নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার একলাশপুরের এক নারীকে (৩৫) বিবস্ত্র করে নির্যাতন এবং ভিডিওচিত্র ধারণের চাঞ্চল্যকর ও বহুল আলোচিত ঘটনার মূলহোতা সন্ত্রাসী বাহিনীর প্রধান দেলোয়ার হোসেন ও তার প্রধান সহযোগী আবুল কালামের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা দায়ের করা হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে নির্যাতিতা ওই নারী বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে বেগমগঞ্জ মডেল থানায় মামলাটি দায়ের করেন।
মামলার এজাহারে নির্যাতনের শিকার ওই নারী অভিযোগ করেন, গত ২ সেপ্টেম্বর দেলোয়ার বাহিনীর সদস্যরা বিবস্ত্র করে নির্যাতন করার ঘটনার আগে দেলোয়ার ভিন্ন ভিন্ন সময় এবং ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় তাকে দুইবার ধর্ষণ করেছিলেন। এর মধ্যে একবার ধর্ষণ করা হয় প্রায় এক বছর আগে। আর দ্বিতীয় বার ধর্ষণ করা হয় গত রমজানের কিছুদিন আগে। দ্বিতীয় বার ধর্ষণের ঘটনার দিন দেলোয়ারের সহযোগী কালামও তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করেছিল।
জেলার পুলিশ সুপার মো. আলমগীর হোসেন এ তথ্যটি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, দেলোয়ার নারায়ণগঞ্জে গ্রেফতার হয়েছে। আগের দুই মামলায় এবং ধর্ষণ মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানোর জন্য বুধবার আদালতে আবেদন করা হয়েছে। আগামী ১৩ অক্টোবর দেলোয়ারকে নোয়াখালীর আদালতে হাজির করা হবে।
এই ধর্ষণ মামলা দায়েরের পূর্বে ওইদিন দুপুরে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পরিচালক (অভিযোগ ও তদন্ত) আল-মাহমুদ ফায়জুল কবীর নোয়াখালীতে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, কমিশনের তদন্ত দলের কাছে নির্যাতনের শিকার ওই নারী তাকে দেলোয়ার দুইবার ধর্ষণ করেছে এবং তার সহযোগী কালামও ধর্ষণের চেষ্টা করে এ তথ্য দিয়েছেন। তিনি আরও জানিয়ে ছিলেন কমিশনের প্যানেল আইনজীবী দিয়ে এ বিষয়ে তারা নির্যাতিতার পক্ষে মামলা দায়ের করবেন। এর আগে রবিবার রাতে বিবস্ত্র করে নির্যাতন এবং ভিডিওচিত্র ধারণের ঘটনায় জড়িত ৯জনের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং পর্নোগ্রাফি আইনে দায়ের করা দুইটি মামলায় ঘটনার মূলহোতা দেলোয়ারের নাম না থাকায় সর্বত্র চলে আলোচনা -সমালোচনার ঝড়। সোমবার ভোরে দেলোয়ারকে নারায়ণগঞ্জ এলাকা থেকে অস্ত্রসহ গ্রেফতার করে র্যাব। তবে আবুল কালাম প্রথম দুই মামলার ৩ নম্বর আসামি ।
এ দিকে বুধবার রাত ৯টার দিকে র্যব-১১এর অধিনায়ক লে. কর্নেল খন্দকার সাইফুল আলম স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে প্রথম দুই মামলার ৩ নম্বর আসামি এবং পরে ধর্ষণ মামলার পলাতক আসামি আবুল কালামকে(২২) ভোর সাড়ে ৫টার দিকে কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দির মারুকাএলাকা থেকে গ্রেফতার করেছে র্যাব। কালামকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, গত ২ সেপ্টেম্বর রাতে দেলোয়ার বাহিনীর প্রধান দেলোয়ারের পরিকল্পনা অনুযায়ী সে অন্য আসামিসহ ভুক্তভোগী ওই নারীর প্রবেশ করে তাকে বিবস্ত্র করে মধ্যযুগীয় কায়দায় বিভিন্নভাবে শারীরিক নির্যাতন করে এবং ঘটনার ভিডিও ধারণ করে। রাত১০টার দিকে জেলার পুলিশ সুপার মো. আলমগীর হোসেন জানিয়েছেন গ্রেফতারকৃত কালামকে বেগমগঞ্জ থানায় সোপর্দ করেছে র্যাব।
আরো দুইজন গ্রেফতার- এ নির্যাতনের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে মঙ্গলবার রাতে আরো দুইজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তারা হলেন- পূর্ব একলাশপুর গ্রামের মৃত সোলেমানের ছেলে নূর হোসেন রাসেল (৩০) ও পোড়া মুনসির ছেলে মো. সোহাগ (২৬)। এদেরকে গ্রেফতারের বিষয়ে পুলিশ সুপার জানান, এই দুইজনের নাম মামলার এজাহারে নেই। তবে রিমান্ডে থাকা আসামীদের তথ্যে ঘটনার সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা পাওয়ায় গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদেরকে পর্নোগ্রাফি আইনের মামলায় গ্রেফতার দোনো হয়েছে। এ পর্যন্ত মামলার এজাহারভুক্ত ৪ জনসহ ৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
এ দিকে সোমবার গ্রেফতারকৃত মামলার ৫ নম্বর আসামি মো. সাজু এবং মঙ্গলবার গ্রেফতারকৃত রাসেল ও মো. সোহাগকে গতকাল বুধবার দুপুরে জেলার ৩নং আমলী আদালতে হাজির রিমান্ডের আবেদন করে পুলিশ। আদালতের বিচারক সিনিয়র জুডিশিয়াল মাশফিকুল হক শুনানি শেষে আসামি মো. সাজুকে ৬ দিন এবং রাসেল ও মো. সোহাগকে ২ দিনের রিমান্ডের আদেশ দেন। গত তিন দিনে এ নিয়ে ৭ আসামির রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। এদিকে নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের প্রতিবাদে ও জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শান্তির দাবীতে গতকাল নোয়াখালী প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন ও সমাবেশ করেছে আইনজীবী পরিষদ, নোয়াখালী আইডিয়াল পলিটেকনিক্যাল ইনিস্টিটিউ ও সো-টিমসহ কয়েকটি সংগঠন। ।
ইত্তেফাক/এমআর