শারদ রাতে

—কে ওখানে? এই কে ওখানে? জ্যোত্স্নাভরা রাত। একটি যুবকের ছায়া মনে হলো! উঁকি দিচ্ছিল সে ছায়া। বেশ কয়েকবার। যেই ছায়াটি ভালোমতো পরখ করতে যায় স্নিগ্ধা, তা মুহূর্তেই যেন মিলিয়ে যায়!

অস্ফুট স্বরে স্নিগ্ধা ‘কে কে’ বলে ওঠে! দুরু দুরু বক্ষ। ঋজু বুক ওর নিঃশ্বাসে দ্রুত ওঠানামা করে। ভয়ে গাছের নিচে বসা সবুজের হাত চেপে ধরে! চাঁদের ঝকঝকে সাদা জ্যোত্স্নায় ভয়ার্ত স্নিগ্ধার চোখ দুটো লক্ষ করে সবুজ। দু’ হাতে ওর গালে ধরে স্নিগ্ধার ঘন লম্বা চুলের বেণি শোভিত মাথাটা। তারপর ওর বুকে চেপে ধরে! নব পরিণীতা স্ত্রীর প্রতি সবুজের জিজ্ঞাসা—

—ভয় পাইছো বেশি? ছায়া দেইখ্যা ভয় পাইলে চলবো? একটা জিনিস খেয়াল করলাম! বেশ কিছুদিন ধইরা তুমি অন্যমনস্ক! এর আগেও বাসায় ছায়া দেইখ্যা আঁতকাইয়া উঠছো! সবুজের কথার কোনো উত্তর দেয় না স্নিগ্ধা। শুধু ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে মরা ধলেশ্বরী নদীর দিকে। শরতের বাউরি বাতাস বইছে। চকচকে হলুদ কালোর কামিজ পরা ও। গলায় মালার মতো পেঁচানো স্নিগ্ধার ওড়নাটা উড়ে যাচ্ছিল। সিল্কের তৈরি ওড়নাটা মুহূর্তেই ধরে ফেলে সবুজ। পরিয়ে দেয় স্নিগ্ধাকে। একি! জীবনসঙ্গিনী স্নিগ্ধার চোখে পানি। গাল ভিজে গেছে। আশ্চর্যান্বিত সবুজ এর কারণ জানতে চায় স্নিগ্ধার কাছে।

—কী ব্যাপার বলো তো ?

ছায়া আতঙ্ক এবং কান্না মেলাতে পারে না সবুজ। স্নিগ্ধা ও সবুজের দাম্পত্যজীবনের বয়স সামনের ১৫ নভেম্বরে দু’ বছর পূর্ণ হবে। স্নিগ্ধার জীবনে এ পর্যন্ত এসেছে দুই পুরুষ। একজন সবুজ আরেকজন নিলয়। সবুজ বিয়ের পরে নিলয় আগে। প্রায় দু’ বছরের সংসারে স্বামীরূপে সবুজকে পেয়ে স্নিগ্ধা তৃপ্ত নয়। নিলয়কে না পেয়ে স্নিগ্ধার জীবনে অতৃপ্তি থেকে গেছে। জীবন থেকে মুছে ফেলতে পারছে না তাকে। নিলয়ের ছায়া তাকে সারাক্ষণ ঘিরে রাখে। তার অকালমৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারে না স্নিগ্ধা। বেদনার জ্বালা আর অতৃপ্তির হতাশা তাকে কুরে কুরে খায়। নিলয়ের ছায়া সে প্রায়ই দেখতে পায়। যাপিত জীবনে এখন স্নিগ্ধার ছায়াসঙ্গী নিলয়।

নিলয়ের মতো অটবির বাউরি জ্যোত্স্নাপ্রিয় দুজনেই। ধলেশ্বরী নদীর পাড়ে গহিন কাশবনের মুগ্ধতায় ভরপুর সবুজও। স্নিগ্ধারও জায়গাটা বেশ চেনা। তা বাড়ির কাছেই। পায়ে হাঁটা পথ। নিকট অতীতের দুঃখময় স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই কাশবনে। সে কাহিনি জানে না শুধু সবুজ ।

