স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে রিমান্ডে নির্যাতন দেখার দায়িত্ব ম্যাজিস্ট্রেটের

হাইকোর্ট বলেছে, যখন কোনো আসামি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে চায়, তখন রিমান্ডে থাকাকালে তাকে নির্যাতন বা ভয়ভীতি দেখিয়ে এটা আদায় করা হচ্ছে কি না, সেটা দেখার দায়িত্ব জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের। কারণ দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ভিত্তিতে একজন আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি হচ্ছে। এতে নানা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হচ্ছে। সেজন্য স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ডের ক্ষেত্রে একজন বিচারকের দায়িত্ব সবার চেয়ে বেশি। এক হত্যা মামলায় তিন ঘণ্টায় তিন আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ডের ঘটনা নিয়ে শুনানিতে বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ গতকাল বৃহস্পতিবার এই মন্তব্য করেন।

হাইকোর্ট বলেছে, এত অল্প সময়ে তিন জন আসামির জবানবন্দি রেকর্ড করা হলো, তাতে বিচারকের কতটুকু জুডিশিয়াল মাইন্ড অ্যাপ্লাই করা সম্ভব? তদন্ত কর্মকর্তা আসামি হাজির করল আর বিচারক হিসেবে জবানবন্দি রেকর্ড করে ফেললাম—এটা ঠিক নয়। আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ডের কারণেও অনেক সময় বিচার প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যেতে পারে।

এর আগে হাইকোর্টের তলবি আদেশে আদালতে হাজির হন ফরিদপুরের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. মাইনুল ইসলাম। এক দিনে তিন আসামির জবানবন্দি রেকর্ডের ঘটনায় তিনি হাইকোর্টে নিঃশর্ত ক্ষমা চান। আদালতের জিজ্ঞাসার জবাবে ঐ ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, ‘শুধু তিন জন নয়, অনেক সময় এক দিনে ১০ জন আসামির জবানবন্দি রেকর্ড করার অভিজ্ঞতা অনেক ম্যাজিস্ট্রেটের রয়েছে। ঐ দিন আমি চারটি কোর্টের দায়িত্বে ছিলাম। তবে এভাবে জবানবন্দি রেকর্ডের ক্ষেত্রে মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়।’ হাইকোর্ট বলেছে, ‘এক দিনে তিন-চার জন আসামির জবানবন্দি রেকর্ড করা হবে এটা অনুচিত। এর বিকল্প ভাবার সময় এসেছে। নারায়ণগঞ্জে মৃত কিশোরীর ফিরে আসার ঘটনায় তদন্ত কর্মকর্তাকে তলব করেছিলাম। ঐ তদন্ত কর্মকর্তা বলেছেন যে আসামি হাজির করেছি আদালতে, সেখানে ম্যাজিস্ট্রেট জবানবন্দি রেকর্ড করেছেন। রিমান্ডে যদি নির্যাতন করে থাকতাম, তাহলে তো তারা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে সেটা বলার সুযোগ ছিল।’ হাইকোর্ট বলেছে, ‘এতে তদন্ত কর্মকর্তা পরোক্ষভাবে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের ওপর দায় চাপিয়ে দিলেন। এজন্য আমরা বারবার বলি, বিচারকের দায়িত্ব সবার চাইতে বেশি। মেকানিক্যালি কোনো জবানবন্দি রেকর্ড করার দায়িত্ব তার নয়।’

শুনানিতে আসামিপক্ষের কৌঁসুলি ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘আসামি যাতে অপরাধ স্বীকার করে, সেজন্য তাকে রিমান্ডে নেওয়া হয়। কিন্তু জবানবন্দি রেকর্ডের যে ফরম রয়েছে, সেখানে কীভাবে তা রেকর্ড করা হবে, তা বলে দেওয়া হয়েছে। যদি কোনো আসামি জবানবন্দি দিতে না চায়, তাকে আশ্বস্ত করার দায়িত্ব ম্যাজিস্ট্রেটের। কারণ ম্যাজিস্ট্রেট তাকে বলবেন যে তুমি যদি জবানবন্দি না দাও তাহলে তোমাকে পুলিশের কাছে ফেরত পাঠাব না। কিন্তু এটা কখনো কোনো ম্যাজিস্ট্রেটকে বলতে শুনি নাই।’ শুনানি শেষে হাইকোর্ট দুই আসামির ছয় মাসের জামিন মঞ্জুর করে। একই সঙ্গে আগামী ১৯ নভেম্বর এ মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য দিন ধার্য রাখে। এ সময় রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সারওয়ার হোসেন বাপ্পী।

 ২০১৮ সালের ৭ জুন রাতে অপহরণের পর গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে অন্তরকে হত্যা করেন আসামিরা। ঐ বছরের ২৮ জুন সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট তিন আসামির দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করেন।