আমি ফুলপরি

ফুল নামের মেয়েটি আজ রাস্তায় ছুটে চলেছে সুরভিত ফুল নিয়ে। একদম ছোটবেলায় বাবা ওকে ডাকত ফুলপরি বলে। আর ফুল নেচে নেচে বলত, আমি ফুলপরি। লালপরি আর নীলপরি। আর তখন বাবা গলা ছেড়ে গাইত—

আমার কইন্যার রুপার নূপুর

বাজে কেমন ঝুমুর ঝুমর।

বাবা অকালে মারা যাবার পর ফুলের পৃথিবীটা কেমন বদলে গেল। মা ছুটা বুয়ার কাজ নিল আর ফুল রাস্তায় ফুল নিয়ে দৌড়ায়। ও যখন ফুলের মালা আর তোড়া নিয়ে দৌড়ে যায় রাস্তায় তখন গাড়ির কাচ নামিয়ে কেউ ডাকে, এই ফুল। আসলে ওরা তো ফুল কেনার জন্য ওকে ডাকে। কেউ জানেই না ওর নাম ফুল। রাস্তায় ফুল বিক্রি করতে করতে ও মুহূর্তেই হয়ে ওঠে ফুলপরি। ও হাসতে হাসতে বলে, আমি ফুলপরি। লালপরি ও নীলপরি। খুব আস্তে আস্তে বলে কথাগুলো। গাড়িতে বসা মানুষেরা তা শুনতে পায় না। কেউ ফুল নেয়। কেউ নাক কুঁচকে বলে, ‘নাহ্, তোর ফুল সুন্দর নয়’। ফুলের মন খারাপ হয় খুব।

ফুলের মন খারাপ হলে মনে হয় সত্যি ওর হাতের জায়গায় দুটো অদৃশ্য ডানা গজাচ্ছে। ও রাস্তায় ছুটে চলে না, যেন উড়ে চলে। গাড়িতে বসা কোনো কোনো বাচ্চা বলে ওঠে, ‘মা দেখো দেখো ঐ যে ফুলপরি। পরির মতো ডানাও আছে’। বাচ্চার মা হেসে বলে, ‘আরে ডানা কোথায়? মেয়েটা কেমন হাত দুটো মেলে  ছুটে চলেছে রাস্তায়’। সত্যি ব্যস্ত শহরের রাস্তায় ছুটে চলেছে সে গাড়ি ও মানুষের মধ্য দিয়ে। বাইরে রোদ কিংবা বৃষ্টি। তবু  ছুটে চলে ফুলপরি।

ফুল মাঝে মাঝে দিনশেষে মাকে জড়িয়ে ধরে বলে, ‘মা, আমি ফুলপরি হইতে চাই।’ মা কী কাজ করছিল, চমকে উঠে ধমক দেয়, ‘ধুর মাইয়া, মানুষ ক্যামতে ফুলপরি হইবো? ঐটা তোর বাপের খোয়াব ছিল রে। যাত্রাপালা দেখতো খুব আর বাঁধতো গান। সংসারে মন ছিল না রে পাগলি। উদাসী মানুষ। থাউকগা তার কথা। লোকটা নাই, তাও তো আমরা সংসারটা চালাইতে পারছি। কী কস ফুল?’ ফুল উল্টে বলে, ‘উহুঁ মা, ফুলপরি বইল্যা ডাকবা আমাকে। তুমি জানো না আমি ফুলপরি’। মা এবার কলকলিয়ে হাসে। ‘আচ্ছা আচ্ছা, তয় ফুলপরিই সই।’ ফুলের মন সাথে সাথে ভালো হয়ে যায়।

সারাদিনের খাটুনিতে মা বাড়িতে গিয়ে কোনোরকম রান্না করে। মা কিন্তু ভাত খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ে। ফুল তখন ওর বিক্রি না হওয়া ফুলগুলো নাড়াচাড়া করে। দোপাটি আর বেলিফুলের সৌরভ ওকে আচ্ছন্ন করে রাখে। ওর তখন খুব বাবার কথা মনে পড়ে। ছোটবেলায় ওকে কোলে নিয়ে কেমন ঝুমঝুমি বাজিয়ে বলত, ফুলপরি আমার ফুলপরি। তুমি আমার লালপরি ও নীলপরি। আর সবে হাঁটতে শেখা ফুল তখন দুলে ওঠা পায়েই নাচত। মা হাসত খিলখিল করে। হাসত বাবাও।

রাত এলেই আকাশে তারা ফোটে। ওগুলো আকাশের ফুল। নীল আকাশের সাদা বেলিফুল। আকাশের দিকে তাকিয়ে বাবাকে খোঁজে ফুল। সে জানে কোনো একটা তারা ফুল তো তার বাবা। ফুলের মনে হয় বাবা যেন বলছে—

আমার কইন্যার রুপার নূপুর

বাজে কেমন ঝুমুর ঝুমুর।

হুম সেই আগের মতোই যেন শোনা যায় হাততালির শব্দ। আবারও হাততালির শব্দ। না কোনো ভুল নেই, আর তখন ফুলও কেমন হাত বাড়িয়ে পা শূন্যে তুলে নাচতে শুরু করে। যেন তার পায়ে আছে সত্যিকারের রুপার নূপুর। তারই শব্দ হচ্ছে ঝুমুর ঝুমুর। আর তার হাত হয়ে যায় ডানা—পরির ডানা।

রাত গভীর হয়ে উঠলে ফুল তখন কেমন যেন উড়ে উড়ে ওদের বস্তিঘরের বাইরে চলে আসে। ভোরের আকাশ ভরে ওঠে তারার মেলায়। ফুল এবার হাত ছড়িয়ে দেয় আরো। হাত দুটো যেন পাখা হয়ে যায়। যেন সে এই পাখা দিয়ে উড়ে যাবে দূর আকাশে। মেঘের ওপারে। ফুলের বাবা আকাশের ওপার থেকে দেখছেন এক অপরূপ দৃশ্য। তার মেয়ে বিক্রি না হওয়া সব ফুলের মালা পরে বস্তির ঐ ছোট্ট ঘর পেরিয়ে রাস্তায় নেচে চলেছে। তার পায়ের নূপুরে শব্দ হচ্ছে ঝুমুর ঝুমুর। একসময় ফুল যেন উড়েই যায় তার পাখা নিয়ে। কেউ যেন ফুলকে ডাকে, ‘ফুলপরি’। ও তখন ঠিক বলে ওঠে, ‘বাবা আমি ফুলপরি! আমি লালপরি ও নীলপরি’।

অলঙ্করণ :সায়মা আহাদ খান

সপ্তম শ্রেণি, তেজগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, ঢাকা