ঘন সবুজ পত্রালির কাশবনের পাশেই বায়রার চারাভাঙা গ্রাম। স্নিগ্ধার বাপের বাড়ি। শ্বশুরবাড়ি মানিকগঞ্জের গড়পাড়া। মানিকগঞ্জ শহরে ছোট্ট বাসায় ওরা থাকে। শহর উপকণ্ঠে বেসরকারি উন্নয়নমূলক একটি প্রতিষ্ঠানে ঋণ কর্মকর্তা সবুজ। ওর মতো দেবেন্দ্র সরকারি কলেজে স্নিগ্ধাও পড়েছে। তবে স্নাতক পাস আর সম্ভব হয়নি নিলয়ের দুর্ঘটনার পর। একই গ্রামের গরিব ছেলে নিলয়। বয়সে স্নিগ্ধার চেয়ে ৪ বছরের বড়ো। অষ্টম শ্রেণিতে পড়াকাল থেকে সম্পর্ক। তখন উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থী নিলয়। ভালো বাঁশি বাজাত। গ্রামে থাকলে কাশবনের এ জায়গাটাতে দুজন এসে বসতো। স্নিগ্ধা নিলয়ের কাছে এখানে বাঁশির সুরে লালন ও পল্লিগীতি শুনেছে। ভাবিকে নিয়ে জ্যোত্স্না রাতে স্নিগ্ধা কাশবনে নিলয়ের সাথে দেখা করতে এসেছে একাধিকবার। ভাবি রাজি থাকলেও  শিক্ষিত বেকার ছেলে নিলয়ের কাছে জোতদার পিতা নসু মিয়া স্নিগ্ধাকে বিয়ে দেননি। কঠিন যকৃত্ রোগে শয্যাশায়ী মা আমেনার প্রতিশ্রুত কথা রাখতে গিয়ে সবুজের সঙ্গে বিয়েতে মত দেয় সে। স্নিগ্ধার বিয়ের সংবাদ যেদিন নিলয় জানতে পারে সেদিন ছিল শরতের রাত। ছিল নিলয়ের জীবনের শেষ জ্যোত্স্না। পরদিন ভোরে বাড়ির অদূরে কাশবনের একটি আম গাছের ডালে নিলয়ের নির্জীব দেহ ঝুলতে দেখা যায়। অনাকাঙ্ক্ষিত অপমৃত্যুর খবরে স্নিগ্ধা তিনদিন স্বাভাবিক ছিল না। নিলয়ে থাকার স্বাদ অপূর্ণ থেকে যায় স্নিগ্ধার। বাইশ বছরের আয়েশা আখতার স্নিগ্ধা মেনে নিতে পারেনি মাহফুজুর রহমান নিলয়ের স্বেচ্ছাবসান।

কাশবনে এ সময় অনেকেই শরত্ রাত্রির জ্যোত্স্না দেখতে আসে। ডানে বামে বাঁক নেওয়া ধলেশ্বরী নদীর এ অংশটি খুব শান্ত। নদীর দু’ প্রান্তে নানা ঘন সবুজ গাছের সজীব প্রকৃতি। আরিফুল ইসলাম সবুজ ছুটিতে শ্বশুরবাড়ি বেড়াতে এসেছে। বিছানায় শয্যাশায়ী অসুস্থ মাকে দেখতে স্নিগ্ধা অনেকদিন ধরে বাপের বাড়িতে।

যে জারুল গাছের নিচে ওরা বসে আছে তার কাছেই নিলয়ের প্রাণসংহারী সেই আম গাছ। স্নিগ্ধা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে সেই স্মৃতিময় গাছের ডালটা। মনে হলো নিলয় ডাল থেকে স্নিগ্ধাকে ডাকছে। নেমে আসছে নিলয়। হাতে বাঁশি। বাতাসে জারুল গাছের ডালপালা আবার দুলে ওঠে। মাটিতে বিছানো জ্যোত্স্ননায় এর ছায়া আবার দেখতে পায় সে! স্নিগ্ধার মনে হলো এ যেন নিছক ছায়া নয়। হেঁটে আসছে নিলয়। ওর ছায়া পড়েছে বালুতে। চিত্কার করে ওঠে স্নিগ্ধা। চোখ বুজে সবুজকে জাপটে ধরে বলে—

—ওই দেখো যুবকটা আবার আসছে। আমাদের নিয়ে যাবে আকাশে। চাঁদের কাছে...