিনের রিমান্ডের আবেদন করে নারায়ণগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ফাহমিদা খাতুনের আদালতে হাজির করা হয়। আদালত শুনানি শেষে দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
জড়িতদের শাস্তির দাবি বেগমগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের :এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি করে গতকাল বিকালে সংবাদ সম্মেলন করেছে উপজেলা আওয়ামী লীগ। দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও বেগমগঞ্জের এমপি মামুনুর রশীদ কিরণ। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের কেউ নারী নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত থাকলে আমরা তদন্ত করে দলীয়ভাবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করব। নারী ধর্ষণকারীসহ অপকর্মকারীরা দলীয় নেতাদের সঙ্গে বড় বড় পোস্টার ঝুলিয়ে নিজেদের রক্ষার চেষ্টা করে। দেলোয়ার আমার নামে পোস্টার ছাপিয়েছে এটি অনলাইনে তৈরি করা হয়েছে।
এদিকে, এই ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে গতকাল সকালে বিএনপি বেগমগঞ্জের চৌমুহনী বাজারে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে। মিছিলে নেতৃত্ব দেন বিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্যাহ বুলু। একই সময়ে নোয়াখালী প্রেসক্লাবের সামনে ‘যৌন হয়রানি নির্মূলকরণ নেটওয়ার্ক’ নোয়াখালী শাখার উদ্যোগে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়। বেগমগঞ্জের এখলাসপুর বাজারে স্থানীয় জনসাধারণ মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে।
নারী সাংবাদিক সমিতির প্রতিবাদ :জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক সমিতির (বানাসাস) উদ্যোগে গতকাল মানববন্ধন, কুশপুত্তলিকা দাহ ও বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। বানাসাসর সভাপতি নাসিমা সোমার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন সাধারণ সম্পাদক আনজুমান আরা শিল্পী, বিএফইউজে-বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের কোষাধ্যক্ষ দ্বীপ আজাদ, ডিইউজের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আক্তার হোসেন, এম জহিরুল ইসলাম, মইনুল ইসলাম বাদল চৌধুরী, নাসির উদ্দীন বুলবুল, ইশরাত ফারহিম, ফাতিমা মুন্নি, শান্তা ফারজানা, আকলিমা বেগম লিমা প্রমুখ।